তাদের আনন্দ আর আমাদের উদ্বিগ্নতা!

প্রকাশিত

নাদিম মাহমুদ : আমার ল্যাবে প্রতি মাসে ২/৩ টি অনুষ্ঠান থাকে। একমাত্র মুসলিম বলে, আমার জন্য বিশেষ খাবার রাখা হয়। ওরা পর্ক খায় বলে, আমার জন্য একটা পাত্রও কিনেছে, যেটা ব্যবহার করে আমি খেতে পারি। এভাবে চলছে।

কয়েক মাস আগে ল্যাবের এক অনুষ্ঠানে হঠাৎ এক ল্যাবমেট জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা তুমি পর্ক খাও না কেন? র্ডিংকস করো না কেন?
—-উত্তরে আমি বললাম, আমি ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসী, আর ইসলাম এইগুলোকে খেতে নিষেধ করেছে তাই আমি খাই না?
এরপর তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা ইসলাম এতো কিছু থাকতে এই দুই খাবারকে নিষিদ্ধ করেছে কেন? এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি?
—ছোটকালের ইসলাম শিক্ষা বইয়ের জ্ঞান আওড়ায়ে বললাম, এই খাদ্যগুলো দেহে বিভিন্ন ধরনের রোগ সৃষ্ঠি করে। মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।

তখন উনি বললেন, তুমি গবেষক, এই খাবার নিয়ে কোন বিজ্ঞান জার্ণালে কোন গবেষণাপত্র বের হয়েছে কি? যদি না বের হয়, তাহলে তোমার এই কথাগুলোর বলার যৌক্তিকতা কি? কোন কথা কেউ বললেই তো তার প্রতি বিশ্বাস আনবে না তাই না?
—-আমি কোন গবেষণাপত্র দেখিনি। পাঠ্যপুস্তকে দেখেছি। আর আমি মুসলিম। আমাদের প্রধান কাজ খোদার দেয়া নির্দেশ মাণ্য করা। এখানে যুক্তি দেখানো অনুচিত।
তখন উনি বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি। আমরা জাপানিরা ধর্মকর্ম বিশ্বাসী তেমন নই। তাই তোমার কাছে এই নিষিদ্ধ খাবারের রহস্য জানতে চেয়েছিলাম।

আমি এইগুলো থেকে দূরে থাকায় তারা আপাতত দৃষ্টিতে অসুন্তুষ্ট হলেও মনে মনে খুব লজ্জা পেত। কারণ তারাও জানে এগুলো শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আর এইজন্য মাঝে মাঝে তারা প্রসংশাও করে। এই তো সেদিন রমজান মাসে, আমি যখন রোজা রাখার বিষয়টি সকল ল্যাবমেটদের জনালাম তখন অনেকে বললো, আচ্ছা সারাদিন না খেয়ে থাকো কিভাবে? তোমার কষ্ট হয় না? তোমাকে দেখে আমার মাথানত করতে ইচ্ছে করছে। তোমরা নামাজ পড়ো, পর্ক-র্ডিংকস খাও না। আমার মনে হয় তোমরাই ঠিক পথে আছো।

কিন্তু এই কথাগুলোর ম্লান এনে দিয়েছে গত শনিবারে রংপুরের কনিও হোসি হত্যাকাণ্ডে। ইসলামিক স্টেট উদ্ধৃতি করে জাপানি গণমাধ্যমে খবর আসার পর তীর্ব প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি জাপানিদের কাছ থেকে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিষয়টি যেভাবে ফোকাস দিয়ে আতংক তৈরি করার সৃষ্ঠি করেছে সেখানে জাপানি গণমাধ্যম অত্যন্ত সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এনএইচকে গতকাল কোন নিউজ করেনি এই বিষয় নিয়ে। জাপান টাইমস, জাপান টুডে, নিক্কী শনিবার এই নিয়ে নিউজ করলেও সেখানে আইএস সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়নি। রোববার পত্রিকাগুলো বিষয়টি নিয়ে নিউজ করলেও আইএস যে বাংলাদেশে আছে তা নিশ্চিত নয় বলেও তারা লিখেছে। তারা এটাও বলেছে, গত বছর শেষের দিকে রাজনীতিক দলগুলোর সংহিসতার সাথে এই্ হত্যাকাণ্ডর মিল থাকার অভিযোগও রয়েছে।

