ইভিএম নিয়ে ইসিতে মতবিরোধ

স্পেশাল করসপন্ডেন্টস : একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনাররা মতবিরোধে জড়িয়েছেন। জানা গেছে, নির্বাচনে ইভিএম ব্যহরের জন্য ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার নতুন যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে ৫ কমিশনারের মধ্যে তিনজন জানেন না। এর মধ্যে এক কমিশনার সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য যে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট আব ডিসেন্ট’ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন,  সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার  নতুন যে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে সে বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। আপনাদের কাছে জানতে পারলাম। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারব। সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে আরপিও সংশোধনের  জন্য ৩০  আগস্ট মিটিং আছে সেখানে বিষয়টি জানতে চাইব।  আমি এর আগে জানতাম সংসদ নির্বাচনে অল্প কিছু কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হবে। বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কিছুই জানি না।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ইভিএমের প্রকল্পের বিষয়ে কিছু জানি না। সচিব এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানেন। যখন এগুলো ব্যবহার করার জন্য কমিশন সভায় আলোচনা হবে তখন বলব। এর আগে বিষয়টি নিয়ে বলার কিছু নেই, আমি বলতেও চাইনা।

কমিশনার কবিতা খানম বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে তা আরপিওতে সংযুক্ত করতে হবে। তার পর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে কিনা। ব্যবহার করলেও তা কতটুকু পরিসরে ব্যবহার করা হবে, সে ব্যাপারেও ৩০ আগস্ট সিদ্ধান্ত নিবে। ইভিএম কেনার নতুন প্রকল্পের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে আরপিও সংশোধন করা হচ্ছে সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে একজন কমিশনার নোট আব ডিসেন্ট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার নোটে বলেছেন, বিগত ২৬ আগস্ট আরপিও সংশোধনের জন্য কমিশন সভায় তিন ধরনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। সেদিন দুটি প্রস্তাব বাদ দিয়ে কেবল একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত কমিশনসভা মুলতবি করা হয়। স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ইতোমধ্যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে । এতে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

এদিকে প্রধান নির্বাচন কশিমনার প্রথম থেকে বলে আসছেন রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্বাগত জানালেও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকে বিরোধীতা করা হয়েছে। তাই একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অধিকতর আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, এর আগে ৫০ কোটি টাকার ইভিএম ক্রয়ের নথিতে আমি ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলাম। সম্প্রতি ইভিএমের জন্য যে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বিরোধীতার মুখে আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ক্রয় করা কতটা যৌক্তিক।

ইসি সূত্র জানায়, ইসি যে চাহিদাপত্র দিয়েছে তাতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনে ইভিএম প্রয়োজন ২ লাখ ৬৪ হাজার। ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে একসঙ্গে ভোটগ্রহণ করতে গেলে ইভিএম প্রয়োজন ২৩ হাজার। একইভাবে দেশের ১১ সিটিতে একসঙ্গে ভোটগ্রহণ করতে গেলে ইভিএম লাগবে ৩৫ হাজার। ৩২৩ পৌরসভায় এ পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করতে হলে ইভিএম লাগবে ৩৫ হাজার।

ইসির তথ্য অনুসারে, দেশে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৫৫টি। এসব ইউপিতে একসঙ্গে ভোটগ্রহণ করতে ইভিএম লাগবে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫০০টি। তবে এ ক্ষেত্রে ইসি ভিন্ন পরিকল্পনা করেছে।

পর্যালোচনাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ইউপি নির্বাচন কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। ইতোপূর্বে প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ ৭৫০টির মতো ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে একেক ধাপে ইভিএম প্রয়োজন ৫২ হাজার ৫শ।

এদিকে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ইভিএম প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাবটি সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ণ কমিটি (পিইসি) মতামত দিয়েছে। গত ১৯ আগস্ট পিইসির সভায় এ মতামত দেয়া হয়। সম্প্রতি ‘নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই একাশদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১৯ আগস্টের সভাটি বিশেষ কিছু কারণে মূলতবি করা হয়েছে। পিইসির সভায় প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে মর্মে মতামত এসেছে।

প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আলোচনার তাগিদ দিয়েছে পিইসি। প্রকল্পে ২০৪ জন পরামর্শকের প্রয়োজনীয়তা জানতে চেয়েছে পিইসি। এক্ষেত্রে পরামর্শকের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মপরিধি ডিপিপিতে উল্লেখের জন্য বলা হয়েছে। প্রকল্পে ৩১১০ জনের প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ থাকলেও তারা কারা সে বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া ৩০জনকে বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রদানের কথা বলা হলেও তাদের পরিচয় জানানো হয়নি। প্রকল্পে বিজ্ঞাপন প্রচার, পরিবহন, মোটরযানবাহন ক্রয়, কম্পিউটার সফটওয়্যার, আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইসির সঙ্গে সংলাপে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছে।