বাংলাদেশে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির ভ্রান্তি

প্রকাশিত

মাসকাওয়াথ আহসান : গোটা পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র তন্ন তন্ন করে খুঁজে বাংলাদেশে খুব প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির মডেলের দেখা মেলেনা। বিশ্বের বিভিন্ন জাতির সংকটের মুহূর্তে ছাত্ররা বিপ্লব বিক্ষোভে যুক্ত হয়েছে; কিন্তু তারা কোন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে পথে নামেনি; পথে নেমেছে রাজনীতি সচেতন নাগরিক হিসেবে। উন্নত বিশ্বে ছাত্ররা রাজনীতি করে না। তারা পড়াশুনা করে, নিজেকে জাতিগঠনের একজন দক্ষ একক হিসেবে গড়ে তোলে। পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্ররা সমাজকর্ম, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকে। কিন্তু দলীয় ক্যাডার হয়ে ক্যাম্পাসে শ্লোগান দিয়ে তাদের ঘুরতে দেখা যায়না। অনুন্নত বিশ্বে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াতে এই প্রকট ছাত্র রাজনীতির নামে রাজনৈতিক দলগুলো কিছু ক্যাডার তৈরী করে। আর বাংলাদেশ সেক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এই বিশাল আয়তনের পৃথিবীতে মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল এলাকায় এমন অভিনব ছাত্র রাজনীতিকে কেন প্রয়োজন হচ্ছে। সফল গণতন্ত্রের দেশগুলো যদি ছাত্রদের রাজনীতিতে ব্যবহার না করেও গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়ে থাকতে পারে; শুধু বাংলাদেশে এর প্রয়োজন হচ্ছে কেন!

বাংলাদেশের যে কোন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ছেলেমেয়েরা বেশীর ভাগই পশ্চিমের দেশগুলোতে পড়ে। যেখানে ছাত্রের তপস্যাই হচ্ছে অধ্যয়ন। কিন্তু ঐ নেতারাই দরিদ্র বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের তাদের ছাত্র সংগঠনে লেঠেল হিসেবে গড়ে তোলে। একই ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশের জামায়াতে ইসলামী দলের প্রতিষ্ঠাতা আবু আলা মওদুদী এবং অন্যতম শীর্ষ নেতা গোলাম আজমের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তারা অধিকার বঞ্চিত ঘরের ছেলেদের তাদের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনে সংযুক্ত করেছে, সবাইকে শুধু মাদ্রাসায় পড়ার পবিত্র নির্দেশনা দিয়েছে। অথচ তাদের নিজেদের সন্তানেরা সবাই পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। এরা নিজেদের সন্তানকে কখনোই তাদের উদ্ভাবিত কট্টরপন্থী রাজনীতির ছাত্র শাখায় সংযুক্ত করেনি। এই হিপোক্রেসি আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতারাই করে চলেছে। গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে ছাত্র রাজনীতির বিকল্প নেই এমন একটি ন্যারেটিভ নিয়ে উচ্চকিত ফ্যাশনেবল ডেমোক্র্যাটদের সবার ছেলে মেয়ে হয় বিদেশে পড়ে বা দেশের রাজনৈতিক দলমুক্ত ক্যাম্পাসে পড়ে।শিক্ষার্জনে বিদেশগামী নিজের ছেলেটিকে বিমান বন্দরে বিদায় জানিয়ে ফিরে এসেই, গরীব মানুষের ছেলেদের নিয়ে গড়ে তোলা রাজনৈতিক ক্যাডার বাহিনীর সভায় বিশাল বক্তৃতা দেয় এইসব নেতারা। যাদের চোখে নিজের সন্তান রাজপুত্র আর দরিদ্রের ছেলেরা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া গিনিপিগ।

এখন রাজনৈতিক দলমুক্ত ক্যাম্পাস মানেই রাজনৈতিক সচেতনতামুক্ত ক্যাম্পাস নয়। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে এমনকি ক্লাসরুমেও রাজনৈতিক সচেতনতা জারী থাকে। দল বেঁধে শ্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস কাঁপিয়ে ছাত্ররাজনীতির মচ্ছব লাগিয়ে ফেলাটাই রাজনীতি সচেতন প্রজন্ম তৈরীর একমাত্র পথ নয়।