অথচ আমার দেশের গণমাধ্যম গলা ফাটিয়ে নিউজ দিয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে, যে আমরা স্বঘোষিত জঙ্গীরাষ্ট্র পরিনত হয়েছি। তোমরা এসে দেখ, আমার দেশে আইএস মতো জঙ্গীরা বাস করে।

আমি জানি না, ঘটনাগুলোর সত্যতা কি? তবে এ নিয়ে যে তীর্ব্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি তা নিয়ে মনে শঙ্কা বাড়ছে।

যারা এতো দিন আমাদের শান্ত-শিষ্ট্ জাতি হিসেবে চিনতো তারা এখন চিনছে জঙ্গীবাদী দেশের নাগরিক হিসেবে। এটা তো কত বড় লজ্জার প্রবাসীরাই ভাল জানেন।

আজ দুপুরে আমার এখানে বাঙালিদের এক অনুষ্ঠান ছিলো। সেখানে কনিও হত্যাকাণ্ড নিয়ে সবার মনে উদ্বিগ্নতার ছাপ দেখতে পেলাম।

আমি জানি না আমাদের ভবিষৎ কি? তবে এই হত্যাকাণ্ডে যে প্রবাসী বাঙালিদের উপর প্রভাব পড়বে তা শতভাগ নিশ্চিত। এই তো গত বছর মধ্যপাচ্যে থেকে জাপান সরকারের স্কলারশিপের জন্য ৫ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল, সেখানে মাত্র ১১ জন আসতে পেরেছে। বৈরী সম্পর্কের জন্য চীনের সাথে জেএসপিএস নামক এক স্কলারশীপ না দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

এই খড়ক যে বাংলাদেশের ওপর এসে বিধবে না তার কোন প্রমাণ আছে কি? আজ রংপুরে কিংবা গুলশানে যে হত্যাকাণ্ড হলো, তা কি বিদেশী কেউ এসে হত্যা করেছে? নিশ্চয় নয়? আইএসের মুখোশ লাগিয়ে দেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিচয় করে দেয়ার জন্য যারা মহান কাণ্ডে জড়িয়ে পরেছেন, তাদের কাছে একটিবার অনুরোধ করছি, আজ বাংলাদেশ যদি সিরিয়া, ইরা্ক, আফগানিস্তান হয়ে যায় তাহলে আপনার সন্তান, আপনার বাবা-মা, আপনার ভাই-বোনও এ থেকে রেহায় পাবে না? ইসলামের নামে জঙ্গিপণার কেবল বিকৃত মানসিকতার প্রতিধ্বনী। আজ আমরা যারা প্রবাসী তারা বুঝি, দেশের প্রতি কতটুকু ভালাবাসা আমাদের? আমরা বুঝি কিভাবে আমার দেশকে এগিয়ে নেয়া যায়?

আজ আপনাদের মস্তিষ্ক ধোলায় করে যে কাজগুলো করে নিচ্ছে, নিশ্চয় আপনি জানেন না, বৈশ্বিক উন্নয়নে সন্ত্রাসবাদের কোন স্থান নেই। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রই সন্ত্রাসীদের দ্বারা কজ্বা হয়নি ভবিষৎও হবে না। মরুচীকার পিছনে সময় না দিয়ে দয়া করে, নিজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করে যান দেখবেন আপনার এই কর্ম আপনাকে স্মরণ করে রাখবে।

অন্যের মায়ের বুক খালি করতে আপনার বিন্দু পরিমান বুক কাপবে না এটাই স্বাভাবিক তবে আর যদি মনে করেন,জঙ্গীবাদের জন্য নিজের প্রাণ দিতে প্রস্তুত তাহলে, দয়া করে আপনার নিজের সন্তান, নিজের স্ত্রী, বাবা-মাকে খুন করে প্রমাণ করুন যে আপনি ইসলামের জন্য সব কিছু করতে পারবেন?

আমরা আর পিছিয়ে যেতে চাই না। আপনাদের ধুগন্ধময় মস্তিষ্কের কারনে আমরা অনেকবার পিছলিয়ে পড়েছি আর নয়। সবার মনে সন্ত্রাসবাদের প্রতি ঘৃণা জন্মাক, ফিরেয়ে আসুক প্রগতির আলো এই প্রত্যাশা সকল বাঙালির প্রতি রইলো।….

লেখক : জাপান প্রবাসী সাংবাদিক। (লেখা ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।)

শেয়ার করুন