রোগের নাম যখন ‘বর্ণ- বাদ’

প্রকাশিত

জসিম সরকার : বর্ণ নিয়ে আমাদের চিন্তার শেষ নাই. অবহেলা, কুনজর, অপমান, বৈষম্য আর নানা শব্দ আমাদের প্রতিদিন অনকে ভাবনায় রাখছে বলা যায়. তাহলে এই বর্ণ নিয়ে ভাবনা-দুর্ভাবনা প্রকট হচ্ছে কেন. আর কেনই বা হাজার বর্ণ বিষয়ক প্রশ্ন ঘিরে ধরছে! সমস্যা কি বর্ণে নাকি অন্য কোথাও. মার্টিন লুথার কিং বা নেলসন ম্যান্ডেলা বা বর্ণবাদ নিয়ে ইতিহাস চর্চা বা সেগুলোর বিশ্লেষণ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়. দেশে থাকার সময় বর্ণ নিয়ে নাক সিটকানো আমাদের ধরণ- কালো , আফ্রিকান বা ব্ল্যাক অনেকটা ভালো করেই বুঝিয়ে দেয় আমরাও বর্ণ-বাদী- এই অভিযোগের বাইরে নই. কিন্তু দেশের বাইরে আসার পর নতুন করে দেখছি, দেশের মানুষের বর্ণবাদ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা ও তাদের বর্ণবাদ বাস্তবতার চেয়ে সবকিছুকে ‘বর্ণবাদ’ এরে শিকার মনে করে সবকিছুকে একই কাতারে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা. আপনি যখন নিজেই আরেকজনকে নানা বর্ণে চিত্রিত করে আনন্দ পান তখন নিজের কাছে এই রোগের শিকার মনে হবার কি কোনো যুক্তি আছে! আপনি কেন মনে করবেন, দেশের বাইরে আসছেন, তাতে সবাই আপনারে সালাম দিয়ে সবকিছু আগায়, পেছায় দেবে বা আপনাকে তাদের আচরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে যে তারা আসলে বর্ণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলছেনা. নিজে অন্য জায়গায় এসে কি চেষ্টা করেছেন তাদেরকে জানার জন্য. আপনি বিদেশে এসে সব সময়ই চান, এখানে ভাল চাকরি পাবেন, অনেক অনেক টাকা কামাবেন, না পেলে সেটা বর্ণবিদ্বেষ! আপনি এখানে বছরের পর বছর আছেন, থাকছেন, তারপরও প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত আপনার অভিযোগ- এরা বর্ণবাদী. অাপনি নিজে কি কখনো চিন্তা করেছেন-ভেবেছেন- আপনার নিজের দেশে অন্য দেশ থেকে কেউ আসলে তার সাথে আপনি কেমন আচরণ করেছেন, সেটা কি আসলেই সমতার, সমান সুযোগের? বাংলা না জানা একজনকে চাকরি, একজন বাঙ্গালীর মতোই সবকিছু দেয়া তো দূরের, আপনি আসলে প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিভাবে দেখেন বা কিভাবে দেখে অভ্যস্ত! দেশে কি করতাম বা করতাম না এগুলা বলে লাভ নাই, এসব বিদেশীরা আসলেই বর্ণবাদী! হ্যাঁ, আপনার চোখ এভাবেই দেখে সব. দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এখানেই কাটিয়ে দিতে ভালোই লাগছে আপনার. আবার প্রতি মূহূর্ত এরা বর্ণবাদী এটাও আপনার মুখে ফেনা তুলে সব সময়. অন্য দেশে এসে সে দেশের মানুষরে মনোভাব, সাংস্কৃতিক, জীবনযাপন এসব জানার, বুঝার বা কৗেতুহলী মন নিয়ে দেখার কি চিন্তা করেছেন কখনো- করবেন না, করেই বা কি! এরা আসলেই খারাপ, এদের এটা, ওটা ভালো না. হ্যাঁ, আপনি আরেক দেশ, ভাষা, সংস্কৃতির কাছে এসে চান সবকিছু আপনার দেশের, শহরের বা গ্রামের মতো হোক বা আপনি চান সেরকম থাকুক. এটা নাই মানেই এখানে কোনো রসবোধ নাই. আপনি মনে করেন, এদের ভাষা, সংস্কৃতি শেখার কোনো মানে নাই. এগুলা খারাপ. এইসব কিছু কি প্রমাণ করে না আপনি নিজেই বর্ণবাদ রোগে আক্রান্ত কিনা! আপনি হয়তো ইতোমধ্যে অভিযোগ করার জন্য তৈরী হয়েছেন- তাহলে এরা কি বর্ণবাদী না. এখানে চাকরি পাওয়া যায় না, দেখলে কথা বলেনা, নিজেরা আগে চাকরি নিজ দেশের মানুষদের, বিদেশীদের পদে পদে নানা বাঁধা. হ্যাঁ এগুলা কি এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক না! আপনি চান আপনার মনে মতোই তারা আপনাকে সুবিধা দিক, না দিলেই কারাপ. দিলে আরো বেশি দিক, না দিলেই খারাপ. আপনার নিজের ‘বর্ণবাদ’ রোগের কারণে আপনি শুধু পেতে চান, খেতে চান, আরো চান, চাইতেই থাকেন. আপনার এই অভ্যাসের মধ্যে তাদের জানা, বুঝা, দেখা, এসব কিছু গৗেণ! এগুলা না জেনে কিভাবে বৈষম্য কমবে বলে আপনি ভাবেন! বৈষম্য না থাকুক চাইবেন, আবার বিদেশে এসে সেখানে মানুষ, জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, ভাষা নিয়ে সারাক্ষণ নাক সিটকায়ে যাবেন- এটা কি আপনার দ্বিমুখীতা নয়! যেকোন কিছুতে আপনি খুঁজে বেড়ান তারা কতটুকু বর্ণরোগে আক্রান্ত! কখনো কেন ভাবেন না যে- আপনি নিজেই আসলে সেই রোগের বড় রোগী. আয়না আসলে সব জায়গায় একই রকম. দেশে থাকলে দেখুন নিজের চেহারা আপনি নিজে কতটুকু বর্ণরাগে আক্রান্ত- বিদেশে থাকলেও দেখুন নিজেই আপনি কিভাবে রোগ্রাক্রান্ত হয়ে দিন কাটাচ্ছেন. আয়না পরিষ্কার থাকলে উত্তর পেতে বিলম্ব হবে না. তবে, এটাও আমি বলি না যে , বর্ণ রোগের কারণে বিদেশীদের নানাভাবে বঞ্চিত রাখছে বিদেশে. তবে সেটার জন্য নিজে কি রোগমুক্ত হয়ে ভাবছেন যে কি আপনার করণীয়. নাকি আজীবন পাই না পাই না, কেন পাই না, কেন দেয় না, দেয় না কেন- এরা খারাপ. কেন আরো বেশি পাই না, কেন আরো বেশি দেয় না-এরা খারাপ! আয়না দেখে ভাবুন, আরো ভাবুন রোগটা আপনার মধ্যেই প্রকট কিনা. আপনি যখন অন্যখানে এসেছেন নিজেই যেচে, কখন এটা আসলে কার রোগ!- চোখটা আরো পরিষ্কার করুন. এতেই রোগ নিয়ে জ্ঞান, ভাবনা পরিষ্কার হবে.

(লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন