রিজিকের জন্য আল-রাজ্জাকের ওপর ভরসা রাখুন

প্রকাশিত

নুসরাত জাহান : বাসার পিছনের বাগানে ভেজা কাপড় রোদে দিয়ে ঘরে ফিরে আসার সময় লক্ষ্য করলাম একটা আধা খাওয়া আপেল মেঝেতে পড়ে আছে । আপেলের উপর অসংখ্য পিঁপড়া । আপেলটা বড় ছেলেটাকে দিয়েছিলাম খেতে দুইদিন আগে । সেদিন আপেলটা মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে তুলে ময়লার ঝুড়িতে ফেলবো ভেবেও পরে ভুলে গেলাম । ভাবছিলাম সেদিন আপেলটা ফেলে দেওয়ার কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লাই নিশ্চিত ভাবে আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন কারণ এই আপেলের বাকি অংশ ছিলো পিঁপড়াদের রিযিক ।

গ্রামের বাড়িতে দেখেছি অনেক সময় এক প্লেট ভাত খেতে যাবো এমন সময় হাত থেকে উল্টে পড়ে খাবারগুলো মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে । এরমধ্যে হুট করে কোথা থেকে একটা বিড়াল এসে খাবারগুলো খাওয়া শুরু করে দেয় । আমরা আফসোস করতে থাকি কিংবা রাগে ফেটে পড়ি নিজের কেয়ারলেসনেসের কারণে । অথচ এভাবে কখনও ভাবিনা এই খাবার আমার নয় বরং বিড়ালটার রিযিকে ছিলো ।

এমনিভাবে শারীরিক রিযিক টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা তাঁর সৃষ্টির সকলের মধ্যে যাকে চান তার নিকট পৌঁছে দেন সীমিত আকারে অথবা বেশুমার ভাবে ।

“ এমন অনেক জন্তু আছে, যারা তাদের খাদ্য সঞ্চিত রাখে না। আল্লাহই রিযিক দেন তাদেরকে এবং তোমাদেরকেও। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
[ সুরা আনকাবুত, ৬০]

আমরা এই মুহুর্তে অনেকেই আর্থিক রিযিক নিয়ে পেরেশানির মধ্যে যাচ্ছি । মহামারীর এ ক্রান্তিকালে অনেকেরই উপার্জনের রাস্তা প্রায় বন্ধ হবার যোগাড় । একটা সত্য ঘটনা শুনলাম দুদিন আগে একটা লেকচারে । চোখের পানি আটকানো কঠিন হয়ে পড়ছিলো ।

শায়েখ হাতিম আল আসাম (রাহি.) একবার হজ্জ্বে যাবার ইচ্ছা পোষণ করে স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে খোলাসা করলেন । স্ত্রী তাতে নিরুৎসাহিত করে বললেন, আপনি এখন হজ্জ্বে গেলে আমাদের কি হবে ? আমরা চলবো কি করে ? আপনি বরং এখন আপাতত এ চিন্তা বাদ দেন । যখন বাড়তি কিছু টাকা হবে তখন যাবেন । তাদের দুজনের কথোপকথনের মাঝে উপস্থিত ছিলেন তাদেরেই দশ বছর বয়সী বড় কন্যা । মেয়েটি সব শুনে তার বাবার উদ্দেশ্যে বললো, আব্বাজান আপনি নিশ্চিন্তে হজ্জ্বে চলে যান । আল্লাহ আর-রাজ্জাক তো আছেন । তিনি অবশ্যই আমাদের দেখবেন । মেয়ের কথা শুনে শায়খ হাতিম আল আসাম যেন মনে সাহস পেলো এবং দিন ক্ষণ বুঝে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে রওনা করলেন ।

তার সপ্তাহ দুয়েক পরের কথা । ততদিনে শায়খের রেখে যাওয়া পয়সা শেষ হয়ে যাওয়ার ঘরে খাদ্যের সংকট দেখা দিলো । শায়খের স্ত্রী ও তার অন্যান্য ছোট সন্তানেরা বড় মেয়েটাকে তাচ্ছিল্য করে বলছিলো, এখন আমাদের কি হবে ? খুব তো আব্বাজান কে যেতে দিলে আর আল্লাহ দেখবেন বললে । এখন তো ঘরে কোন খাবারও নেই আর খাবার কেনার জন্য পয়সাও নেই ।

মেয়েটি তাদের কথার জবাব না দিয়ে ভেতরের কক্ষে গিয়ে দু’হাত মুনাযাতে উঠিয়ে বলতে লাগলো –

‘ আল্লাহ ! আপনার ওয়াদা তো সত্য । আপনি তো বলেছেন,

“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন । এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন।” [ সুরা আত-তালাক, ২-৩]

আল্লাহ আমি তো আপনার উপর পরিপূর্ণ ভরসা করলাম ।’

এরই মধ্যে দরজায় করাঘাত হলো । মেয়েটা দরজা খুলে দেখলো, সুন্দর পোশাক পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে । লোকটি বললেন, আমাদের গভর্নর সাহেব যাচ্ছিলেন এ রাস্তা দিয়ে । উনি খুব পিপাসার্ত । একটু পানি হবে উনার জন্য ?

মেয়েটি খুব সুন্দর একটা পেয়ালায় পানির ব্যবস্থা করলেন । গভর্নর পানি পান করে অত্যন্ত তৃপ্ত হলেন এবং অধস্তন লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ওহে ! এ পানি কোন বাড়ি থেকে এনেছো, এত সুস্বাদু পানি আমার জীবনে কমই পান করেছি ।

অধস্তন লোকটি বললেন, হুজুর, এ শায়খ হাতিম আল আসামের বাড়ি । গভর্নর বললেন, চলো তাকে গিয়ে সালাম বলে আসি । লোকটি বললেন, হুজুর তিনি তো বাড়ি নেই, হজ্জ্বে গিয়েছেন । গভর্নর বললেন, তবে তো তার পরিবারের সকল প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব এখন আমাদের । এ বলে তিনি তার জামার পকেট থেকে এক থলে স্বর্ণ মুদ্রা মেয়েটির বাড়ির দরজার সামনে রেখে দিলেন এবং সাথে থাকা উনার সকল অধস্তন লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা যারা আমাকে পছন্দ করো তারাও আমার মত অনুরুপ এ পরিবারটিকে কিছু দাও । এ কথা শোনার সাথে সাথে সেখানে উপস্থিত সকল ব্যক্তি তাদের পকেটে রাখা সব স্বর্ণমুদ্রা গুলো দরজার সামনে জমা করে প্রস্থান করলেন ।

মেয়েটির মা এবং অন্যান্য বোনেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লো কিন্তু কাঁদছে শুধু মেয়েটা । তা দেখে মেয়েটার মা বললেন, তুমি কাঁদছো কেন ? যখন আমাদের কিছু ছিলোনা তখন কাঁদোনি আর এখন এত সম্পদ পেয়ে কাঁদছো ?

মেয়েটি জবাবে বললো, একটা ব্যপার ভেবে কাঁদছি । দুনিয়ার এক মামুলি গভর্নর শুধু পানি পান করে খুশি হয়ে এতকিছু দিয়ে দিলো আর উভয় জাহানের বাদশা রাব্বুল আরশিল আযীম যখন বান্দার উপর খুশি হয়ে যান তখন তিনি তাঁর বান্দার প্রতি না জানি কিরুপ আচরণ করেন !!

“ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা রুযী প্রশস্ত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সংকুচিত করেন। তারা পার্থিব জীবনের প্রতি মুগ্ধ। পার্থিবজীবন পরকালের তুলনায় অতি সামান্য সম্পদ বৈ আর কিছু নয়।”

[ সুরা আর-রাদ, ২৬ ]

শেয়ার করুন