দলীয় ব্যানারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিনিধি : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের নিয়ম না থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এই নির্বাচনে দলীয় রাজনীতি থেমে থাকে না। শুধু প্রতীকটাকে নির্দলীয় রেখে নির্বাচন সংক্রান্ত যেসব কর্মকাণ্ড হয়, তার সবই দলীয় ভিত্তিতে হয়। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মারামারি-হানাহানির ঘটনাও ঘটেছে অসংখ্য। স্বাধীনতার পর থেকে এভাবেই চলে আসছে।

এমনই অবস্থায় গত ১ মে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সব স্তরের নির্বাচন দলীয়ভাবে করার পক্ষে মত ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও হিসাব-নিকাশ হয় দলীয়ভাবে। কোন দল থেকে কতজন জিতল বা হারল, সেই হিসাব করা হয়।  কিন্তু, দলীয়ভাবে নির্বাচন না হওয়ার কারণে তাদের কোনও দায়বদ্ধতা থাকে না। তারা কোনও অন্যায় করলে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। কাজেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য জাতীয় নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনও দলীয়ভাবে হওয়া উচিত।’

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এ অভিমতের পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আইন সংশোধনের প্রক্রিয়ায় জোর দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিষয়ক পাঁচটি আইনের সংশোধনীর অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে দলীয়ভাবে নির্বাচনের সুযোগ হতে যাচ্ছে।

দলীয় মনোনয়নে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল আইনের পাতায়। বাস্তবে দলীয়ভাবেই নির্বাচন হচ্ছে। দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে যেকোনও সমস্যার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো দায়ী থাকে। কাজেও সুবিধা হয়।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. ছহুল হোসাইন বলেন, দলীয়ভাবে এ নির্বাচন হলে অনেক যোগ্য লোক, যারা নিজেদের নির্দলীয় দাবি করেন, তারা আর ভোটে আসবেন না।

স্থানীয় সরকার নিয়ে দীর্ঘ কাজ করছে এমন একটি সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের কর্মকর্তা ড. বদিউল আলম মজুমদার সোমবার রাতে বলেন, দলীয় মনোনয়নে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হবে না। কেননা দলীয়ভাবে নির্বাচন করার আগে দলের সংস্কার করতে হবে। তিনি বলেন, এ আইন পাসের পর নির্বাচন হলে স্থানীয় সরকারগুলো ক্ষমতাসীন দলের দখলে চলে যাবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০ হাজার প্রার্থী এবার পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে পারেননি। তারা সরকারি দল করতেন না। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে স্থানীয় সরকার দখল হয়েছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ সব সরকারের আমলেই।

বিএনপির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন শুক্রবার দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার মেরে কেটে তথাকথিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায়, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে।’

দলের অবস্থান বিষয়ে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোয় দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয়। এটাকে নীতিগতভাবে সমর্থন না করার কোনও কারণ নেই। তবে বাংলাদেশে যেভাবে অপরাজনীতি চর্চা হয়, তাতে শঙ্কা জাগে, সেখানে ভিন্ন দলের লোকেরা নির্বাচিত মেয়র ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সত্যিকার নাগরিক সেবাটা পাবেন কি না।

পাঁচটি সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ওইসব নির্বাচনে দেখেছি শুধু দলীয় প্রতীক নেই। অথচ আমরা চেয়েছি, নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হোক। কিন্তু দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বীদের যেভাবে সমর্থন দিয়েছে, স্থানীয় নির্বাচন রূপ নিয়েছে জাতীয় নির্বাচনের। তাই দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে আমাদের আপত্তি নেই।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আইন সংশোধন হলে আমাদের সেভাবেই ভোট করতে হবে। তবে আইন পাস হওয়ার পর কিছু বিষয়ে বিধিমালা সংশোধন করতে হবে।

প্রসঙ্গত, আইন সংশোধনের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে বিল হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এ জন্য দীর্ঘ সময় দরকার। এটা এড়াতে শুধু পৌরসভা আইনটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। কেননা এ বছর শেষে পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইন সংশোধন হলে তিন শতাধিক পৌরসভায় দলীয়ভাবে ভোট করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

শেয়ার করুন