শুধু ধনীর দুলাল-দুলালীরাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না

প্রকাশিত

আনিস আলমগীর : 

বৃহস্পতিবার ১০ এপ্রিল যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথ অচল করে দিয়েছিলো ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’-এর দাবিতে, তখন সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ছাত্রদের দিতে হবে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরাই দেবেন। এটা তারা দিতে রাজীও হয়েছেন।’

এনবিআর থেকে বার বার মোবাইলে মেসেজ পাঠানো হচ্ছে যে- বিদ্যমান টিউশন ফি’র মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভূক্ত থাকায় ভ্যাট পরিশোধ করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের, ছাত্রদের নয়।’

অবশ্য প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি মালিকদের সংগঠনের সভাপতি শেখ কবির এরইমধ্যে বলে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভ্যাট দেওয়ার খবর ঠিক নয়। তারা ছাত্রদের হয়ে কোনও ভ্যাট দেবেন না।

আমি জানি প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন সেটা অতি আন্তরিকতার সঙ্গে বিশ্বাস করে বলেছেন। এনবিআর যা বলেছে, সেটা অতি চালাকি করে বলেছে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করছেন যে এটা মালিকরা বহন করবে। যদিও ছাত্র-অভিভাবক কেউ বিশ্বাস করছে না প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি মালিকরা এটা বহন করবে। 

এনবিআর-এর মেসেজ যদি সত্য ধরে নেই, তবে বলতে হবে- তাহলে গত দুই মাস ধরে এই নিয়ে আন্দোলন, হাইকোর্টে রিটের পর রিট করলেও তারা কেন সেটা জানালো না। প্রথমে ১০, পরে সাড়ে সাত পার্সেন্ট ছাত্রদের ভ্যাট দেওয়ার প্রসঙ্গই আসলো কেন? অর্থমন্ত্রী কেন বলেছেন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা বড় অংকের টাকা টিউশন ফি দিতে পারলে ভ্যাট দিতে পারবে না কেন? এটা নিয়ে এতো কথাইবা হচ্ছে কেন?

জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং অনিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে টিউশন ফি নেয়, তার কোনো হিসাব-নিকাশ নাই। এছাড়া একটি বিল্ডিংয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে চলে তাতে সেগুলোকে ঠিক বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না।’

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার উপায় নেই। কিন্তু তিনি কাকে এই অভিযোগ করছেন? এইসবের জন্যতো জনতা উল্টো তাকেই অভিযুক্ত করতে পারে। এসবতো তার সরকারের দেখার কথা। সরকার কেন আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সবাইকে এককাতারে ফেলছে। এর মধ্যেতো দু’চারটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে যারা বিশ্বমানের শিক্ষা না হোক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাল শিক্ষা দিচ্ছে।

আর কথায় কথায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে গালি দেওয়া এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। আধুনিক শিক্ষার প্রসিদ্ধ নগরী লন্ডনেও ছাদে ছাদে এখন বিশ্ববিদ্যালয়। এক সময় এই ছাদে ছাদে গড়ে ওঠা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়তে বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভারত গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসেছে। এখন আবার মালয়েশিয়াও একই ব্যবসা চালু করায় দেশীয় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

এটাও ভাবতে হবে সেইদিন আর নেই। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এতো বিস্তৃত জায়গা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অবকাশ নেই। কারণ জায়গা সীমিত হয়ে আসছে। হয়তো থাইল্যান্ডের মতো নদীতে বসত করতে হবে আমাদের।

অনিয়ম দূর করা সরকারের দায়িত্ব। সরকার এবং মালিক দু’ তরফ থেকে এই অনিয়মের বলি ছাত্ররা হতে পারে না।

ইতিমধ্যে সবাই জেনেছেন হয়তো, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে আন্দোলনকারীরা আশ্বস্ত হয়নি। তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে ‘বাড়তি করের বোঝা’ সরানোর দাবিতে শনি, রবি সোম তিনদিনের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ স্লোগানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়।

