আম-খেজুর বা স্ট্রবেরি জনতার কানগুলো

প্রকাশিত

মাসকাওয়াথ আহ্সান : যুদ্ধাপরাধী নয় বা বাংলাদেশ কালে গ্রেনেড হামলা,খুন-ধর্ষণ বা অন্য কোন মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি এমন রক্ষণশীল শরীয়া আইনের ধ্যানে বিভোর তরুণের সংখ্যা কিন্তু অনেক, জার্মানীর নব্যনাতসীদের তুলনায় তাদের মাথার ও হাতের সংখ্যা অনেক বেশী।

এদের মধ্যে যারা নেহাত ধর্মব্যবসায়ীদের ট্যাকার লোভে জিহাদ প্যাকেজে যুক্ত তাদের নিয়ে চিন্তা কম, ট্যাকার জন্য এরা টেন্ডারবাজির জন্য দলবদল করবে বা সহি কায়দায় ফেনসিডিল বিক্রী করবে।কিন্ত যাদের আসলেই ব্রেন ওয়াশড হয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ একটি জীবনদর্শন।

ওয়াজিরিস্তানের জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুলো নিসর্গের বেহেশতের স্যুটিং স্পটের মত। সেইখানে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক আধুনিক জীবনের বিরুদ্ধে ব্রেণওয়াশ করার সময়, আফঘান বা পাকিস্তানী বহিষ্কৃত বা চাকরি ছেড়ে যাওয়া মার্সিনারী যুদ্ধ প্রশিক্ষকরা আলোচনার আবেগীমুহূর্তে চরস ধোয়ায় আচ্ছন্ন করেন চারপাশ, তরুণদের ঝরণার ধারে নিয়ে গিয়ে বলেন, এই নহরের চেয়েও সুন্দর নহর পাবে জান্নাতুল ফেরদাউসে।তারপর সিডি চালিয়ে এঞ্জেলিনা জোলি বা বিপাশা বসুদের মতো পার্থিব হুর দেখিয়ে বলে, আরও সুন্দর তারা জান্নাত হুরেরা।

জিহাদ মাথায় নিয়ে ঘুরছে যে অল্পবয়েসী তরুণেরা এদের রিকনসিলেয়েশন বা প্রশমন ক্যাম্প খুলে জীবনে ফেরাতে হবে। এত সংখ্যক তরুণকে অন্ধকারে রেখে আমরা সুশীলসমাজ আলো আমার আলো গাইলে তা ইউটোপিয়া শোনাবে।

যে ছেলেটি মাত্র হাজার দুই-তিনেক ডলারের বিনিময়ে তার ছোটভাইবোনের রুটির বন্দোবস্ত করেছে,যাকে তার মায়ের আঁচল থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে,জীবনের নিষ্ঠুর এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আবার এক নতুন জীবনের আলোছায়ায় বুকে বোমার সাস্পেন্ডার পরে হেঁটে যায় বেহেশতের দিকে, তাকে ডাকতে থাকে ওয়াজিরিস্তানের চেয়ে সুন্দর নহর আর সিডির হুরদের চেয়ে সুন্দর সানিয়া মির্জারা।

এইরকম সংকল্পবদ্ধ তরুণরা ইনটেরোগেশন সেলে যে ঋজুতার পরিচয় দেয় তাতে তাক লেগে যায় তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদ কর্মকর্তাদের।ওরা পার্থিব চাওয়ার উর্ধে তখন বেহেশতের অপেক্ষা করছে, কারাগার থেকে আত্মা আগেই চলে গেছে বেহেশতের ইমিগ্রেশন রুমে।

বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো গরীব বাচ্চাদের একমাত্র গন্তব্য, মাদ্রাসা একটা প্রায় নিরুপায় বিকল্প। সব মাদ্রাসাই জঙ্গীপ্রশিক্ষণ কেন্দ্র তা বলার অবকাশ নেই, কিন্তু যেহেতু মাদ্রাসাকে ঘিরে যে সন্দেহের কারণ তৈরী হয়েছে তা কাটাতে গেলে শান্তিপ্রিয় মাদ্রাসার আলেমদের সহযোগিতা লাগবে, অন্তত বিজ্ঞান, ইংরেজী আর কম্পিউটার প্রশিক্ষণ আর শান্তির ইসলামের দর্শন দিয়ে জেহাদী যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক জঙ্গী ভাবনা প্রতিস্থাপিত করতে।

শিক্ষামন্ত্রী আশা করছি এদিকে নজর দেবেন। ধর্মমন্ত্রী মসজিদের ইমামদের একইভাবে কাজে লাগাতে পারেন মসজিদের খোতবার অন্তত দুইমিনিট ইসলামের শান্তির এবং জিহাদের সঠিক ব্যাখ্যাটা তুলে ধরার জন্য। আমার জানামতে সবচেয়ে কঠিন জিহাদ হচ্ছে নিজের মধ্যের খারাপের বিরুদ্ধে,অসত্যের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিযুদ্ধ প্রতিনিয়ত। ইসলাম যদি ধর্ম হয়, শুদ্ধ জীবন দর্শন হয়; তাহলে অতীতের কতিপয় যুদ্ধবাজ মুসলমান খলিফা বাদশাহদের রাজনৈতিক জিহাদ অপব্যাখ্যার অনুসারী একবিংশের মুসলমানেরা হতে পারেনা।সেটা জিহাদ দেবতাদের পূজা, কাজেই শিরক।

বাংলাদেশের জিহাদ আঞ্চলিক বলে যারা উড়িয়ে দেন, তারা রমনার বটমূল, উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, একুশে অগাস্ট, সতের অগাস্ট ভুলে গেলেন সেই বুড়ির মত যার বৃষ্টি দিনেই কেবল ঘরের ছাদ সারানোর কথা মনে পড়ে। একি সঙ্গে তেষট্টি জেলায় বোমা হামলার সামরিক কৌশল হাফরেড বাংলাভাইয়ের মাথা থেকে এসেছে ভাবা আমার যুদ্ধকৌশল বিশেষজ্ঞ এক বন্ধুর ই-মেইল পড়ে অবাক হলাম। আমরা আসলে সরল নদী মানুষ।

তবে তার কাছ থেকে একটা ভালো পরামর্শ এসেছে। সরকার চাইলে আনসার বাহিনীকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আধুনিক ট্রেনিং দিয়ে প্রতিষেধক অপারেশনে নামাতে পারেন। এতে সামাজিক অপরাধও ভয় পাবে চুরি-ডাকাতি-খুনের আগে। জিহাদ মাথায় নিয়ে ঘুরছে যে অল্পবয়েসী তরুণেরা এদের রিকনসিলেয়েশন বা প্রশমন ক্যাম্প খুলে জীবনে ফেরাতে হবে। এত সংখ্যক তরুণকে অন্ধকারে রেখে আমরা সুশীলসমাজ আলো আমার আলো গাইলে তা ইউটোপিয়া শোনাবে।

দাড়িটুপির মেক আপ পরে যুদ্ধাপরাধী আর ধর্মব্যবসায়ী জিহাদ বিক্রেতারা যে ইসলামোফোবিয়া তৈরী করেছে তা ভয়ংকর। আমরা এখন দাড়িটুপি দেখলেই জিহাদী ভাবি, বোরখা দেখলেই ভয় পাই বোমা না ফেন্সিডিল বহন করছে তাই ভেবে। যাদের মাখালানানীরা বোরখা পরেনি তারাও বোরখা পরছে বেহেশত এ জন আব্রাহাম বা ব্র্যাড পিট হুরের অপশন না থাকার পরেও।কেন তা জানা দরকার, বোঝানো দরকার পর্দা বাইরে নেই মানুষের মনে এই পুরোনো কথাটি।

এরা আওয়ামীলীগে ঢুকছে যুদ্ধগোয়েন্দা মাতাহারির মত অথচ বাঙ্গালী মেয়েদের অন্তত সূফিয়া কামাল বা প্রীতিলতা হবার কথা ছিলো। তাই ম্যাডাম যদি বুঝে থাকেন যুদ্ধাপরাধী আর জিহাদব্যবসায়ীদের সিসিফাসের বোঝাটা নিয়ে আর ভোট পাওয়া যাবেনা তাহলে জার্মানীর খ্রিস্টিয় গণতন্ত্রী আঙ্গেলা ম্যারকেলের পার্টির মত ফাউন্ডেশন তৈরি করে এই অন্ধকারের তরুণদের জন্য দেশজুড়ে ফাউন্ডেশন বানিয়ে তাদের জীবনে ফেরাতে পারেন।ছাত্রদলের দুষ্টু ছেলেদের ওখানে সংশোধনের চেষ্টা করতে পারেন। মনে রাখা দরকার আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে যে আগে তরুণ কর্মীদের তথ্যপ্রযুক্তি,ইংরেজী আর পেশাগত বা ভকেশনাল ট্রেনিং দিতে পারবেন, তত এগিয়ে যাবেন ভবিষ্যতের রাজনীতিতে।যদি কিছু প্লাম্বার বানিয়েও পশ্চিমে পাঠাতে পারেন,ওদের যা উপার্জন হবে, পার্টি ওদের চাঁদায় সৎ উপার্জনে চলে যাবে।প্লাম্বার ফিরে মন্ত্রীও হতে পারেন,অতীতেও হয়েছে,আমরা শ্রমের মর্যাদার হরলাল পড়া জাতি।

