যে দেশে মৃতের জন্য শোক, শ্রদ্ধাও ‘দুই নম্বর’!

প্রকাশিত

হাসান শান্তনু : স্বনামধন্য এক টিভি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোক, শ্রদ্ধা প্রকাশের মতো পরম মানবিক বিষয়টিও এ দেশে নিয়ন্ত্রিত হয় তাঁর রাজনৈতিক লেজুড়বাজির ভিত্তিতে! মৃত ব্যক্তি বেঁচে থাকাকালে কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে কতোটুকু ছিলেন, এর চুলচেরা বিশ্লেষণের নিরিখে ‘সহজ-সরল বাঙালি জাতির’ রাজনীতিক, সুশীল সমাজের একাংশ ও সুবিধাবাদী শ্রেণির মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী শোক, কুৎসা প্রকাশ করে থাকে। বা কখনো নিরব থাকে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ মারা যাওয়ার পর অনেকের শোক না প্রকাশের ‘রাজনীতির’ দিকটা আবারও সামনে এসেছে।

মোস্তফা কামাল ছিলেন বিটিভির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান নির্মাতা ও এর স্বর্ণ যুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। দেশের টিভি মাধ্যমের ইতিহাসে বিটিভি ও মোস্তফা কামাল প্রায় সমার্থক। এ পর্যন্ত টিভি শিল্পের অনুষ্ঠান বিভাগের সবচেয়ে সফল ও মেধাবী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের সময়ে তিনি ছিলেন বাংলাদেশে পাকিস্তান টেলিভিশনের প্রযোজক। তিনি সেই সময় নির্বাচন নিয়ে বেশ কিছু অনুষ্ঠান তৈরি করেন। যেগুলোর সময় ছিল ১০ মিনিট করে। বিটিভি থেকে অবসরের পর এনটিভিতে অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ ১৭ বছর, আমৃত্যু তিনি এনটিভিতে ছিলেন।

দেশের টিভিতে অনন্য অবদান রাখা মোস্তফা কামাল একেবারে ব্যতিক্রমি, আলাদা জীবনযাপন করতেন। এড়িয়ে চলতেন বিভিন্ন প্রযুক্তিও। তিনি কখনও মুঠোফোন সেট ব্যবহার করেননি। তেমনই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিলো না। ফলে তিনি ‘আমাদের দলের, নাকি অন্য দলের’- এ দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে না পারায় রাজনৈতিক দলের নেতাসহ অনেকেই তাঁর মৃত্যুুতে শোক প্রকাশ করতে পারেননি। এর প্রভাব পড়ে সাংবাদিক সমাজেও।

মোস্তফা কামাল ব্যক্তিজীবনে আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। চর্চিত ভদ্রলোক নন; মজ্জাগত ভদ্রতা, সৌজন্য ছিলো তাঁর হৃৎপিণ্ডজুড়ে। প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ এনটিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর মোস্তফা কামালের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়। সাপ্তাহিক এখন পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এনটিভির ভবনে একসময় কর্মস্থল থাকায় দীর্ঘদিন অনেকটা কাছ থেকে তাঁকে প্রায়ই দেখেছি। লিফটের জন্য অপেক্ষমান মৃদুভাষী কামাল ভাইকে বরাবরই দেখেছি, লিফটে সবাইকে আগে ওঠার ব্যবস্থা করে দিতেন। এমনকি অতি সাধারণ একজনকেও।

যে দেশে শোক, শ্রদ্ধা, আবেগ, শুভেচ্ছা দুই নম্বর- সে দেশে মোস্তফা কামালের মতো ব্যক্তিত্বদের চিরপ্রয়াণের পর রাজনৈতিক বিচারে শোকের দরকার নেই। গণমাধ্যমের ইতিহাস বলতে যা আছে, সেখানে তাঁদের নাম অর্জনের ভিত্তিতে লেখা থাকবে বহুকাল পর্যন্ত। রাজনৈতিক কালি দিয়ে চাইলেই কেউ তা মুছে ফেলতে পারবেন না। ওপারের জীবনে ভালো থাকুন, কামাল ভাই। বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

শেয়ার করুন