জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য চাই

মাসকাওয়াথ আহসান : জামাত থেকে উদ্ভুত জঙ্গীগ্রুপগুলো কল্পিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার লড়াইটি চূড়ান্ত পর্যায়ে চালিত করছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়। পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্কটি সমানভাবে বিস্তৃত। এখন আল-কায়েদা ও আই এস ভারতীয় উপমহাদেশ বলেই ডাকছে এই পুরো অঞ্চলটিতে। আফঘানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র যে আফঘান মুজাহেদীন তৈরী করেছিলো সেখানে পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যোদ্ধা প্রশিক্ষণ এবং সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়। এরাই নিজ নিজ দেশে ফিরে গড়ে তোলে ছোট ছোট জঙ্গীগ্রুপ যাদের লক্ষ্য শারিয়াহ আইন প্রবর্তন ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা। যুক্তরাষ্ট্র যাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তৈরী করে; তারাই যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয়ে যায়। কারণ আফঘানিস্তানে তালিবানদের কল্পিত খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তৈরী হয় আল-কায়েদা। আল-কায়েদার সন্ত্রাসী কার্যক্রম আমরা দেখেছি। আল-কায়েদা কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে যেতেই মাঠে নেমে পড়ে আই এস। এবার তারা স্পষ্ট করে বলে তাদের উদ্দেশ্যের কথা। ইসলামিক স্টেট বা খিলাফত প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ নতুন এই জঙ্গী গ্রুপটি। আল-কায়েদা, আই এস বা পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশের জঙ্গীগ্রুপগুলো সবাই এই যুদ্ধের রাজনৈতিক শাখা হিসেবে জামাত বা মুসলিম ব্রাদারহুডকেই অনুসরণ করে। উদ্দেশ্য অভিন্ন।

ভারতীয় উপমহাদেশে যেহেতু সর্বত্রই জামাত রয়েছে মূলধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে; তাই জঙ্গীগ্রুপগুলোর বেড়ে উঠতে কোন বেগ পেতে হয়নি। ভোটের রাজনীতির স্বার্থে পাকিস্তানে মুসলিম লীগ নওয়াজ, ভারতে বিজেপি এবং বাংলাদেশে বিএনপি জামাতকে সফরসঙ্গী করেছে। এই প্রশ্রয়ে জামাত ব্যবসা-বানিজ্য প্রসার করেছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার লড়াইটি নিজেরাই চালিয়ে যাবার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্জন করেছে।

জামাতই একমাত্র দল যারা কর্মীদের মাসিক বেতন দিয়ে কথিত জিহাদীর চাকরীতে নিযুক্ত করে। এই কর্মীরা তাদের কথিত খিলাফতের দর্শনের সঙ্গে জীবন ধারণের অর্থ পেয়ে যাওয়ায় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে জামাতের সাংগঠনিক কাঠামো অনেক শক্ত; প্রশিক্ষণ অত্যন্ত পোক্ত। ফলে তারা অনেক বেশী সুসংগঠিত।

পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশে সাধারণ, ইংলিশ মিডিয়াম, মাদ্রাসা এই তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজ বেড়ে ওঠায় চিন্তার জগতে তিনরকমের মানুষ তৈরী হয়। আবার সামগ্রিকভাবে সাংস্কৃতিক আলোকায়ন না ঘটায় বিক্ষিপ্ত মনোজগতের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে যারা সবাই প্রায় দিকনির্দেশনাহীন। কেউ সৌদী আরবকে সাংস্কৃতিক রোলমডেল হিসেবে নিয়েছে তো কেউ এমেরিকাকে সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে নিয়েছে। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের যে মাটিসঞ্জাত সংস্কৃতির মৌলিকত্ব তা প্রায় ক্ষয়িষ্ণু। এতে সাংস্কৃতিক বাতাবরণে মানবিক ঐক্যের জায়গা বিলুপ্তির পথে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো আকন্ঠ দুর্নীতিতে ডুবে থাকায় তারা সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেনা। নাগরিকের নিরাপত্তা দেবার বিন্দুমাত্র সামর্থ্য নেই তাদের। নিজেদের দলীয় কর্মীদের নিয়েও কোন সুপরিকল্পনা নেই। বেকার কর্মীরা তাই চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট করে তুলেছে জনগণকে। অন্যদিকে জামাতের কর্মীরা দলের বেতনে চলছে; সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় প্রশিক্ষণ অনুসারে মধুমিশ্রিত সাম্প্রদায়িকতার বিষ খাইয়ে দিচ্ছে। সমাজে প্রথমে এরা নিজেদের একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করেছে এরপর সে গ্রহণযোগ্যতার সুযোগ নিয়ে একটি অভয়ারণ্য তৈরী করে নিয়েছে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে।

