দ্য গ্রেট রওশান সার্কাস

মাসকাওয়াথ আহসান :  মাইক নিয়ে রিক্সা করে ঘুরে হনুফা। ভাইসব, হাওয়া ভবনের বিচ্ছিরি দ্য আলেদা সার্কাস আপনাদের আর দেখতে হবে না। এবার সুবাতাস ভবন আপনাদের জন্য নিয়ে এলো দ্য গ্রেট রওশান সার্কাস। কী নেই এ সার্কাসে! হাতি-বাঘ-বানর-কাছিম-সাপের খেলা। থাকছে গান-অভিনয় আর যুগশ্রেষ্ঠ ভাঁড়দের রগড়। আসুন ভাই; হেলায় এ সুযোগ হারাবেন না।

লোকজন উতসুক হয়। শীতের হাওয়া বইতে শুরু করেছে; এখন সপরিবারে সার্কাস দেখতে গেলে মন্দ হয়না। পোস্টারে ভাঁড়দের ছবি দেখে লোকজন হাসিতে ফেটে পড়ে। এ সার্কাস দর্শক মাতাবে; চারিদিকে কানাকানি পড়ে যায়।টিকেট কেনার ধুম পড়ে যায়। হনুফা তার টিকেট বিক্রেতা খোকন সোনাদের ডেকে বলে, দেইখো আবার ব্ল্যাকে টিকিট বেইচো না। ন্যায্যমূল্য নিবা।

প্রথম সার্কাস শো যখন শুরু হয়; বুড়ো হাতিশাদ এসে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শুরু করে গান,

তোমাদের পাশে এসে বিপদের বাঁশী হতে

আজকের চেষ্টা অপার।

দর্শকের হঠাত মনে পড়ে যায় এ সার্কাস তারা আগেও দেখেছে। সেটা খুব সম্ভব দ্য গ্রেট রব সার্কাস ছিলো। তবে তখন এই হাতিটা এতো বুড়িয়ে যায়নি। এক দর্শক শিস দিয়ে বলে,

জব্বর হাতি! এ মরা হাতীর দাম লাখ টাকা নিশ্চয়ই।

হঠাত একটা বাঘের পিঠে চড়ে হাজির হয় দোজাহান মিয়া। সে গান ধরে,

ও আমি সুন্দরবনে বাঘ শিকার যামু

বন্দুক লইয়া রেডি হইয়া;

আমি আর ভৌতিক এলাহী মামু।

গান গাইতেই দোজাহান মিয়া বাঘসহ রিং-এর মধ্যে দিয়ে লাফ দেয়।

এক দর্শক টিপ্পনী কেটে বলে, সুন্দরবনে বাঘ পাইবো কই। এইডা তো দ্যাখতেছি প্লাস্টিকের বাঘ।

হনুফার স্বেচ্ছাসেবী খোকন সোনাদের একজন দর্শকটিকে ‘চ’ বর্গীয় গালি দিয়ে বলে,

খবরদার এইডারে পেলাসটিকের বাঘ কবি না। ক আসল বাঘ।

দর্শকটি ভয় পেয়ে বলে, ঠিক আছে দাদা এইডা আসল বাঘ। দোজাহান মিয়াই আসল বাঘ!

সার্কাস দলের ম্যানেজার সাতান্নু ভাইয়ের কাছে গিয়ে এক স্বেচ্ছাসেবী নালিশ করে, দর্শকেরা বাঘ-অনুভূতিতে আঘাত দিতেছে।

সাতান্নু ভাই বলে, আমার আইটেমে গিয়ে দুটি কথা বলবো দর্শকের উদ্দেশ্যে। ভেবোনা।

হঠাত স্টেজে রঙ্গিন পাঞ্জাবী পরে হাজির হয় সুমিল্লা ভাই। মেজাজ ফুরফুরে। পেছনে পেছনে হেঁটে আসে গোস্টম্যান। গোস্টম্যান ভাই টিপ্পনী কেটে বলে, সুমিল্লা ভাই বেশ চার্মিং মুডে আছেন দেখি।

সুমিল্লা ভাই গান গেয়ে ওঠে, সবাই তো সুখী হতে চায়; তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয়না।

হঠাত কোত্থেকে উদয় হন সার্কাসের বিবেক,

ভ্যাটেই জীবন ভ্যাটেই মরণ

শুধুই ভ্যাটের খেলা;

