বিদেশিদের কর্মস্থল-বাসস্থান গোয়েন্দা নজরদারিতে

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশে অবস্থানরত বিদেশিদের ওপর নজরদারি শুরু হয়েছে  গোয়েন্দাদের। বিদেশিদের  কর্মস্থল ও বাসস্থান চিহ্নিত করার কাজও শুরু করেছেন তারা। কূটনৈতিক জোন, ইপিজেড ও কমার্শিয়াল এলাকাসহ যেসব এলাকায় বিদেশিরা অবস্থান করেন তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সারাদেশে বৈধভাবে প্রায় দুই লাখ বিদেশি অবস্থান করছেন। এ  ছাড়া অবৈধভাবে বসবাস করছেন আরও ২৩ থেকে ২৪ লাখ। সারাদেশের পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জঙ্গি কার্যক্রম মনিটরিং ও বিদেশিদের নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়াতে একটি টাস্ক গ্রুপও গঠন করা হয়েছে। বিদেশিদের যাতায়াতের পথ, বিনোদনের স্থান ও সামাজিক যোগাযোগ অবস্থানে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, গত ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের  তদন্তে অগ্রগতি আছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে এ ঘটনার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি সংশ্লিষ্টরা। তবে ঢাকার গুলশানে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালির  নাগরিক হত্যাকাণ্ডের  বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও অগ্রগতি নেই। এ সব বিষয় ছাড়া বিদেশিদের ব্যাপারে নিরাপত্তামূলক কী কী  ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের জানিয়েছেন পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমও  উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময় মাদক ব্যবসা ও হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেক বিদেশিকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন গোয়েন্দারা। এছাড়া, বেশিরভাগ বিদেশি কোথায় কী ধরনের কাজ করছেন, তার বেশিরভাগ তথ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নেই। তাই এবার তাদের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সন্দেহজনক হলে আটক করা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে।

গোয়েন্দারা জানান, বিদেশি নাগরিকরা অবৈধভাবে অবস্থান করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করার পাশাপাশি অস্ত্র, স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, বিভিন্ন দেশের জাল নোট তৈরি, ডলার জালিয়াতি ও জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, ভারত, নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, তাইওয়ান, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, চীন, তানজানিয়া, উগান্ডা ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের বিরুদ্ধেই এ সব অভিযোগ বেশি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে দুই শতাধিক বিদেশি নাগরিককে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে আফ্রিকান নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। তাদের মধ্যে পাকিস্তানিও রয়েছে। যাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ সদর দফতরে এসপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন আইজিপি। দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। যেকোনও মূল্যে এ পরিস্থিতি উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতেও কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।

পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ শাখার সহকারী মহা-পুলিশ পরিদর্শক (এআইজি) মো. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইতালিয়ান নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়াসহ সারাদেশে বিদেশি নাগরিকদের আবাস ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিদেশিদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের মাধ্যমে এসব ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছেন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজার ও জাপানি নাগরিক ওসি কোনিও’র হত্যাকাণ্ড দুঃখজনক। বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশিদের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো ছাড়াও নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা বিদেশিদের হত্যা করতে পারে। তাছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

শেয়ার করুন