একটি প্রশ্ন বিজ্ঞজনেরা তুলে থাকেন; ছাত্র রাজনীতি না থাকলে নেতৃত্ব তৈরী হবে কোত্থেকে! খোদ যুক্তরাষ্ট্রে নেতৃত্ব তৈরী হয় কীভাবে! এর উত্তর; যুক্তরাষ্ট্রের শুধু ইয়েল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং ক্লাব উপহার দিয়েছে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনায়ক। পশ্চিমের নানাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে বিতর্ক চর্চা ও সামাজিক শ্বেচ্ছাশ্রমের মাঝ দিয়ে। গণতন্ত্রের জন্ম দিয়ে এর বিকাশ সাধন করে নাগরিকদের সুশাসন ও সুসরকার নিশ্চিত করতে পারা রাষ্ট্রগুলো যদি ছাত্র রাজনীতি ছাড়াই ভালো নেতৃত্বের জন্ম দিতে পারে; বাংলাদেশ সেখানে কোন অলীক রাষ্ট্র যেখানে লাখ ছেলের জীবন নষ্ট করে চালিয়ে যেতে হবে এই আত্মঘাতী ছাত্র রাজনীতি।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি থেকে কজন নেতা পেয়েছে বাংলাদেশ। যারা ভালো ছাত্র নেতা তাদের সাইডলাইনে ঠেলে দেয়া হয়েছে; কিছু বিপথগামী ছাত্র নেতাই নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। বাকী যারা শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছে তারা হয় ছাত্ররাজনীতির বাইরে থেকে আসা নেতার রাজপুত্র, শীর্ষ নেতাদের আত্মীয়, ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা বা সাবেক সেনা কর্মকর্তা। সুতরাং কল্পিত নেতা তৈরীর সূতিকাগার যে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতি নয়; এ তো প্রমাণিত সত্য।

রাজনীতির চর দখলের লড়াইয়ের লেঠেল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দরিদ্র সন্তানদের নীতি-আদর্শ-চেতনার মন্ত্রের ইন্দ্রজালে একটি অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেবার নরভোজী ও হৃদয়হীন প্রক্রিয়াটির নামই ছাত্র রাজনীতি।

এদেরকে হরতালে পিকেটিং-এ, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে এবং নিজেদের নানা হীন স্বার্থ চরিতার্থে এক একটি গ্যাং হিসেবে গড়ে তোলা হয়। মেক্সিকোর মাদক ব্যবসায়ীরা তারুণ্যকে যেভাবে গ্যাং-এ যুক্ত করে অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দেয়, বাংলাদেশের ক্ষমতাসক্ত রাজনীতিকরাও ঠিক তেমনি ছাত্র রাজনীতির নামে অপরাধচক্রে যুক্ত করে তৈরী করে গ্যাং। এই গ্যাং-গুলোকেই ছাত্র সংগঠনের তকমা লাগিয়ে বৈধতা দেয়া হয়।

ছাত্ররা নিজেরাই যদি কোন দলীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলে; ক্যাম্পাসে তাদের কার্যক্রমেরও একটি পরিসীমা থাকবে। কারণ তারা ছাত্র। তারা কেবলমাত্র ছাত্রদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্দোলন করতে পারবে এবং সেটিও সুশৃংখল অহিংস পদ্ধতিতে। জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের মতো প্রতিদিন জাতীয় রাজনীতি নিয়ে ক্যাম্পাস গরম করার কোন যৌক্তিকতা তো তাদের নেই। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশের ছাত্রেরা ইউনিভার্সিটির কোন নির্মাণ কাজে ঠিকাদারির টেন্ডার নেয় না, বা ক্যান্টিনে গায়ের জোরে বিনা পয়সায় খায় না, বা সন্নিহিত বাজার এলাকাগুলোতে চাঁদাবাজি করে বেড়ায় না। এটি একমাত্র বাংলাদেশে আদৃত এবং গৌরবের গেরুয়া পরানো এক দুষ্টচর্চা।

পৃথিবীর প্রতিটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং ক্লাবগুলো যুক্তি এবং সমাজ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞার চর্চা করে। বিতর্ক করতে গেলে বিস্তর পড়াশুনা করতে হয়, পলিটিক্যালি কারেক্ট কথা বলা শিখতে হয়, যুক্তি-প্রতিযুক্তির মাঝ দিয়ে মেধাকে শাণিত করতে হয়। ফলে বিতার্কিকদের মাঝ থেকে নানাক্ষেত্রে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে অনায়াসে। এমনকি আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রেও বিতর্ক ব্যবহৃত হয়; যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা যে কোন বিষয়ের ভালোমন্দ নানাদিক পর্যালোচনা করে, যে কোন সংকটের একটি ইতিবাচক সমাধানের পথে এগুতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশ মডেলের ছাত্র রাজনীতিকে নিরুতসাহিত করলেই তা সমাজকে বিরাজনীতিকরণ বা ডিপলিটিসাইজ করার ষড়যন্ত্র চলছে; এই যে জনপ্রিয় ন্যারেটিভ প্রচলিত রয়েছে তা ভ্রান্ত। এবং ছাত্র রাজনীতির প্রচলিত আত্মবিনাশী চরিত্রটি বদলানোর পরামর্শ উপস্থাপন করলে যারা তেড়ে ফুঁড়ে আসে; আগেই বলেছি তাদের নিজের ছেলে মেয়ে বিদেশে পড়ে; মিছিল-মিটিং-পিকেটিং করে বেড়ায় না। সুতরাং দরিদ্র পরিবারের ছেলেরা ছাত্র থেকে ছাত্রনেতা হয়ে আত্মবিনাশী ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টিকারী অপকর্ম করে বেড়ালে; তাতে শীর্ষ নেতাদের কোন ক্ষতি নেই। বরং লাভ; ছাত্র রাজনীতির নামে এমন গ্যাং পোষার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চাইবে কেন।