দুর্নীতির কারণে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় অধিকার বঞ্চিত কিশোরদের মধ্যে প্রথমে খিলাফত এবং পরে জিহাদের স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে জামাত তার অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়েছে। সমাজের মধ্যে ‘জামাতে ইসলাম’ ‘ধর্ম’ ইসলামের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই বাস্তবতায় মূলধারার প্রায় প্রতিটি দলই জামাতের সঙ্গে একটা কৌশলগত সদ্ভাব বজায় রাখতে শুরু করেছে। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার খুব উপাদেয় এটি বুঝে গিয়ে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোও ধর্ম প্রদর্শনের নাটকে অংশ নিয়েছে। জামাতের পান্ডুলিপিতে যেন অভিনয় করে চলেছেন প্রতিটি দলের নেতা এরকম একটি বাস্তবতা দৃশ্যমান পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়।

ভারতীয় উপমহাদেশের টাইটানিক জাহাজটি ডুবে যাচ্ছে এরকম একটি আশংকা জঙ্গীগ্রুপগুলো তৈরী করায়; পশ্চিমা বিশ্বে সেকেন্ড হোম তৈরীর ধুম পড়ে গেছে আত্মকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত ও বিত্তবানদের। জনমানুষের মনে ভীতি তৈরীর কাজটি জঙ্গীরা প্রতিনিয়ত করে চলে। এখন তারা লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে একটি অজুহাত খুঁজে নিয়েছে; সে অজুহাতের নাম অবিশ্বাসের দর্শন বা নাস্তিকতার বিরুদ্ধে লড়াই। কারণ যে সমাজে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটেনি, যেখানে যুক্তিচর্চার কোন আগ্রহ নেই; সেখানে চট করে ‘অনুভূতি’তে আঘাতের ধোয়া তুলে “আমরা” বনাম “ওরা” বিভাজন তৈরী করা খুবই সহজ। ওদিকে আগে থেকেই হিন্দু বনাম মুসলমান বিভাজনের ধোয়া তুলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যা-নির্যাতন-উচ্ছেদ লেগেই আছে যেখানে জামাতের সঙ্গে মূলধারার প্রায় সব দলের লুন্ঠকদের একটি ঐক্য অবিচল। ভারতে শিবসেনা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের ওপরে নির্যাতন জারী রয়েছে। পাকিস্তানে হিন্দুদের উচ্ছেদ প্রায় শেষ হয়ে এলে “শিয়া” ও “সুন্নী”র আমরা ও ওরা বিভাজন তৈরী করে হত্যা উচ্ছেদ চালিয়েছে জামাত সমর্থিত জঙ্গীরাই। বাংলাদেশে শিয়া সুন্নী না থাকায় এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি ও বিপক্ষের শক্তি বিভাজনটি আত্মীয়তা ও বেয়াইঘটিত কারণে সুস্পষ্ট না করা যাওয়ায় জামাত খুঁজে বের করেছে “আস্তিক” বনাম “নাস্তিক” বিভাজন। কারণ সমাজের সাংস্কৃতিক উত্তরণ না ঘটায় ভিন্নমত গ্রহণের সক্ষমতাই যেখানে বেশীর ভাগ মানুষের তৈরী হয়নি; সেখানে অবিশ্বাসের দর্শনের ভিন্নমতকে গ্রহণে সমাজ অক্ষম। এই অক্ষমতার সুযোগে ধারাবাহিক ব্লগার হত্যায় অনেক মানুষকেই নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। হত্যা যে সব সময়ই একটি অপরাধ এবং হত্যার পক্ষে কোন যুক্তিই থাকতে পারেনা, এই স্বাভাবিক বোধ তৈরী হয়নি এই অস্বাভাবিক সমাজে।

