শুধু মাস্ক পড়েই করোনা প্রতিরোধ সম্ভব নয়

প্রকাশিত

মুক্তমন ডেস্ক : আমরা সময়ের এমন একটি পর্যায়ে দঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমাদের দেখতে হচ্ছে সবাই মাস্ক পড়ে ঘুরছে। রাস্তাঘাট, বাজার সব জায়গায়, সবার মুখে কাপড়ের বা সার্জিক্যাল মাস্ক। অনেকের ধারণা, মানুষের যত ভীড়েই আমি থাকিনা কেন মুখে মাস্ক থাকলেই আমি নিরাপদ! কিন্তু সত্যিই কি তাই? সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ সম্বলিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

করোনা থেকে রেহাই পেতে আপনাকে মাস্ক পড়তে হবে কি হবেনা তা নিয়ে পৃথিবীর নানা দেশে আছে নানা নিয়ম। এই ধরুন ইংল্যান্ড এর বিধায়করা বলছেন, আপনি সুস্থ থাকলে আপনার মাস্ক পরার দরকার নেই। আবার করোনার উৎপত্তিস্থল চীন দেশের কিছু প্রদেশের সরকার এ ব্যাপারে খুব কড়া। সেসব প্রদেশের রাস্তায় মুখে মাস্ক ছাড়া বেরুলে আপনার শ্রীঘরদর্শন হয়ে যেতে পারে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দেয়, আপনি যদি সুস্থ থাকেন তবে আপনার মাস্ক পরার দরকার নেই। যখন আপনি কোনো অসুস্থ মানুষের সেবা করছেন বা সংস্পর্শে যাচ্ছেন কিংবা আপনার নিজেরই হাঁচি-কাশি হচ্ছে ঠিক তখনই মুখে মাস্ক পড়ে নিন। কারণ আপনি তখন সাপের মুখে। কথা হলো আপনি মাস্ক পড়ে বাইরে গেলেন বলেই যে আপনার মাঝে ভাইরাস প্রবেশ করাতে পারবে না ব্যাপারটি এমন নয়। বরং জীবাণুবাহী কেউ একজন মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়াতেই পারেন। আর আপনার মাঝে চলে আসতে পারে সেই ভাইরাস।

বাজার এখন হরেক রকমের মাস্ক এ সয়লাব। ফেসবুক, টুইটার ম ম করছে মাস্ক বানানোর সব ঘরোয়া টিউটোরিয়ালে। সাধারণ কাপড়ের মাস্ক থেকে শুরু করে, সার্জিক্যাল মাস্ক, আছে বিশেষভাবে তৈরি কয়েক স্তরবিশিষ্ট রেস্পাইরেটর মাস্কও।

মূলত, একেক ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে একেক ধরণের মাস্ক পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণত ডাক্তার ছাড়া কারো সার্জিক্যাল মাস্কের প্রয়োজন হয় না। নীল রঙের এসব ঢিলেঢালা মাস্ক বাতাসে ভাসমান উপাদানের জন্য এক প্রকার বাধা হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, যখন কেউ এমন পরিবেশে থাকেন যেখানে বাতাসে এরোসল জাতীয় পদার্থ বা ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতি বিদ্যমান ঠিক তখনই রেস্পাইরেটর মাস্কের প্রয়োজন পড়ে। যেগুলোকে আমরা N95 বা FF3 নামে চিনি। এ ধরনের মাস্কগুলোতে বিশেষ ফিল্টারিং ব্যবস্থা থাকে। যা ৯৫ ভাগ পর্যন্ত বায়ুবাহিত উপাদান ছেঁকে ফেলতে সক্ষম।

সাধারণ মানুষের কোন ক্ষেত্রে মাস্ক পড়া উচিত?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর এক্ষেত্রে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে অনুসরণ করে পরামর্শ দিচ্ছে আপনার মাঝে যদি উপসর্গ থাকে তবে আপনার অবশ্যই মাস্ক পড়া প্রয়োজন। আবার অন্যান্য দেশ যেমন- ইংল্যান্ড, জার্মানীতে বলা হচ্ছে, যদি আপনার উপসর্গ থাকে তবে সবার আগে আপনি নিজেকে আলাদা করে ফেলুন। মাস্ক পড়াটা ততটাও জরুরি না যতটা জরুরি একজন বাহককে ঘরে আবদ্ধ করে ফেলা।

মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংক্রমনের দেশ আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) পরামর্শ দিচ্ছে, আপনি সাধারণ মানুষ হলে সার্জিক্যাল মাস্ক পড়ার কোনো প্রয়োজনই নেই, কাপড়ের তৈরি সাধারণ মাস্ক পড়ুন। এতে আপনি উপসর্গ আছে এমন ব্যক্তির থেকে খানিক তফাতে থাকতে পারবেন। মূলকথা সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা।

জার্মানিও বলা চলে অনেকটাই আমেরিকামুখী। জার্মানীর রোগ নিয়ন্ত্রনের দায় যাদের হাতে সেই রবার্ট কোচ ইন্সটিটিউশন তাদের হালনাগাদ করা উপদেশমালায় বলছে, যখন আপনি জনসমাগম হবে এমন জায়গায় যাচ্ছেন তখন মাস্ক পড়ে ফেলুন। যেসব জায়গায় আপনি ২ মিটার সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে পারছেন না সেসব জায়গায় মাস্ক পড়লে উপসর্গবাহী কিংবা ছাড়া যেকোনো বাহকের থেকেই দূরে থাকতে পারবেন। তবে সবার আগে জরুরি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও যথাসম্ভব ঘরে থাকা। বাইরে বের হলে যেকোনো উপায়ে এই ভাইরাস আপনার ঘরে প্রবেশ করতেই পারে।

মাস্ক আসলে কোন কোন জিনিস আটকায়?
আমেরিকান সিডিসির পরামর্শ দেওয়া সাধারণ কাপড়ে মাস্ক কতটা সুরক্ষা দিতে পারে এ ব্যাপারে অবশ্য তেমন গবেষণা বা পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা শোনা যায়নি। তবে একটি অনুসন্ধান বলছে, ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় ব্যাধি বা সাধারণ স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য কাপড়ের তৈরি মাস্ক পরা যেতে পারে। কিন্তু কাপড়ের মাস্কই পড়ুন কিংবা সার্জিক্যাল মাস্ক এগুলো কোভিড-১৯ এর মতো ভাইরাসকে আটকে দিতে পারবে কিনা এ ব্যাপারে তেমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। আবার ওই একই অনুসন্ধান বলছে, বিজ্ঞানীরা মাস্ক পড়ার পরামর্শ দেন এ কারণে যে এটি দিয়ে মুখ নাক ঢাকা থাকলে কেউ কথা বলা, হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় তার মাস্কে আটকে যায়। এটি অন্যদের আক্রান্ত করা থেকে আটকে দেয়।

মাস্ক আমাদের কতটুকু রক্ষা করে?
জার্মান রোগ নিয়ন্ত্রণসংস্থা আরকেআই বলছে, আপাতত মাস্কের ব্যক্তিগত সুরক্ষা দেওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মাস্ক করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা করবে এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। মাস্ক অন্যের থেকে আপনাকে রক্ষা করার চাইতে বরং আপনার থেকে অন্যদের রক্ষা করবে। আর এজন্যেই যেখানে আপনি নিশ্চিত নন যে আপনি আক্রান্ত কিনা সেখানে মুখে একটি মাস্ক আপনার এজন্যে থাকা জরুরি যেনো আপনার দ্বারা অন্য কেউ আক্রান্ত না হোন।

কাপড়ের মাস্কের কার্যকারীতা নিয়ে সন্দেহ থাকায় মানুষ হয়তো সার্জিক্যাল মাস্ক কেনার জন্য ঝুঁকছে। আরকেআই বলছে, মাস্ক পড়ে বাইরে ঘোরার চাইতে বরং বাসায় থাকা জরুরি। মাস্কের প্রয়োজন সাধারণ মানুষের চাইতে সামনের সারির সাস্থ্যকর্মীদের বেশি।

২০১০ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরো ক্ষুরধার তথ্য। গবেষণাটি বলছে মুখে মাস্ক থাকলেও এটি আপনাকে বাঁচানোর গ্যারান্টি দিতে পারেনা। মুখের মাস্কটি কেবল আপনার নিজের মাঝে সংক্রমণ থাকলে তা আটকে দিতে পারে। তবে যখন আপনি কোনো জনসমাগমে যাচ্ছেন তখন মুখে একটি মাস্ক পড়ে নিতেই পারেন কারণ আপনি তখন সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে পারবেন না।

অর্থাৎ মূল যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, ঘরের বাইরে না যাওয়া। ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোওয়া। শুধু মাস্কের উপর ভরসা করে কেউ যদি এই মূল বিষয়গুলো ভুলে যায় তবে সে নিজেও আক্রান্ত হবে সমাজের মানুষের জন্যেও বিপদ ডেকে আনবে।

শেয়ার করুন