শীর্ষ নেতারা বৃদ্ধ হলে তাদের রাজপুত্র-রাজকন্যারা বিদেশ থেকে বিরাট ডিগ্রী নিয়ে ফিরে এলাকায় বাপের জমিদারী বা নির্বাচনী এলাকায় রাজনীতির পীরের উত্তরসূরী হিসেবে গদিনশীন হয়; আর ছাত্র রাজনীতিতে জীবন পুড়িয়ে দেয়া গরীবের ছেলেরা রাজপুত্র ও রাজকন্যার নির্বাচনী প্রচারণায় জীবনবাজি রাখে। রাজপুত্র-রাজকন্যার মন পাওয়ার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয় এই ছাত্ররাজনীতির নেতা কর্মীদের মাঝে। কারণ মন পেলে টেন্ডার ব্যবসা মন না পেলে বেকারত্ব। কারণ পড়াশুনা সে করেনি। সেতো ছাত্র ছিলোনা; রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ক্যাডার ছিলো। এই ফাঁদে আটকে দেশের লাখ লাখ তারুণ্য আজ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। যার ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ে সে কালেভদ্রে সাংসদ-মন্ত্রী হয়; নইলে আমৃত্যু বেকারত্ব আর এক টুকরো মূল্যায়িত হবার জন্য গুমরে কাঁদা। ছাত্র রাজনীতি যেন সেই আন্ডার ওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতের মতো; যেখানে ঢোকা যায়; কিন্তু বের হওয়া যায়না।

অথচ এই ছেলেগুলোই পড়ালেখা করলে; কোন একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করলে মানব সম্পদ হিসেবে দেশের কাজে আসতো; আত্মনির্ভরউন্নয়ন কৌশল অর্জন করে একটি সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারতো। কারণ সমাজের মানুষ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারদের ঘৃণা করে। কারণ এরা পার্টির নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি বা ভিক্ষাবৃত্তি করে।

বাংলাদেশে ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯-এ পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে ছাত্ররা সোচ্চার হয়েছিলো।সে ছিলো সময়ের দাবী এবং গৌরবের চিহ্ন। ৯০ এর গণ-অভ্যুত্থানেও ছাত্রদের ভূমিকা প্রশংসনীয় (যদিও ঐ আন্দোলনের পতিত স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতাসীন সরকারের অংশ)। কিন্তু এখন প্রচলিত ছাত্ররাজনীতিটি বৈশ্বিক ও সমসাময়িক বাস্তবতায় অপ্রাসঙ্গিক ও শিক্ষার পরিবেশের জন্য হানিকর। প্রত্যেকটি ক্যাম্পাস যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকবে তার ছাত্র সংগঠনের হাতে জিম্মি থাকবে, শিক্ষকদের নিঃগৃহীত ও অপমানিত করে বেড়াবে বিপথগামীরা; এই জঙ্গলের সংস্কৃতি থেকে অবশ্যই আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। উনি খুব সহজ করে কথা বলতেন। উনি ছাত্রদের বলেছিলেন, বাবারা পড়ো। কিছু শেখো। উনি কেবল প্রথাগত শিক্ষায় গিয়ে কেরানী না হয়ে ফলিত বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবার পরামর্শ রেখেছিলেন। উনি কল্পনাও করেননি ছাত্র নেতারা চাঁদাবাজি করে খাবে। উনি বরং ছাত্রদের বলেছিলেন, বাড়ীতে কিছু ফলমূলের গাছ লাগাতে, কিছু শাক-সব্জির চাষ করতে, নিজের পড়ার খরচ নিজেরা জোগাড় করতে; বাবা-মায়ের ওপর বাড়তি খরচের চাপ সরিয়ে নিতে। উনি জানতেন সভ্য দেশগুলোতেও ছাত্ররা কাজ করে নিজের পড়াশুনার খরচ নিজেরাই চালায়।

তাই প্রচলিত ছাত্র-রাজনীতির কাঠামোটি পুনর্ভাবনা এই মুহূর্তে খুবই জরুরী। জনমানুষের কল্যাণেই রাজনীতি বা জননীতির উদ্ভব। তাই ছাত্র রাজনীতির নামে ফ্রাংকেস্টাইন তৈরীর তামাদি হয়ে যাওয়া এই অপসংস্কৃতিটি দূর করতে হবে। রাজনীতি সচেতন মানুষ তৈরীর জন্য গ্যাং পোষার আর কোন যৌক্তিক কারণ দেখিনা।

শেয়ার করুন