রাজধানীতে হঠাৎ করে ডেঙ্গুর প্রকোপ

প্রকাশিত

ডেস্ক প্রতিবেদন : হঠাৎ করেই রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়ে গেছে। গত তিন মাসে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে ৫৯৭ জন। এর মধ্যে চলতি মাসের চারদিনে পাওয়া গেছে ৬০ জন রোগী।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, বিষয়টা এখনও আতংকের পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে উদ্বেগ রয়েছে। কেননা ঢাকা ও ঢাকার বাইরের চার ব্যক্তি ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। কর্মকর্তাদের দাবি, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, এ বছরের মে মাসে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দুজন নির্বাচিত মেয়র দায়িত্ব নিলেও ডেঙ্গু মৌসুমের আগে পর্যাপ্ত প্রচারণা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম নেওয়া হয়নি। তাই মানুষ কিছুটা অসতর্ক থাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা বিস্তার লাভ করে। পরিণতিতে এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু জ্বরে প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

মশক নিধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, অভিজাত এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।

গত ৪ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আয়োজিত এক র‌্যালিতে অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, এবার ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন তৎপর রয়েছে। এ ব্যাপারে নগরবাসীকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বৃহস্পতিবার দুপুরে জানান, এবার ধানমন্ডি, কলাবাগান, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বায়তুল আমান হাউজিং, নূরজাহান রোড, মতিঝিল, বেইলি রোড প্রভৃতি এলাকায় এডিসের উৎপাত বেশি। মূলত এসব এলাকা থেকেই লোকজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতাল, হলিফ্যামিলি হাসপাতাল, ইবনেসিনা হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।

তিনি বলেন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গুর মৌসুম ধরা হয়। ৮ জুলাই আমরা মনিটরিং কার্যক্রম শুরু করেছি। সেদিন থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে ৫৯৭ জন। ৪ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত চারদিনে রোগী পাওয়া গেছে ৬০ জন। এদের মধ্যে ৪ অক্টোবর রোগী পাওয়া গেছে ১৬ জন, ৫ অক্টোবর পাওয়া গেছে ১২ জন, ৬ অক্টোবর ২১ জন এবং ৭ অক্টোবর ১১ জন।

ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৫২৩ জন। এদের মধ্যে ২৩৫ জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ২১১ জন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং বাকি ৭৭ জন্ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলার চারজন্ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, লম্বা সময় ধরে টানা বর্ষণ হয়েছে। এডিস মশা মানুষের বাসা-বাড়ির ভেতরে ও আশপাশের জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে জন্মায়। বৃষ্টির পানি বেশি দিন আটকে থাকায় এডিসের বংশ বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ডেঙ্গু মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে এবার আমরা মে মাস থেকে প্রচারণা শুরু করি। জনসচেতনতা বাড়াতে বয়াতি আলম দেওয়ান ও তার দল নিয়ে পাঁচদিনব্যাপী রোড শো করেছি। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ হয়েছে। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে, সেসব এলাকায় মশক নিধনের ওষুধ ছিটানো হয়েছে।

ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আশা করি আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এ নিয়ে নগরবাসীকে আতংকিত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, ডেঙ্গু মূলত ভাইরাসজনিত জ্বর। এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের একমাত্র বাহক। এ মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়ায়। এডিস মশা দিনের বেলায়, সাধারণত ভোরে ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের পর ৩-১০ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

ডেঙ্গু সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে- ক্লাসিক্যাল ও হেমোরেজিক। ক্লাসিক ডেঙ্গুর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর (শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়), মাথা ব্যাথা, চোখের পেছনে ব্যাথা, পেটে ব্যাথা, মাংসপেশী ও হাড়ে ব্যাথা, মেরুদণ্ডে ব্যাথা, বমিবমি ভাব, শরীরে হামের মতো দানা দেখা দেওয়া।

হেমোরেজিক ডেঙ্গুর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে (উপরের লক্ষণগুলোসহ)- চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ, চোখে রক্তজমাট বাঁধা, নাক, মুখ ও দাঁতের মাড়ি বা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, রক্তচাপ হ্রাস, নাড়ির গতি দ্রুত হওয়া, ছটফট করা, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হয়ে পড়া, রোগী শিশু হলে অতিরিক্ত কান্না বা অস্থিরতা এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, লালচে/কালো রংয়ের পায়খানা হওয়া।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বর সাতদিনের মধ্যে এমনিতেই সেরে যায়। রোগীকে উপসর্গ অনুসারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে ও বিশ্রামে রাখতে হবে। প্রচুর পানি ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু হলে দ্রুত জ্বর কমানো অত্যন্ত জরুরি। এজন্য মাথা ধোয়া, ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছা ও প্যারাসিটামল খাওয়াতে হবে। অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ কোনওভাবেই খেতে দেওয়া যাবে না। মারাত্মক (হেমোরেজিক) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।

ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায় হল এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ। বাড়ির ভেতর, বাইরে ও ছাদে এবং আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা পাত্রে স্বচ্ছ পানি জমলে এডিস মশা জন্মায়। গাড়ির অব্যবহৃত টায়ার, নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত চৌবাচ্চা, পরিত্যক্ত টিনের কৌটা, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, গাছের কোটর, পরিত্যক্ত হাড়ি, ডাবের খোসা, ড্রাম, ফুলের ও গাছে টব, ফ্রিজ ও এয়ারকন্ডিশনারের নিচে জমা পানিতে এডিস জন্মায়। এসব পাত্রে পাঁচ দিনের বেশি পানি জমলেই এডিস জন্মায়। তাই এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করলে এডিসের বংশ বিস্তার রোধ এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

শেয়ার করুন