এরপর জঙ্গীরা শুরু করেছে পুলিশ হত্যা। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে তারা। এই চ্যালেঞ্জটি একইভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি ছুঁড়ে দিয়েছিলো জঙ্গীরা। তার ফলাফল দৃশ্যমান। দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের প্রতি বিরক্তি আর জামাতের ছড়িয়ে দেয়া “আল্লাহর ভয়” পাকিস্তানকে জঙ্গীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। এই সুযোগে সাধারণ মানুষের বেশী ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে জঙ্গীরা। এরপর চ্যালেঞ্জ করেছে পাকিস্তানের সরকারকে। পাকিস্তানের এই কেসস্টাডিটি ভারতে বর্তমানে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। আত্মঘাতী চিরশত্রু দুটি দেশ শীঘ্রই একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে; এতে মদত জোগাচ্ছে উভয় রাষ্ট্রের কট্টরপন্থীরা। এটি ঘটলে ভারতীয় উপমহাদেশের নিমজ্জন অবশ্যম্ভাবী।

আর বাংলাদেশ নিজেই একটি গ্রহ। সেখানে পাকিস্তানের মত অপরাধের ডিনাইয়াল ও দুর্নীতির জাস্টিফিকেশান আছে; আছে ভারতের মত বাস্তবতা লুকিয়ে সাফল্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের শঠতা। অর্ধশিক্ষিতের দম্ভ আছে, নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য অন্যকে দায়ী করার ‘এলিবাই’ রোগ আছে, মুক্তিযুদ্ধে যার পরিবারের একজনও মারা যায়নি, যার বাড়ীতে লুন্ঠন হয়নি, জামাতের সহায়তায় পাকিস্তানের দখলদার বাহিনী যার বাড়ী পোড়ায়নি, একজন আত্মীয়ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলনা; তারা “হোলিয়ার দ্যান দাউ, লুটে পুটে খাও’ মন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিক্ষক হয়ে সামাজিক পুলিশী করে বেড়াচ্ছে; নাস্তিক খুন হলে খুশী হচ্ছে, হেফাজতের হুজুরকে জমি নজরানা দিচ্ছে এবং ভারতীয় উপমহাদেশব্যাপী চলমান আই এস-আল কায়েদার গেরিলা যুদ্ধটাকে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চিন্তা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দিয়ে ব্যাখ্যা করছে। ফলে ষড়যন্ত্রসূত্রের গ্রাম্য উপকথার জুজুর প্রাদুর্ভাবে অনায়াসে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে জামাতের জঙ্গীরা যাদের শক্তির উতস জামাতের অর্থনীতি।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলের মধ্যে যারা চিন্তার জগতে এগিয়ে আছেন, তাদের কর্তব্য জনগণের আস্থা অর্জন ও দলীয় ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ যাতে প্রতিদিন জনগণ ক্ষমতাসীন দলের ওপরে বিরক্ত হয়ে না ওঠে। জনগণকেও একটি বিষয় উপলব্ধি করতে হবে যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়া যেখানে আল-কায়েদা ও আই এস আক্রান্ত; সেখানে সরকারের সঙ্গে সহযোগী মনোভাব পোষণ করাই সঙ্গত। রাষ্ট্রের পুলিশ যখন জঙ্গীদের হাতে খুন হয়; তখন পুলিশকে স্বজন ভাবতে হবে; কারণ জনমানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাদের হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ বাস্তবতায় সুশাসন অধরা স্বপ্ন হলেও; যতটুকু আছে তা বাঁচিয়ে রাখতে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যের বিকল্প নেই। গত বিএনপি শাসনামল দেখে আমরা উপলব্ধি করেছি বিএনপি-জামাত মানেই জাতির মৃত্যুদন্ড। আর সাম্প্রতিক আওয়ামী লীগের শাসন দেখে আমরা উপলব্ধি করেছি, আওয়ামী লীগ মানে জাতির যাবজ্জীবন কারাদন্ড। দ্বিতীয়টিই বাস্তবসম্মত বিকল্প। কারাগারে আছি; কিন্তু বেঁচে তো আছি।

(লেখাটি ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)