বাউল আবদুল করিমের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত

সিলেট প্রতিনিধি : আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, আমারে কেউ ছুঁইওনাগো সজনি/ গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে/ বসন্ত বাতাসে সইগো বসন্ত বাতাসে/ আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম/ বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে /আমি সেই মিনতি করিরে, সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে, গান গাই আমার মনরে বুঝাই মন থাকে পাগলপাড়া, আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া- এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা বাউল শাহ আবদুল করিমের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠার চরম শিখরে পৌঁছা এই বাউল ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ইব্রাহিম আলী আর মাতা নাইয়রজান বিবির আদরের এই সন্তানকে পারিবারিক দরিদ্রতার কারণে বুঝতে শেখার সময় থেকেই জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ে মাত্র আটদিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণেরর সুযোগ হয় তার। বেঁচে থাকার তাগিদে রাখালের কাজ দিয়ে শুরু হয় তার কর্মজীবনের অধ্যায়। রাখাল থেকেই কালপরিক্রমায় বাউল সম্রাটে পরিণত হন তিনি। জীবদ্দশায় লেখেন প্রায় দেড় হাজার গান।

গুণী এই সংগীত শিল্পীর জীবন কেটেছে অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে। জীবনের চড়াই-উৎড়াই, কোনও কিছুই তার সঙ্গীত সাধনা ঠেকাতে পারেনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাউল ও আধ্যাত্মিক গানের তালিম নিতে থাকেন কমর উদ্দিন, সাধক রশিদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহীম মোস্তান বকশের কাছে। দীর্ঘ শিল্পী জীবনে বাউল ও আধ্যাত্মিক গানের পাশাপাশি ভাটিয়ালি গানেও অবাধ বিচরণ ছিল তার। ভাটিবাংলার জল-হাওয়া-মাটির গন্ধ আর কালনী-তীরবর্তী জনজীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ, দারিদ্র্য-বঞ্চনা, জিজ্ঞাসা, লোকাচার, স্মৃতি প্রভৃতি তার গানে এক বিশিষ্ট শিল্প সুষমায় উঠে এসেছে। খুব সরল, সাবলীল তার গানের বাণী, যা সহজেই মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

শাহ আবদুল করিম কাগমারী সম্মেলনে গান করে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের শ্রদ্ধা আদায় করে নেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অসংখ্য জাতীয় নেতা তার গানে বিমোহিত হয়েছিলেন।

তার লেখা বইগুলো হচ্ছে- ‘আফতাব সঙ্গীত’ (আনু. ১৯৪৮), ‘গণসঙ্গীত’ (আনু. ১৯৫৭), ‘কালনীর ঢেউ’ (১৯৮১), ‘ধলমেলা’ (১৯৯০), ‘ভাটির চিঠি’ (১৯৯৮), ‘কালনীর কূলে’ (২০০১) ও ‘শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র’ (২০০৯)।

শাহ আবদুল করিমকে তার কালজয়ী সৃষ্টির স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়। এছাড়া ২০০৪ সালে মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, ২০০৫ সালে সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সম্মাননা, ২০০৬ সালে অভিমত সম্মাননা, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, ২০০৮ সালে খান বাহাদুর এহিয়া এস্টেট সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাকে।

নাগরিক মরীচিকা শাহ আবদুল করিমকে কখনো আটকাতে পারেনি। তিনি তার ধ্যানের নীল আকাশ হাওর-বাঁওড় নদীবেষ্টিত উজানধল গ্রামেই কাটিয়েছেন জীবনের পুরোটা সময়। ১৯৪৬, ১৯৮৫ ও ২০০৭ সালে তিনি বিলেত ভ্রমণ করেন।

শাহ আবদুল করিম ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে অবসান হয় একটি যুগের।

বাউল সম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে দিরাইয়ের উজানধলে তার সমাধিস্থলে স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শনিবার এ সমাধি ফলকের কাজের উদ্বোধন করা হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন, “বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম তার ইচ্ছার কথায় জানিয়েছিলেন সমাধিস্থলে শুয়েই যেন তিনি আকাশ, চাঁদ ও সূর্য দেখতে পান এবং তার কবরস্থান যেন মাজারে পরিণত না হয়। তাই তার ইচ্ছে অনুযায়ী একটি আধুনিক ডিজাইন করা হয়েছে। খুব দ্রুত এ স্মৃতি ফলকের কাজ সমাপ্ত করা হবে।”

শেয়ার করুন