গুজব ভাইরাল ও কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান : মানুষ এখন আর বড় বড় বিশ্লেষণধর্মী খবর পড়ে সময় নষ্ট করতে ইচ্ছুক না। ফেসবুকে কোনো তথ্য খুব সহজে আসায় তা মানুষ দেখে ফেলে। যে ব্যাপারে আমার আগ্রহ আছে, সেটা আমি বেশি বেশি করে দেখব, এটিই হয়। আমরা যতই উন্নয়ন সমৃদ্ধির কথা বলি না কেন, আমাদের দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে, দেশে প্রচুর বেকার রয়েছে। বেকাররা যখন তাদের সমর্থিত কোনো বিষয় দেখে, তখন সেটা নিয়ে তারা খুব সিরিয়াস হয়ে যায়। কিছুদিন আগে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন মূলত এক প্রকার তথ্য বিভ্রাটের ফলে সৃষ্ট। এখানে সরকারেরও ত্রুটির একটি জায়গা রয়েছে। সরকার কখনোই মানুষকে অবহিত করেনি যে, চাকরিক্ষেত্রে মেধাবীদের থেকে কতজন নিচ্ছে আর কোটা থেকে কতজন যাচ্ছে। আর যখন এটি একটি সংকটের পর্যায়ে চলে এলো, তখন কেবিনেট সচিবকে বলতে দেখলাম, গত কয়েক বিসিএসে কোথায় থেকে কতজনকে নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে বরাবরই ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মেধাবীদের থেকে যাচ্ছে। কিন্তু এই তথ্যটা আমাদের বেকার যুবক সমাজকে এর আগে জানানো হয়নি। তারা জানত ৫৬ ভাগ কোটা থেকে যাচ্ছে। আর এই কোটার মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়েই বেশি আলোচনা। সবাই মনে করত সব চাকরি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার নিয়ে যাচ্ছে। সত্যি কথা বলতে, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান দেশে খুবই কম। তাদের চাকরি পাওয়ার যে প্রবণতা সেটাও এত বেশি না। গত কয়েক বছরের হিসাব করলে কোটা পূরণ করা তো দূরের কথা, কোটার আশপাশেও তারা যেতে পারেনি।
কোনো কোনো পরীক্ষায় ১ থেকে ৭ ভাগ কোটা নিয়েছে তারা। কোটায় চাকরি পাওয়ার জন্য ন্যূনতম যে যোগ্যতা, সেটি তারা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু এই তথ্যটা আমাদের আন্দোলনকারীরা জানত না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানায়নি। এদিকে এ বিষয়টিকে পুঁজি করে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাদের ভিতরে ঢুকে যায়। যারা চায় মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল হয়ে যাক। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল নামকাওয়াস্তে একটা ব্যাপার। সরকারের এই তথ্য বিভ্রাটকে পুঁজি করে কিছু স্বার্থন্বেষী মহল এগুলো একজন থেকে একজন করে চারদিকে গুজব ছড়িয়ে ভাইরাল করে দেয়। তদন্ত করলে দেখা যাবে, প্রত্যেকটি গুজব ভাইরাল করার পিছনে কতিপয় মহলের স্বার্থ জড়িত থাকে। এক্ষেত্রে গুজব প্রতিরোধ করার জন্য সবচেয়ে উত্কৃষ্ট উপায় হলো সঠিক তথ্যটা তুলে ধরা। কয়েক মাস আগ থেকে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক তথ্যটা জনগণকে জানানোর দরকার ছিল যে, প্রকৃত মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছে। সঠিক পরিসংখ্যান জানানো প্রয়োজন ছিল। এজন্য ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট সৃষ্টি হতে দেখলে কর্তৃপক্ষের সঠিক তথ্য তুলে ধরা উচিত।
আরেকটা আন্দোলন হয়ে আসছে ৩৫ বছর পর্যন্ত চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা করার। আমি মনে করি, রিটায়ারমেন্টের আগ পর্যন্ত চাকরির বয়সসীমা করা উচিত সরকারের। চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা যত বাড়বে, যোগ্য লোকদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কমবে। কারণ, একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েট যিনি ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছেন, তার থেকে কম নম্বর পাওয়া ৩৫ বছর বয়সী চাকরিপ্রার্থী লোকটার জানাশোনা বেশি থাকবে। ২৫-৩৫ বছর বয়সীদের একসঙ্গে চাকরির পরীক্ষা নিলে অবধারিতভাবে লেটেস্ট যারা, তারা ভালো করবে। তো এক্ষেত্রে সংকট আগের মতোই থাকবে। এজন্যই আমরা দ্বিতীয়বার বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাডমিশন টেস্ট নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। নচেত্, নবীন-প্রবীণদের মাঝে জানাশোনার একটা বৈষম্য সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে যারা গুজবে কান দিয়ে আন্দোলন করে একটি সংকট সৃষ্টি করছে, তাদের জ্ঞানকে আরও সম্প্রসারিত করা দরকার। বর্তমান সময়ে বিদ্যমান তিনটি বিষয় ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য বিষফোঁড়া—এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস ও স্বল্প মূল্যে ফেসবুক ইউজ করা। খুব শিগগিরই এ তিনটি বিষয় রুখতে না পারলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়