জগতের এই জেলহাজতে

ক্যান যে ফাটক দিলা।

এই যে সুমিল্লা সাহেব, সুখী হয়েছেন ভালো কথা; কিন্তু সুখের ওপর ভ্যাট দিতে হবে কিন্তু।

এরপর একচাকার সাইকেল নিয়ে মঞ্চে চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করে কয়েকজন বানর সাইক্লিস্ট। তারা সাইকেল চালিয়ে দর্শক গ্যালারীতে গিয়ে দর্শকের পকেট থেকে ছোঁ মেরে টাকা নিয়ে আসতে শুরু করে। দর্শক প্রথমে মজা পেলেও পরে বিরক্ত হয়। হনুফার স্বেচ্ছাসেবীরা এসে চোখ রাঙ্গায়।

–সোজা হইয়া বইসা থাক। তরা কী সেই আলেদা সার্কাসের ভক্ত নাকি। ল্যাঞ্জা ইজ ডিফিকাল্ট টু হাইড।

একদর্শক বলে, টাকা নিচ্ছেন নেন, নতুন কিছু দেখান; এই বান্দরগুলি খ্যাদান।

এর মধ্যে লাব্বায়েক লা শারিকা লাকা বলতে বলতে স্টেজে আসেন লেনন ভাই ও সাতান্নু ভাই।

দুজনে সমস্বরে গেয়ে ওঠে, তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে।

এক দর্শক ফিসফিস করে বলে, সার্কাসে আইসাও যদি হামদ-নাত শুনতে হয়!

এক স্বেচ্ছাসেবী এসে বলে, আপনেরা কী নাশটেক নাকি!

দর্শক জিজ্ঞেস করে, নাশটেক কী?

–ঐ আল্লাহ-খোদায় যা গো বিশ্বাস নাই।

–আল্লাহ-খোদার জন্য মসজিদে যাই। সার্কাসে আইসাও হাজী সাব দেকতে হইবো কা!

ফ্যাসফেসে গলায় লেনন ভাই সবাইকে হজ্বব্রত পালনের দাওয়াত দেন। আর সাতান্নু ভাই বলেন, আপনারা যারা একটু আগে আমাদের দোজাহান ভাইয়ের বাঘটাকে প্লাস্টিকের বাঘ বলেছেন তারা আমাদের দ্য গ্রেট রওশান সার্কাস পার্টির অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন। প্লিজ অনুভূতিতে আঘাত হানবেন না। আপনাদের এই সাতান্নু ভাই এমনিতে ভালো; কিন্তু অনুভূতিতে আঘাত হানলে প্রতিরোধে প্রতিশোধ।

যে দর্শক লেনন ও সাতান্নু হাজীকে স্টেজে দেখে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলো; তাকে পেছন থেকে কে যেন চাপাতির আঘাত করে। সার্কাসের মাঝখানে এমন একটা ঘটনায় সার্কাস পন্ড হয়ে যাবার জোগাড়। কিন্তু অভিনেতা রাশেদুজ্জামান ভাই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, এই সার্কাস থেমে যাওয়া মানে জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয়া। আপনারা কী চান আমাদের হাজার বছরের এই সার্কাস সংস্কৃতি সেই ব্যর্থ দ্য আলেদা সার্কাস দলের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীদের ষড়যন্ত্রে বন্ধ হয়ে যাক।

–জাগো বাহে, কুনঠে সবাই

দর্শক আপ্লুত হয়। সমস্বরে বলে,

আমরা আছি; আপনারা চালিয়ে যান; নতুন কিছু দেখান।

অত্যন্ত হাইটেক সার্কাস। দর্শককে চমক দিতে মঞ্চে নেমে আসে এক হেলিকপ্টার। তা থেকে নেমে আসে এক দরবেশ আর এক আউলিয়া।

আউলিয়া মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলে,

সার্কাস দেখতে যে জেনানারা আসছে তাগো মাথায় ঘোমটা কই! জেনানারা তেঁতুলের মত। তাদের ঢাকিঢুকি রাখতে হয়।

এক দর্শক চিৎকার করে বলে, ভাবলাম হেলিকপ্টার থিকা নামবো অনন্ত জলিল; নামছে এক তেঁতুল পীর।

