জঙ্গি বিভীষিকায় বাংলাদেশ

হুসাইন মোঃ জিয়াউল হুদা

সিনিয়র রিপোর্টার

সাপ্তাহিক মুক্তমন

১লা জুলাই ,২০১৬ নির্মমতার এক দুর্দান্ত মঞ্চায়ন ‘গুলশান বেদনা’। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহ হার মানাবে কালজয়ী যে কোন ক্রাইম সিরিজকেও। ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যা কাণ্ডে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে গোটা দেশের জনগন। রাজধানীর কূটনৈতিকপাড়া হিসেবে খ্যাত গুলশানে ২ এর ৭৯ নং সড়কের স্প্যানিশ রেস্তরা ‘হলি আরটিসান’ ঢুকে কতিপয় সসস্ত্র জঙ্গি ১৭ জন বিদেশিকে এবং ৩ জন বাংলাদেশিকে নির্মম ভাবে জবাই করে হত্যা করে। তার আগে জঙ্গিদের গুলি ও বোমাবর্ষণে আরও দুই পুলিশ সদস্য নিহত হন। আহত হন অনেকে। ২০০৪ সালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গুলি ও গ্রেনেড হামলার পর এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা। গুলশনের জঙ্গি হামলার রেশ কাটতে না কাটতে ঈদের দিনে আবারো জঙ্গি হামলা। এবার সন্ত্রাসবাদীদের টার্গেট ঢাকা থেকে ১৪৪ কিলোমিটার দূরে কিশোরগঞ্জ শলাকিয়া ঈদগাহ। দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামায়াতের মাঠে ঈদের দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ৪ পুলিশ সদস্য নিহত হন । আহত হন প্রায় ১২ জন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই পুলিশ।

ফের বাংলাদেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করছে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও গোয়েন্দারা। নিরাপত্তা ব্যাবস্থাকে তাই ঢেলে সাজান হচ্ছে এবং নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। এরই মধ্যে ২০ জুলাই যমুনা ফিউচার পার্কে জঙ্গি হামলার কথা বলে সামাজিক যোগাযোগের সাইট টুইটারে একটি বার্তা প্রকাশিত হয়। যদিও এই ঘটনাকে সরকার জঙ্গিদের অপ-কৌশল হিসাবে দেখছে।

গুলশান-কিশোরগঞ্জের মতো হামলা যে অদূর ভবিষ্যতে আরও ঘটতে চলেছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রশাসনকে ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে বিভিন্ন রাষ্ট্র। আশংকা করা হচ্ছে ঢাকার মতো বড় শহর ছাড়াও কিশোরগঞ্জ কিংবা এইরূপ বিভিন্ন স্থানে যে কোন জমায়েতের উপর হামলা চালিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেবে জঙ্গিরা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে হামলা চালানো হতে পারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরেও। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, বাংলাদেশে ফের বিদেশির ওপর  বড় ধরনের হামলার আশংকা করছে যুক্তরাষ্ট্র । বাংলাদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। চলাফেরার করার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সুত্রমতে, ঢাকা-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় নানা মাপের হামলা চালানোর জন্য জঙ্গিদের একটি বড়সড় রিজার্ভ বেঞ্চ তৈরি হয়ে রয়েছে রাজধানীর ১৫ কিলোমিটার বৃত্তের মধ্যে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশের কমপক্ষে ২৪ টি স্থানে জঙ্গিরা হামলা চালাতে পারে বলে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ইতিমধ্যে একটি খবরও প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতীয় গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন, পরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হতে পারে।

২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, নাট্যকর্মী, ভিন্নধর্মাবলম্বী সনাতন , খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ পুরোহিত ও বিদেশীদের উপর জঙ্গি হামলার ঘটনাগুলোকে সরকার বারবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এক ধরনের ধারাবাহিক উদাসীনতা দেখিয়েছিলো। সাম্প্রতিক গুলশানের বর্বর জঙ্গি হামলার পর সরকারের টনক কিছুটা হলেও নড়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব জঙ্গি হামলার ব্যাপারে দৃশ্যত কোনরূপ সফলতা পায়নি । আগাম হুমকি গুলোও যথাযথভাবে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। গুলশান ও শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার ঘটনায় পরিষ্কার হয় যে, জঙ্গি হামলা প্রতিহত করতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর দক্ষতার অভাব রয়েছে।

জঙ্গিবাদীদের এই করাল গ্রাস হতে সহসা মুক্তি মিলবে এমন ভাবা মোটেও যুক্তি যুক্ত নয়। আমাদের দেশে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদ ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছিলো। ২০০৫ সালের ১৭ ই অগাস্ট ‘বাংলা ভাইয়ের’ নেতৃত্বে রাজশাহী মহানগরীতে জঙ্গিরা প্রকাশ্য মোটর শোভাযাত্রা করেছিলো। একই দিনে সারা দেশে পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটানো হয়েছিলো। ঐ ঘটনায় পর সারা দেশে  ১৫৯ টি মামলা দায়ের করা হয়েছিলো। জঙ্গিবাদের সেই বিস্তার পরবর্তীকালে দমন করা হলেও সেই জঙ্গিদের অনেকেই এখনো এ দেশেই আছে এবং তারাই বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় তারা অনেক বেশী প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। আর সেই কাজে জামায়াতে ইসলাম তাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের সরাসরি সম্পৃক্ততাও পাওয়া যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, যে কোনও সময় হামলার জন্য তৈরি বেশির ভাগ জঙ্গিই বয়সে তরুণ, উচ্চশিক্ষিত, কম্পিউটারে পারদর্শী এবং একই সঙ্গে সমাজের উপর তলার প্রতিনিধি। গুলশান হামলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, এক জন বাদে বাকি জঙ্গিরা সকলেই উচ্চশিক্ষিত ছিল। একই ভাবে যে তিন সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গি সাম্প্রতিক এক ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশে একাধিক হামলার হুমকি দিয়েছে, তারাও যথেষ্ট শিক্ষিত এবং সমাজে পরিচিত বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা। এমনকি জঙ্গিরা যেসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ করছে তাতেও বিস্মিত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যোগাযোগের এসব টুলসও গোয়েন্দা নজরদারিতে আনার চেষ্টা চলছে। জঙ্গিরা বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তারা নিত্য-নতুন অ্যাপস ব্যবহার করে। গুলশানের হোলি আর্টিজান রেঁস্তরায় হামলার পরও জঙ্গিরা বিশেষ অ্যাপসের মাধ্যমে ছবিগুলো তাদের নিজেদের লোকজনের কাছে পাঠায় বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জঙ্গিরা সাধারণত মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কমন উপকরণগুলো ব্যবহার করছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন ব্লগ নজরদারি করে থাকে। কিন্তু জঙ্গিরা ‘প্রটেক্টেড টেক্সট’ ঘরানার এমন কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি করতে পারে না। এসব সফটওয়্যার ব্যবহারের সময় সার্ভার পার হওয়ার সময় বার্তাগুলো এনক্রিপ্ট হয়ে যায়।

জঙ্গিবাদের উত্থান শুধু বাংলাদেশ নয়, এটি এখন এক বৈশ্বিক সমস্যা। প্যারিস হামলা, বেলজিয়াম ও তুরস্কের বিমানবন্দরে হামলা, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশের হোটেল ও বিচে হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের নাইট ক্লাবে হামলাসহ সাম্প্রতিক কিছু নিষ্ঠুরতম হামলা বিশ্ববাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তারও আগে মুম্বাইয়ের হোটেলে হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা, পাকিস্তানের স্কুল কিংবা মসজিদে হামলার মতো বহু ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। জঙ্গিবাদ সৃষ্টির প্রধান কারণগুলো কোন পরিস্থিতিতে তৈরি হয়, তার ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে অপরাধ জগতের অজস্র তথ্যবৃত্তান্ত। যেখানে সন্ত্রাস সংঘটনকারীদের পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে তাদের জঙ্গিবাদী কার্যকারণ সম্পর্ক মেলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন সন্ত্রাস বিশ্লেষকেরা। আর সে জন্যই জিজ্ঞাসা জেগেছে, বর্তমান বিশ্বে জঙ্গিবাদের এই বিপুল উত্থান কিসের কারণে? সে কি দারিদ্র্যের কশাঘাত, ধর্মীয় উন্মাদনার যুক্তিহীন উন্মেষ, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কুটিল অভিপ্রায়, নাকি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ বিদ্রোহে? অনেকে আধুনিক জঙ্গিবাদের মূল কারণকে রিলিজিয়াস ফ্যানাটিজম বা ধর্মীয় উন্মাদনার বিস্তার বলে বিশ্বাস করেন।

