এ কেমন সাংবাদিকতা?

প্রকাশিত

শরিফুল হাসান : সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কিংবা তারকা কিংবা সম্পাদক বলে যারা পরিচিত তাদের কয়েকজনকে আমার একটা প্রশ্ন করার খুব শখ। আচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করতে এসে তেলবাজির প্রতিযোগিতা করে আপনারা যখন অফিসে ফেরেন এবং এরপরে নানা সময়ে অধীনস্থ সাংবাদিকদের ভালো করে সাংবাদিকতা করতে বলেন তখন আপনাদের লজ্জা করে না? আচ্ছা আপনাদের এসব প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কিংবা দেশের কী খুব বেশি উপকার হয়?

সেই সকাল থেকেই কথাগুলো ঘুরছে মাথায়। সারাদিনে ফেসবুকে বসা হয়নি বলে লেখা হয়নি। এই রাতেই তাই বলা।জানি এসব কথা বলায় আমার শত্রু বাড়বে বৈ কমবে না। তবুও চুপ করে থাকতে পারি না। কাউকে আহত করার জন্য নয়, বিবেকের তাগিদেই কয়েকটি কথা তাই বলা।

এরপরে নানা সময়ে অধীনস্থ সাংবাদিকদের ভালো করে সাংবাদিকতা করতে বলেন তখন আপনাদের লজ্জা করে না? আচ্ছা আপনাদের এসব প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কিংবা দেশের কী খুব বেশি উপকার হয়?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন মানেই তিনি বলে যাবেন, বাকিরা শুনবেন কোন প্রশ্ন করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি কখনো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে যতো খুশি প্রশ্ন করার সুযোগ দেবেন এমনটা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরোটাই উল্টো। প্রতিবার বিদেশ সফর করে এসে তিনি সংবাদ সম্মেলনে করেন। সাংবাদিকদের যতোখুশি তিনি প্রশ্ন করার সুযোগ দেন।

আমি মনে করি বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সমস্যার শেষ নেই সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের সংবাদ সম্মেলন একটা বিরাট সুযোগ। রাষ্ট্রের, জনগনের নানা সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নানা কিছু জানা যেতে পারে। যেহেতু তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী কাজেই তাকে যথাযথ সম্মান জানিয়ে এসব প্রশ্ন করা যেতেই পারে।কিন্তু সেই প্রশ্ন করতে এসে বাবার বয়সী সম্পাদক সাংবাদিক যারা কিনা এই দেশের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কিংবা তারকা তারা যখন তেলবাজি কিংবা বক্তৃতা দিতে প্রতিযোগিতা করতে থাকেন তখন সেটা সাংবাদিকতার জন্য লজ্জার।

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে একজনের পর আরেকজনের প্রশ্নের নামে বক্তব্য দেখে মনে হয় কে কার চেয়ে বেশি তেল দেবেন সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। যেন এই প্রশ্ন করার মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স, প্রেস মিনিষ্টারের কোন পদ কিংবা কোন পুরস্কার। কিন্তু আপনারা কী বোঝেন লাইভ টেলিভশিনের এই যুগে আপনাদের এমন তেলবাজি দেখে আমরা যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে সাংবাদিকতা করতে এসেছি তারা খুব কষ্ট পাই। কিংবা ধরুণ যে তরুণ বা তরুনী ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা করতে আসবে বলে ভাবছে তারা আপনাদের প্রশ্ন দেখে কী ভাববে?

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ৭৫ থেকে ৯০ চালিয়েছে খুনিরা আর ৯১ র পর থেকে এই দেশে চলছে রাজতন্ত্র। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন দেখে মনে হয় এ যেন কয়েকশ বছর আগের কোন রাজসভা যেখানে সবাই রাজাকে তেল মারায় ব্যস্ত।কেন রে ভাই  সোজা সাপ্টা করে আপনার প্রশ্নটা করুন না যেই প্রশ্ন দেশের মানুষের মনে আছে, সাংবাদিক হিসেবে যেটা আপনি জানতে চান। আজকে কিন্তু সুলতানা আপা ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময় নিয়ে সবচেয়ে দরকারি প্রশ্ন দুটো করে দেখিয়েছেন চাইলেই প্রশ্ন করা যায়। আচ্ছা আপনারা যারা তেলবাজি করেন তারা অফিসে ফিরে কীভাবে তরুণ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন? আমি জানি আপনাদের কোন সমস্যা হয় না। কারণ একেকটা সংবাদপত্র বা মিডিয়া অফিসও যে একেকটা তেলের কারখানা।

কিন্তু আপনারা কী বোঝেন লাইভ টেলিভশিনের এই যুগে আপনাদের এমন তেলবাজি দেখে আমরা যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে সাংবাদিকতা করতে এসেছি তারা খুব কষ্ট পাই। কিংবা ধরুণ যে তরুণ বা তরুনী ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা করতে আসবে বলে ভাবছে তারা আপনাদের প্রশ্ন দেখে কী ভাববে?