অর্থমন্ত্রী নতুন নতুন করক্ষেত্র সৃষ্টি করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ছাত্রদের টিউশন ফির ওপর কর আরোপ পৃথিবীর কোথাও ছিল না। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এই অভিনব খাত আবিস্কার করেন। সাড়ে ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারণ করেন- ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল-কলেজ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাজপথে নেমে গাড়ি ভাংচুর আর পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সরকার তাদের ভ্যাট প্রত্যাহার করে নেয়। তবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজের ওপর তা শুধু অব্যাহত রাখা নয়, সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে গত বছর সেটা সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। কারণ সম্ভবত: বাচ্চারা রাস্তায় যেতে পারবে না এইজন্য। এ বছর আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের ভ্যাট দশ শতাংশে বাড়ায় এবং পরবর্তীতে তা সাত শংতাংশ করে।

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ওপর বর্তমানে ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দেওয়ার বিধান আছে। তারা তাদের বার্ষিক উদ্ধৃত অর্থের ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দেওয়ার কথা। অনেকেই দিচ্ছে, অনেকে আইনগত লড়াই করে দিচ্ছে না। তাদের যুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তার আইন অনুযায়ী সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তারা ‌উদ্বৃত্ত টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পুন:বিনিযোগ করছে, নিজেরা নিচ্ছে না।

সরকার বাংলা মিডিয়াম স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর কোনও কর আরোপ করেনি। এমন একটা দ্বৈত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার উৎসাহিত হলো কেন বলা কঠিন। একই দেশে একই বিষয়র ওপর দুই নীতি অবলম্বন নিশ্চয়ই অন্যায় কাজ। ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অব জাস্টিস কখনো আইনের দৃষ্টিতেও ন্যায় বলে গণ্য হবে না।

আবার শিক্ষা মৌলিক অধিকার। সরকার টিউশন ফি’র ওপর ভ্যাট আরোপ করে মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত করছে। আসলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল দিয়ে শুরু হয়ে যাওয়ায় বলতে হবে গত কয়েক বছর ধরেই মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছে।

বর্তমান ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যত ছাত্র লেখাপড়া করছে তাদের সংখ্যা ঢাকা শহরের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রদের চেয়ে কম নয়। সরকার সরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তুকি প্রদান করে বলে সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি অত্যন্ত নগণ্য। আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজ ও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে সরকার ভর্তুকি প্রদান করে না বলে এখানে টিউশন ফি খুবই বেশি। আকাশ-পাতাল ব্যবধান বললেও অতিরিক্ত বলা হবে না। সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক আবার সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট প্রদান করতে হলে ছাত্রদের ওপর সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অনাহুত সন্ত্রাস ও জুলুম হিসেবে গণ্য করতে হয়।

সবাই জানে ব্যবসার ওপর ট্যাক্স ধার্য করা হয়। সুতারাং যারা ব্যবসা করছেন তাদের ট্যাক্সেবল ইনকাম হলে ট্যাক্স দিতেই হবে। ছাত্ররাতো কোনও ব্যবসা করছে না। তাদের কোনও ট্যাক্সেবল ইনকাম নেই। সুতরাং তারা ট্যাক্স দেবেন কেন! ভ্যাট দেবেন কেন!

ছাত্ররা ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ এর দাবিতে যে আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছে তাতে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। ছাত্ররা সরকারি কোনও ভর্তুকি চাচ্ছে না। তাদের উচ্চহারের টিউশন ফি’র ওপর সরকার যে ভ্যাট ধার্য করেছে, অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর চেষ্টা করছে- তাই সরানোর কথা বলছে।

সরকারের আমলা, মন্ত্রীদের জানার কথা নয় যে, কত বড় অর্থনৈতিক বোঝা মাথায় নিয়ে তারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। তাদের বাবা মা মাথার ঘাম কিভাবে পায়ে ফেলে এই টাকার ব্যবস্থা করছে। আন্দোলন ছাড়া সরকারের অন্ধত্ব তারা কি করে ঘুচাবে- যারা ধারণাই করে আছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে শুধু ধনীর ছেলে মেয়েরা পড়ে।

সরকারের উচিত অবিলম্বে তাদের দাবি মেনে নেওয়া অথবা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটা প্রকাশ্য ঘোষণা আদায় করা যে- এই আরোপিত ভ্যাট ছাত্রদের কাছ থেকে আদায় করা হবে না। এখনো না, ভবিষ্যতেও না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই এই টাকা পরিশোধ করবে। কারণ এর আগে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছিল ভ্যাট দেবে স্কুল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ভ্যাট আসলে দিয়ে আসছে ছাত্ররাই।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন