এসো মা লক্ষ্মী

মা দুর্গাকে তো দূর থেকে দেখা৷ কিন্তু লক্ষ্মী  ঘরের মেয়ে৷ তাঁকে নিজের হাতে সাজানো৷ তাঁর জন্য নাড়ুর গন্ধ  বাঙালির ঘরদুয়ারে৷ তাঁর জন্যই সন্ধের পাড়া মাতোয়রা খিচুড়ি আর লাবড়ার সুবাসে৷ বাঙালির লক্ষ্মীপুজো, পুজো ছাপিয়ে যেন বাঙালির একান্ত ঘরোয়া এক অনুষ্ঠান৷ লিখছেন তুষ্টি ভট্টাচার্য

পুজো এলো আর চলেও গেল কত তাড়াতাড়ি। পুজো আসবে আসবেই ভালো, এলেই শেষ হয়ে যায় কেমন! ভাঙা প্যান্ডেল, খালি মন্ডপ দেখলেই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে ওঠে। কী ভীষণ এক শূন্যতা দিয়ে গেল মা দুর্গা আমাদের। রাস্তাঘাট শুনশান, মানুষও যেন কথা বলতে, হাসতে ভুলে গেছে। উৎসব মুখরতার পরে শ্মশানের শান্তি ছেয়ে আছে। তবু মনকে মানাতেই হয়। ফিরে আসতে হয় নির্দিষ্ট ছন্দে। তাই আবার পরের বছরের অপেক্ষায় থাকব নাহয়। তবে আজ যে লক্ষ্মী পুজো, তারও তো আয়োজন কম না। দুর্গাকে তো দূর থেকে দেখি, তার কাছে গিয়ে প্রণাম জানাই। আর লক্ষ্মী তো নিজেই ঘরে চলে আসে, তাই তার খাতিরদারি আমাকেই করতে হবে। ভোগ রাঁধতে হবে। নাড়ু পাকাতে হবে। আমার রান্নাঘর আবার সেজে উঠবে, ধুয়ে মুছে আঁশগন্ধ মুছে ফেলে পবিত্র করতে হবে তাকে। তারপর তো মায়ের ভোগের উপযুক্ত হয়ে উঠবে সে। এছাড়াও আল্পনা দিতে হবে, যার ওপর দিয়ে পায়ের ছাপ ফেলে হেঁটে এসে নিজের আসনে বসবে সে।

হাওয়ায় নাড়ু পাক দেওয়ার গন্ধ ভেসে আসছে। জোরে নাক টেনে গন্ধটা বুকের ভেতরে ভর্তি করে নিলাম। এই গন্ধটার কোন বদল হয় না। সেই একইরকম চিরকালের, অথচ চিরনবীন। নাড়ু চুরি করে খাওয়ার মত সুখ বোধহয় আর কিছুতেই নেই। এমনি নাড়ু খেলে ওইজন্য আজকাল আর তত তৃপ্তি লাগে না। দিদাকে দেখেছি কত রকমের নাড়ু করতে। চন্দ্রপুলি, ইচার মুড়া, আরও কি কি নাম ছিল যেন… এখন তো একা একাই নাড়ু পাক দেওয়া, একা একাই পাকানো। দিদার সেই বিশাল কড়াইয়ে নাড়ু পাক দেওয়া হলে, আমরা কাচ্চাবাচ্চারা ভিড় করে থাকতাম। কয়েকজন বয়স্করাও থাকত অবশ্য। আমাদের হাত ধুয়ে বসে পড়তে হত কড়াই ঘিরে গোল হয়ে। এবার দিদা খুন্তি দিয়ে একটু করে নেড়ে দেয় আর আমরা ঘি মাখা হাতে নাড়ু পাকাতে থাকি। আমাদেরগুলো ঠিক মত গোল হয় না কেন কে জানে! দিদার ফিনিশিং টাচ পেলে ঠিকমত শেপে আসে। এই নাড়ু-উতসবের শেষে আমাদের অনন্ত অপেক্ষা ছিল কড়া চাঁছার। ওইটুকু ছিল আমাদের মজুরি। জুলজুল করে চেয়ে থাকা কয়েকজোড়া চোখে তখন আলোর ফোয়ারা!