আর সমাজেও এই নানারকম কৃত্রিম বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসার মনোভঙ্গী দরকার,শীর্ণ শরীরের কোটরাগত চোখের,ফুরফুরে দাড়ির হাত টিপে টিপে জিহাদের দাওয়াত যেমন বিরক্তিকর টিশার্ট-জিন্স পরে দাড়িটুপি দেখলেই তাকে নিয়ে ক্যারিকেচার করাটাও গ্রাম্যতা কুচুটে অর্থে।মুক্তিযুদ্ধ-বঙ্গবন্ধু ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্নে একমত হয়ে ৭২এর সংবিধানএ ফিরে ফ্রেস স্টার্ট দিতে না পারলে রুয়ান্ডার মতোই খুনোখুনির ব্যবসা করে যেতে হবে পরের শতাব্দীতেও।সিএনএন তখন এমবেডেড জার্নালিজম করবে আ ল্যান্ড অফ পলিটিক্যাল ক্যানিবালস বলে।

অনলাইন সুবিধার এই যুগে আমরা ২৪ঘন্টা দিবালোকের আলোয় সত্য দেখতে পাই। ফ্রিমেসেনদের ষড়যন্ত্র সূত্র বোঝা তরুণের সংখ্যা এখন অনেক। এখন ফ্রিমেসেন ভাবনা আঙ্গিক বদলে নতুন সিন্ডিকেট ভাবনা বিনির্মাণ করেছে।আমরা জানি কিভাবে কতিপয় ক্ষমতা ব্যবসায়ী ধর্মানুভূতির বিজ্ঞাপন চালাতে পশ্চিমা এবং আরব মিডিয়ায় খৃস্টীয় এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিষ জারিত করে চলেছে পয়সা খরচ করে, অস্ত্র বিক্রীর বাজার তৈরীর জন্য। বুশ এবং লাদেনের মত হট মডেল নাওমী ক্যাম্পবেলও হতে পারেনি।ম্যাকিয়াভেলীর চিত্রনাট্যের বাস্তবায়ন দেখে আমরা মিডিয়া আসক্ত হয়ে আমাদের মনোভূমিতে জায়গা করে দিই ষড়যন্ত্র সূত্রগুলোকে। এরা আমাদের গ্রামের কুচুটে মাতবরদের মত (অনেকে সংসদেও আছে) চোরকে চুরি করতে বলে গৃহস্তকে ধর ধর বলে শঠতার সঙ্গে।যুদ্ধের রেসিপি তৈরীর এই ছায়া নর্তকরা কেউ খৃষ্টান-মুসলমান-ইহুদী-হিন্দু বা নাস্তিক নন। এরা ব্যবসায়ী, ব্যবসা এদের ধর্ম,এরা যখন রেড ওয়াইনে সিপ করে তখন আফঘানিস্তানের রক্তের রঙের সঙ্গে মেলায়, যখন চুরুট ধরায় তখন টুইন টাওয়ার বা লকারবি বিমান পুড়তে থাকে,যখন সুইটজারল্যান্ডের বরফ বেহেশত বা হল্যান্ডের টিউলিপ বাগান বা ত্রিপোলি্র রাজকীয় তাঁবু বা শরম আল শেখের অবকাশ প্রাসাদে টপ মডেলদের সঙ্গে রিরংসায় মেতে ওঠে ইরাকের নারীরা তখন ধর্ষিত হয়।এদের ক্ষমতার ব্রাঞ্চে ন্যুইয়র্ক-বাগদাদ-কাবুল বার-বি-কিউ আয়োজনের স্যাডিজম পুরো গোলকের মানুষের জীবনচর্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় এক ক্যানিবাল প্রচেষ্টা।প্রোস্টেট জটিলতায় ক্ষুব্ধ কতিপয় বৃদ্ধ-জরদগব-জাঢ্য জুয়াড়ীর জুয়া বোর্ডে বুশ-ডিকচেনী-ব্লেয়ার-হাওয়ার্ড-লাদেন-সাদ্দাম-আহমেদিনেজাদ কার্ড।আর আমরা খুঁজে মরি চিল নিয়েছে আম-খেজুর বা স্ট্রবেরিজনতার কানগুলো..

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন