প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হচ্ছে ১৫০ জন!

ডেস্ক : জামালপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে চাকরি করতেন মোফাজ্জল হোসেন। গত বৃহস্পতিবার জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসার পরামর্শ দিলে সেই রাতেই তাকে নিয়ে আসা হয়। শুক্রবার সকালে অস্ত্রোপচার করে তার ডান পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। রোববার (২২ এপ্রিল) তার ডান হাতের মধ্যমাসহ আরও তিনটি আঙ্গুল অস্ত্রোপচার করা হয়।
২২ বছরের জান্নাত ছিলেন একজন পোশাক কর্মী। গত ২১ এপ্রিল সকালে যাত্রাবাড়ির চিটাগাং রোডে একটি তেলবাহী গাড়ির ধাক্কায় আহত হন জান্নাত। সঙ্গে সঙ্গে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে জান্নাতে বাম পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা।
গত ২০ এপ্র্রিল বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের চাপায় রোজিনা আক্তার নামের এক গৃহকর্মী আহত হন। দুর্ঘটনার পর পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং পরে চিকিৎসকরা তার ডান পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে, তারপরও রোজিনার অবস্থা সংকটাপন্ন। পায়ের বাকি অংশও ফেলে দিতে হয়েছে।
গত ১৭ এপ্রিল টুঙ্গীপাড়া থেকে গোপালগঞ্জ যাবার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হন টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেস নামক বাসের শ্রমিক হৃদয়। হৃদয় ছিল বাসের পেছনের দিকে বসা, দ্রুত গতির ট্রাকটি পাশ কাটিয়ে যাবার সময়ে বাসের পেছনের অংশে চাপা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের ডান হাতটি কেটে নিচে পড়ে যায়। হৃদয় এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এভাবেই প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় হয়তো হাত নয়তো পা অথবা হাত এবং পা দুইটায় হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও পঙ্গুত্বের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে ১৫০ জনের বেশি মানুষ। সমিতি বলছে, চলতি বছরের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার সাতশ ৭৯ টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে এক হাজার আটশ ৪১ জন, আহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৪৭৭ জন এবং এর মধ্যে পঙ্গু হয়েছেন ২৮৮ জন।
জাতীয় অর্থোপেডিকস হাসপাতাল ও ‍পুর্ণবাসন কেন্দ্র (পঙ্গু হাসপাতাল) এর জরুরি বিভাগ থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬৫ জনের মতো সড়ক দুর্ঘটনার রোগী আসছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত এক সপ্তাহে রোগী এসেছে ৩০ জনের মতো। চলতি মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত পঙ্গু হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন তিন হাজার ১ শত ২৯ জন। এর মধ্যে ১ হাজার দুই শত ৪৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পঙ্গু হাসপাতালের নিচতলায় অস্ত্রোপচার কক্ষের সামনে মেঝেতে বিছানায় একের পর এক রোগী। তারা সবাই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত। কারও হাত, কারও পা কাটা-কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের অনেককেই পঙ্গু জীবন যাপন করতে হবে।
সেফ রোড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অ্যালায়েন্স এর সমন্বয়ক সদরুল হাসান মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, একজন মানুষ যখন পঙ্গু হয়ে যায় তখন তার পুরো পরিবারটিই আসলে পঙ্গু যায়। আর বিষয়টি আরও ভয়াবহ হয় যখন তিনি হন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দুই বাসের চাপায় হাত এবং পরে প্রাণ হারানো রাজীব হোসেন মারা যাবার পর তার দুই ভাইকে সমাজের কাছে ঠাঁই খুঁজতে হয়েছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক রাজীব রয়েছেন যাদের মৃত্যুর পর পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে। এভাবেই পঙ্গু মানুষগুলোর গোটা পরিবারইটাই আসলে আজীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে যায়।
একইসঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা পঙ্গুত্ব আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে। আসলে সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, নয়তো এটা থামানো যাবে না। সড়ক পরিবহনের গোটা ব্যবস্থাপনাকেই উন্নত করা প্রয়োজন সেটা কেবল দুর্ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণ করা যাবে বলে আমি মনে করি না।
সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে যদি সুশৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে না আসা যায় তাহলে এভাবেই প্রতিদিন দেখতে হবে পরিবারের সক্ষম ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে পরিবারগুলোও পঙ্গু হচ্ছে বলেন সদরুল হাসান মজুমদার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান শাহীন বলেন, দুর্ঘটনা আগেও হতো, কিন্তু এখন দুর্ঘটনার বিভৎসতা বেড়ে গিয়েছে, বেড়েছে সংখ্যাও।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজীব হোসেনের জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধানও ছিলেন ডা. শামসুজ্জামান শাহীন। তিনি বলেন, রাজীবের মৃত্যু আমাদের দেখিয়ে যায়, আমাদের কিছু করা উচিত। কিন্তু এখানে দায়দায়িত্ব আমাদের সবার আছে। সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবেশ, ট্রাফিক সিস্টেম, রাস্তাঘাট সবকিছু এখানে জড়িত। এই সিস্টেমের জন্য আমাদের কিছু করা উচিত সেটা রাজীবের মৃত্যু আমাদের শিখিয়ে গিয়েছে।