উজ্জল স্মৃতির দুমড়ানো ব্যাথা…

কাওসার চৌধুরী : 

তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীর-
এখন আর দুটি আলাদা কোন নাম নয়, যেন একটি নামে- নতুন অভিধায় ভূষিত হয়ে গেছে দুটি মানুষ। একটি সড়ক দূর্ঘটনা দু’জনকে এক জায়গায় এনে, আমাদের মনে- একটি নির্দিষ্ট প্রকোষ্টে প্রোথিত করে গেছে। জীবদ্দশায় ওঁরা ছিলেন দু’জনের খুব কাছাকাছি। একজনকে ফেলে অন্যজন কোন কর্মে এগোয়নি সহজে। সেই ‘আদম সুরত’ (প্রামাণ্যচিত্র) থেকেই দু’জনের সখ্যতা। পরিচালনা আর চিত্রগ্রহণে দু’জনে জুটি হয়ে গিয়েছিলেন।

তারেক মাসুদের পরের দিকের ছবিগুলোতেও মিশুক মুনীর ছিলেন তারেকের শক্তিশালী হাত, সৃষ্টিশীল চিত্রগাহক। আরো একটি ছবির লোকেশন দেখে ফেরার সময়ে ঘাতক বাস নিয়ে গেল দু’টি তাজা প্রাণ। সাথে তারেকের গাড়ীর ড্রাইভারসহ আরো দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন সেদিন।

ওই একই গাড়ীতে ছিলেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরীন মাসুদ, শিল্প নির্দেশক ঢালি আল মামুন আর তাঁর স্ত্রী। এ ক’জন প্রাঁণে বেঁচে গেলেও স্মৃতির কাছে আটকে আছেন নির্মম বেদনায়। সেদিনের সেই স্মৃতি ঢালি আল মামুনকে আটকে রেখেছে ‘দুমড়ানো ব্যাথায়’!

ক’দিন আগে ঘন ঘন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছিল একটি কাজে।
টিএসসির পাশ দিয়ে শহীদ মিনারের দিকে যাবার সময় নজরে পড়ল অধ্যাপক ঢালি আল মামুনের স্থাপনা কর্মটি। মানিকগঞ্জের কাছে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনায় দুমড়ে যাওয়া মাইক্রোবাসটি নিয়ে অসাধারণ একটি স্থাপনা কর্ম তৈরী করেছেন মামুন ভাই। দলিত-মথিত গাড়িটি যেমন ছিল তেমন অবস্থায় সাদা রঙ দিয়ে স্থাপন করেছেন সড়কদ্বীপে! শামসুন্নাহার হল আর টিএসসি’র মাঝামাঝি সড়কদ্বীপটির কাছাকাছি পৌঁছলেই মনটা ব্যাথায় কুঁকড়ে যায়!

অনেকটা সাদা কাফনের আদলে দুমড়ানো গাড়িটির বিভিন্ন অংশ তুলে ধরেছেন ঢালি আল মামুন। কাফনে মোড়ানো স্মৃতি দেখে মনটা দমে যায়। মনে পড়ে সেই কবিতাটি- “কে হায় …… হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে”!

তারেক মিশুককে হারিয়েছি আজ প্রায় চার বছর।
বাংলাদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্রে তাঁদের অবদান সকল প্রশ্নের উর্ধ্বে!
কিন্তু, কেন জানি এই ধারার চলচ্চিত্রের মানুষগুলো বেশীদিন বাঁচতে পারেনা!
জহির রায়হান, আলমগীর কবিরদের তালিকায়- তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর সর্বশেষ সংযোজিত নাম।

হে প্রভু, গোটাও তোমার হাত কিছুদিন। অনেক নিয়েছ এরমাঝেই।
ওঁদের পাশাপাশি আরো নিয়েছ ওয়াহিদুল হক, বাদল রহমান, অজিত রায়, বুলবুল আহমেদ, বেবী ইসলাম, হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন ফরীদিসহ আরো অনেককে। এবার একটু থামো প্রভু, থামো! চারপাশটা বড়ো শুন্য শুন্য মনে হয়! বড়ো কষ্ট লাগে!

অত্যন্ত কাছের এই মানুষগুলোর উজ্জ্বল সেই স্মৃতিগুলো বড়োবেশী দুমড়ানো ব্যাথা নিয়ে হাজির হয় মনের গভীরে। বড়ো বেশী কষ্ট লাগে, ব্যাথা লাগে। তারেক-মিশুকসহ হারিয়ে যাওয়া সকল কাছের-মানুষগুলোর আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন তাঁরা!

বন্ধুগণ, আপনারাও ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।
অনেক শুভেচ্ছা নেবেন।

tareq  masud-misuk munirtareq  masud-misuk munir1tareq  masud-misuk munir2tareq  masud-misuk munir3

লেখা  ও ছবি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।