DSCF2031এখন নাড়ু হজম হয় না ঠিক। অ্যাসিডিটি। ছোটদেরও তেমন লোভ দেখি না নাড়ুর ওপর। এখন কত রকমের খাবার মেলে বাজারে। সেখানে কী আর নাড়ু পাত্তা পায়। মিষ্টির দোকানে গেলেই নাড়ু মেলে ভুরিভুরি। কে আর অত ঝামেলায় যায় নাড়ু পাকানোর! কয়েকখানা কিনে ঠাকুরকে দিয়ে দিলেই হবে। তবু এখনও কেউ কেউ পাক দেয়, আমার মতই কিছু অর্বাচীন এখনো রয়ে গেছে। তাই কিছু নাড়ু আজও পাকানো হয়। কিছু স্মৃতি এখনো উসকে ওঠে। কিছু গন্ধ সব সময়েই নতুন লাগে।

নাড়ু তো হল। এবার ভুনি খিচুড়ির পালা। আর সেই কুখ্যাত লাবড়া! তবে ফুলকপির তরকারি নিয়ে এখন আর বেশি উৎসাহ নেই। সে তো সারা বছরই পাওয়া যায়। ভুনি খিচুড়ির ব্যাপারটা একটু বেশি মাত্রায় স্পর্শকাতর। সোনামুগ চাই ভালো, পুরনো গোবিন্দভোগ। সোনামুগের সোনা মুখটি ডুবে যেন না যায়, আবার ভেসে থাকলেও মুশকিল। চাই মাখো মাখো ভাব, চালের সাথে মেখে থাকবে এমনভাবে, যেন বেশি জড়িয়ে না পড়ে, আবার বিচ্ছেদও না ঘটে। দুজনেই পাশাপাশি থাকবে হাতে হাতটি ধরে। এভাবেই ধীরে ধীরে ঢিমে আঁচে ভুনি খিচুড়ি তৈরি হবে। বেশি আগুন দিয়ো না যেন, পাত্রের তলায় কামড়ে ধরবে। তোমার ঘিয়ের গন্ধ উবে যাবে, তোমার সোনামুগের গতর কালি হবে। সাবধান, খুব সাবধান!

ঠিক কটা সবজি লাগে লাবড়ায় জানো? শেষ নেই, বুঝলে, শেষ নেই এই নাম আর সংখ্যার। তুমি যা দেবে তাই সই। পেঁপে, কাঁচকলা, থোড়, ডাঁটা, মুলো বেগুন কুমড়ো, রাঙা টুকটুকে আলুর সাথে আমাদের রোজকার আলু, ঝিঙে, পটল… আর কি কি দিতে চাও? দেখো, খুঁজেপেতে ধরে আনো সবাইকে। দেখবে কেমন একসাথে মিশে যাবে সংহতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে। এরা তোমার ভুনি খিচুড়ির মত স্পর্শকাতর না, বড় বেশি বেঁধে বেঁধে থাকে। জড়াজড়ি করে থাকে। আমি ভাবি, এদের ভেতরে এত জল কোথায় থাকে? ওই তো একটা সরু ঝিঙে, একফালি কুমড়ো বেগুন… অত টুকু চেহারার ভেতরে এত জল বেঁধে রাখে কি করে ওরা? ওদের চোখ নেই বলেই হয়ত পারে, চোখ থাকলে সব জল কান্না হয়ে ঝরে যেত সেই কবে। আমি দেখতে থাকি, কেমনভাবে ওরা একসাথে কড়ার ভেতরে জল ছাড়ে, নিজেরাই নিজেদের জলে ডুবে যায়, ডুবে যেতে যেতে একসাথে সবাই মিলে জড়িয়ে গিয়ে আবার যেন বেঁচে ওঠে! ওদের এই মিলেমিশে থাকা বড় আনন্দ দেয়। জীবনীশক্তি ফিরে আসে যেন।

লক্ষ্মীকে মালা পরাই, পদ্ম দিয়ে শোভা বাড়াই, কপালে সিঁদুর ছোঁওয়াই, গাছ কৌটোয় সিঁদুর ভরে দিই, ধানের ছড়া, চাঁদমালা ঝুলিয়ে দিই হাতে। তারপর তার চাঁদ মুখের দিকে চেয়ে দেখি, আহা- কী সুন্দরই না লাগছে আমার মেয়েকে! চোখ যেন আর ফেরাতে পারি না। সাজানোর পরে তার মুখের দিব্য আভার স্পর্শে আমিও যেন আলোকিত হচ্ছি। পদ্মগন্ধে ভরে উঠছে আমার মন। এই তো আমার পুজো, আমার প্রেম।

আল্পনা দেওয়ার পরেই যেন কোন বাড়ির মধ্যে পুজো পুজো ভাবটা চলে আসে। একটু ধানের ছড়া আর দুটো লক্ষ্মীর পা জিগজ্যাগ করে আঁকা হবে দুয়োরে দুয়োরে, যেন মায়ের নাকি মেয়ের আসার পথনির্দেশ দেওয়া হল! এরপর যে যেমন পারে কল্কা তুলে এঁকে ফেলল কিছু নির্দিষ্ট ডিজাইন। ঘট বসার জায়গায় সবচেয়ে স্পেশাল কিছু আঁকতেই হবে। নইলে কি আর মান থাকে মা লক্ষ্মীর? মান করলে আবার বিপদ। কথায় বলে লক্ষ্মী বড় চঞ্চলা। লক্ষ্মী গেলে শ্রী যাবে, শান্তি যাবে, অর্থ অনর্থের মত নাশ করবে। বালাই ষাট, ওসব কথা মুখে আনতে নেই। এসো মা লক্ষ্মী, বস মা ঘরে… ও হ্যাঁ, মায়ের বসার চৌকিতে আল্পনা দিতে ভুলো না যেন। তবে এখন তো সব ছোট ছোট ফ্ল্যাট বা বাড়ি, কতটুকু আর জায়গা পাওয়া যায় আল্পনা দেওয়ার? তার মধ্যে আবার সাদা মার্বেলের মেঝেতে, আল্পনার ডিজাইন ফোটে কই? সেই আগেকার ঢালাও উঠোন, লম্বা বারান্দা, বিরাট হলঘর, ঠাকুরদালান- আছে নাকি! তাই আল্পনা দেওয়ায় সুখ নেই। এ যেন দুকামরার ফ্ল্যাটে আড়াইজন মানুষের ঠেসেঠুসে বাস, ইঞ্চি মেপে মেপে আসবাব তৈরি। আল্পনার ডিজাইনও তাই স্বাধীনতা পায় না। জায়গা বুঝে ব্যবস্থা করতে হয় তার। যে যুগের যে ধর্ম আর কী!

ভাগ্যিস মা লক্ষ্মীকে নিয়ে এসেছিলাম। তাই এই আয়োজনে ভরে উঠল মন। এতো আমার পুজো নয়, এ আমার মেতে থাকা। মাটির মেয়ের সাথে আমার ছেলেখেলা, ছেলেবেলার খেলায় ফিরে যাওয়া। মা যে কখন মেয়ে হয়ে যায় এরই মধ্যে বোঝা যায় না। লক্ষ্মীকে মালা পরাই, পদ্ম দিয়ে শোভা বাড়াই, কপালে সিঁদুর ছোঁওয়াই, গাছ কৌটোয় সিঁদুর ভরে দিই, ধানের ছড়া, চাঁদমালা ঝুলিয়ে দিই হাতে। তারপর তার চাঁদ মুখের দিকে চেয়ে দেখি, আহা- কী সুন্দরই না লাগছে আমার মেয়েকে! চোখ যেন আর ফেরাতে পারি না। সাজানোর পরে তার মুখের দিব্য আভার স্পর্শে আমিও যেন আলোকিত হচ্ছি। পদ্মগন্ধে ভরে উঠছে আমার মন। এই তো আমার পুজো, আমার প্রেম। পুজো হচ্ছে, ধুপ ধুনোর গন্ধে ভরে যাচ্ছে আমার ঘর, আমি ভোগ বেড়ে দিচ্ছি মাকে। আহা- খেয়ে নে রে মেয়ে সবটা। মুখটা যেন শুকিয়ে গেছে তোর এই ধকলে। আচ্ছা শেষ পাতে চাটনি আর পায়েসও আছে। ওরা না হলে আমার পুজোর খেলা শেষ হবে না কখনই।

মায়ের মিছে ভোগ খাওয়া হলে আমাদের ভুরিভোজ শুরু। থার্মোকলের থালা, বাটিতে ভোগ পৌঁছে দেওয়া বাড়িতে বাড়িতে। প্রসাদ যে একা খেতে নেই, যত বিলোবে, তত বাড়বে। অর্থাৎ তুমি যদি নিজের হাতটি উপুড় না কর, পাওয়ার আশা কর কী করে! কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হবে। তবে দেওয়ার ভাগটি যেন থাকে বেশি। তাহলেই তোমার জিত, তাহলেই তোমার পরম প্রাপ্তি।