আমি জানি আমার এই কথাগুলো শুনে এদেশের প্রভাবশালী সাংবাদিকরা এবং আমারো অনেক সাংবাদিক বন্ধু রুষ্ট হবেন। তবে আমি আমার একযুগের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি আমরা বাংলাদেশের সাংবাদিকরা খুবই হিপোক্র্যাট।

কয়েকটা উদাহরণ দেই। আমরা সাংবাদিকরা সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুনীতি অনিয়ম নিয়ে কথা বলি কিন্তু নিজেরা ট্যাক্স দেবো না, নিজেদের কোন হিসাব নিকেশের বালাই নেই। নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়মের শেষ নেই। সংবাদপত্র ব্যাবহার করে এদেশের কতোজন যে কতো জমি দখল করছে, কতো যে ব্যাবসা করছে সেগুলোর কোন বিচার নেই।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো আমরা সাংবাদিকরা সারাক্ষণ ন্যায় নীতি প্র্রতিষ্ঠার কথা বলি বা লিখি, সবাইকে উৎসাহিত করি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হ্ওয়ার কিন্তু নিজেরাই করি উল্টা আচরণ। আচ্ছা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আপনার প্রতিষ্ঠান যখন মাসের পর মাস বেতন দেয় না, বিনা কারণে যখন আরেকজনকে চাকুরিচ্যুত করে তখন আপনি কী সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন? আমি শুনিনি কোন সাংবাদিকের চাকুরি যাওয়ার পর পরদিন সব সাংবাদিকরা নিদেন পক্ষে সেই প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকরা এক হয়ে বলেছে, এই অন্যায় বন্ধ করতে হবে, নইলে আমরা কেউ চাকুরি করবো না। আচ্ছা আপনি যদি নিজের প্রতিষ্ঠানের অন্যায়টাই বন্ধ না করতে পারেন তাহলে কীসের জন্য এতো নীতি কথা বলেন?

আপনি আমি অনেকেই জানি এই ঢাকা শহরে কতো সাংবাদিক বেতন পায় না, ঠিকমতো চলতে পারে না, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করে তাদের পক্ষেও কাউকে দাঁড়াতে দেথলাম না। এই যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো বেতন দেয় না, ২০-২৫ বছর চাকুরি করে ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তার প্রাপ্য সুযোগ সুবিধাগুলোও দেয় না এসব নিয়ে তো কোথাও কখনো নিউজ দেখি না!

আবার উল্টো চিত্রও আছে। এক যুগ চাকুরি করার পরেও আমরা অনেক সাংবাদিকরাই যখন এই ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া দিয়ে খেয়ে পরে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করি তখন কতোজনকে দেখি ফ্ল্যাট, গাড়ি বাড়ি প্লটের মালিক। অনেক সাংবাদিক তো শুনি তদবিরবাজি আর অনিয়ম করে রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। কই কোনদিন কোন পত্রিকায় কোন সাংবাদিকের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তো কোন নিউজ দেখলাম না? বরং টকশোগুলোতে গিয়ে এরাই অবার নীতি কথা বলে।এরাই আবার কেউ কেউ কলাম লেখে।

সবদেখেশুনে আমার আজকাল খুব হতাশ লাগে। যারা অসৎ হয়ে গেছেন কিংবা টাকা বানিয়েছেন তারা হয়তো একদিক দিয়ে ভালো আছেন। গোটা চার-পাঁচেক প্রতিষ্ঠানে আমরা যারা নিয়মিত একটু ভালো বেতন পাই তারাও মোটামুটি হয়তো বেঁচে আছি কিন্তু কাল যদি আমার চাকুরি না থাকে তাহলে পরের মাসে এই শহরে বাসা ভাড়া দিয়ে আমার টিকে থাকাটাই তো কষ্টের হবে। আমার পাশে কে থাকবে তখন? আমি তো কোন ভবিষ্যত দেখি না এই দেশের সাংবাদিকতরা।

আবার উল্টো চিত্রও আছে। এক যুগ চাকুরি করার পরেও আমরা অনেক সাংবাদিকরাই যখন এই ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া দিয়ে খেয়ে পরে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করি তখন কতোজনকে দেখি ফ্ল্যাট, গাড়ি বাড়ি প্লটের মালিক। অনেক সাংবাদিক তো শুনি তদবিরবাজি আর অনিয়ম করে রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। কই কোনদিন কোন পত্রিকায় কোন সাংবাদিকের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তো কোন নিউজ দেখলাম না? বরং টকশোগুলোতে গিয়ে এরাই অবার নীতি কথা বলে।এরাই আবার কেউ কেউ কলাম লেখে।

আমি জানি আমার মতো একই রকম অনিশ্চয়তা আর কষ্টে ভোগেন এই দেশের অনেক তরুণ কিংবা প্রবীণ সাংবাদিক যারা মানুষের জন্য দেশের জন্য কিছু করার ব্রত নিয়ে সাংবাদিকতা করতে এসেছেন। যতোই দিন যাচ্ছে ততোই নিজেকে বোকা মনে হচ্ছে, কষ্টে মনটা বিষিয়ে উঠছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমাদের মতো মানুষগুলোর কথা শোনারও কেউ নেই। কারণ আমাদের তারকা সাংবাদিক কিংবা পথিকৃতরা ব্যস্ত তেলবাজিতে। মেরদণ্ড সোজা রেখে কথা বলার মতো নেতা কিংবা সাংবাদিকের খুব অভাব এই দেশে। কাজেই আমি জানি না এই দেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যত কী?আমাদেরও বা ভবিষ্যত কী? এসব প্রশ্নের উত্তর না জানলেও এটা জানি তারপরেও আমাদের মতো বোকারা যুগে যুগে সাংবাদিকতায় আসবে। মনের কষ্ট হয়তো অনেকেই চলে যাবে এই পেশা থেকে কিন্তু তারপরেও কেউ কেউ আসবে।

সূত্র : http://shariful06du.blogspot.com/2015/10/blog-post.html?spref=fb

শেয়ার করুন