কে একজন এসে দর্শকের পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করে। দর্শকদের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে অভিনেত্রী সারিনা ভেজা কন্ঠে বলেন, দ্য আলেদা সার্কাস পার্টি চায়না দ্য গ্রেট রওশান সার্কাস সফল হোক। তোমরা ভয় পেওনা; আমরা অস্ত্র হাতে লড়তে জানি; সার্কাস দেখতে থাকো। আমরা হত্যাকান্ডগুলোর তদন্ত করে ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করবো। সারিনা আপুর কান্নায় দর্শকের মধ্যেও কান্না সঞ্চারিত হয়।

স্টেজে এসে পড়েন সুরকাকা তার পাঁচটি কালো বেড়াল নিয়ে জাগলিং করতে করতে। মানুষ কিছুটা আনন্দ পায়। সুরকাকার সুমিষ্ট হাসি; আর বেড়ালগুলোও কিউট। মনের আনন্দে চলতে থাকে জাগলিং।

এরপর গদি ভাইয়ের আইটেম। স্টেজে সে যাকেই দেখে চড় দেয় আর হো হো করে হেসে উঠে। চড় শিল্পী গদি ভাইয়ের আইটেমটা ভালই উতরে যায়।

বুড়ো হাতিশাদের খুব ইচ্ছে করে স্টেজে গিয়ে আরেকখান গান গেয়ে দিয়ে আসে। কিন্তু বাদ সাধছে ম্যানেজার সাতান্নু। সে বলছে বুড়ো হাতির ডিমান্ড দর্শকদের মাঝে নেই। এখন সোমতাজের গানের আইটেম দিয়ে একটু জমিয়ে দেয়া যায়।

সোমতাজ গান ধরে,

চিনলি নারে চিনলি না

আসল মানিক চিনলি না

মা সে আমার ভগ্নি আমার

অন্নদাত্রী চিনলি না।

এক দর্শক শিস দিয়ে বলে, তৈল সংগীত বাদ দিয়া বুক ফাইট্টা যায় গান না ক্যান আফা!

মাইক্রোফোন নিয়ে, গডজিলাতুন্নিসা আপা বেশ কিছু গালিগালাজ করে। তারপর হুংকার দেয়, দ্য আলেদা সার্কাসের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান।

এরপর শুরু হয় ট্র্যাপিজের খেলা। লোকজন উপভোগ করে রিং ধরে উঠে গিয়ে এক ট্র্যাপিজ ধরে ঝুলে গিয়ে আরেক ট্র্যাপিজ লাফ দিয়ে মুঠো করে ধরার ঝলক।

এসময় হঠাত আরেক দর্শকের পেছন থেকে কে যেন চাপাতি দিয়ে আঘাত করে।

দর্শকেরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।

–পেয়েছেন টা কী! সব দর্শক মরে গেলে তারপর এ সার্কাস শেষ হবে না কী!

এসময় সার্কাসের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আজাদ ভাই বলেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই সার্কাস শো’র অভ্যন্তরে কোন জঙ্গীবাদ নাই।

একজন দর্শক বলে, একটু আগেই না অভিনেতা রাশেদুজ্জামান ভাই বললেন, জঙ্গীবাদ আছে; সার্কাস থেমে যাওয়া মানেই জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয়া।

আজাদ ভাই বলেন, দাঁড়ান একটু চিন্তা কইরা ঠিক করে আসি জঙ্গীবাদ আছে কী নাই!

এরমধ্যে একটা বুড়ো কাছিম আসে মঞ্চে। সঙ্গে একদল ডাক্তার। হাতে তাদের ইনজেকশান। পেছন থেকে মাইক্রোফোনে ন্যারেশান ভেসে আসে, এই কাছিমটিই এই ডাক্তারদের আপনাদের কাছে নিয়ে এসেছে সুখী হওয়ার ইনজেকশান দিতে। আপনারা শান্ত হয়ে বসুন। ইনজেকশান দেয়া হয়ে গেলে দেখবেন, আর কোন কিছুকে ভয় লাগছে না।

হঠাত আজাদ ভাই দৌড়ে এসে বলেন, ভাইসব ঘুমাইয়া পড়ার আগে শুনে যান; এইখানে কোন জঙ্গীবাদ নাই; বড়ভাইবাদ আছে।

লেখা: ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।