বিশ্বের জঙ্গিবাদের ঢেউ বাংলাদেশেও ধাক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমান যে জঙ্গিবাদ তার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের দৃষ্টি নিতে হবে তালেবানের উত্থানের সময়টিতে। ৮০-এর পর বাংলাদেশ থেকে অনেক ইসলামিক যোদ্ধা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তানে যায়। সময়ের পরিক্রমায়, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্রয় ও মদদে চলে জঙ্গিবাদ বিস্তার। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারে বিভিন্ন এনজিও, দাতবসংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠন ও ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। অনেকেই ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ‘ইনকিউবেশান পিরিয়ড’ বলে মনে করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান এবং দেশে-বিদেশে তাদের নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

বাংলাদেশে এখন সব ধরনের অপরাধ এত ব্যাপকভাবে সংঘটিত হচ্ছে যা উদ্বেগজনক বললেও ঠিক বলা হয় না। এ এক অতি আতঙ্কজনক ব্যাপার। কিছু পরিচিত লোকজন ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু কিছু আন্দোলন ও সংবাদপত্রে রিপোর্ট এবং আলোচনা হলেও এর বাইরে হত্যাকাণ্ড অসংখ্য। সুত্রমতে, ২০১৫ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৪ হাজার ৩৫ জন। ২০১৪ সালে খুন হয় ৪ হাজার ৫৯৪ জন। চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের গত ৩ মাসে সারাদেশে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৮৬৫টি। এর মধ্যে গত জানুয়ারি মাসে ২৬৭ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৯১ জন ও মার্চ মাসে ৩০৭ জন খুন হয়েছেন। চলতি মাসে গত ২৫ দিনে খুনের ঘটনা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে! লুটতরাজ, ভূমি দখল, চুরি, দুর্নীতি, ব্যাংক ডাকাতি, ছিনতাই, গুম ইত্যাদির ঘটনা খুব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও হত্যাকাণ্ডের ব্যাপকতা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা হলো সব থেকে আতঙ্কের ব্যাপার। গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে জঙ্গিদের পরিচিত স্টাইলে মোট ৪৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে নিহত হন ৪৮ জন৷ এদের মধ্যে দু’জন পুলিশ সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীও আছেন৷ গত আড়াই মাসে হত্যা করা হলো ১১ জনকে৷ এ সব হামলার অনেকগুলোরই দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস ও আল-কায়েদার ভারতীয় উপ-মহাদেশের কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল-ইসলাম।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সরকারি সংস্থার ওপর হামলা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছে। প্রথমবারের মতো এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তঃদেশীয় গ্রুপগুলো। ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ৩০শে মার্চ, ১২ই মে, ৭ই আগস্ট ও ৩১শে অক্টোবর চার ব্লগার ও এক প্রকাশকের ওপর চালানো হামলার দায় স্বীকার করে আইএস। এর মধ্যে নিহত একজন ছিলেন মার্কিন নাগরিক। আইএস ৯টি হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৮শে সেপ্টেম্বর ইতালিয়ান এনজিওকর্মী হত্যা, ৩রা অক্টোবর জাপানি ত্রাণ কর্মী হত্যা এবং ১৮ই নভেম্বর একজন ইতালিয়ান যাজকের ওপর হামলা। ২৪শে অক্টোবর শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে চালানো হামলার পেছনেও আইএস ছিল বলে খবর আসে। ওই হামলায় একজন নিহত এবং প্রায় ১০০ মানুষ আহত হয়। ৪ঠা নভেম্বর পুলিশের একটি তল্লাশিচৌকিতে চালানো হামলায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। এ ছাড়া ২৫শে ডিসেম্বর আহমেদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী হামলা চালানোর খবর পাওয়া যায়। এ দিনের হামলাকারী নিহত হয়। গণমাধ্যমে ১০ থেকে ১২ জন আহত হওয়ার খবর আসে। এ ছাড়া, ১৮ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামে একটি নৌঘাঁটিতে অবস্থিত দুটি মসজিদে হামলা চালানো হয়। তবে এ হামলার দায় কেউ স্বীকার করে নি। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এতে ৬ থেকে ২৫ জন আহত হয়। এ ছাড়াও, খ্রিষ্টান, হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলিম গ্রুপগুলোর ওপর হুমকি ধামকি ও ছোট আকারের হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ মাস যশোরে উদীচী শিল্প গোষ্ঠীর উপর প্রথম বোমা হামলা হয়। মারা যায় ১০ জন, আহত হয় ১০৬ জন। একই বছরের অক্টোবরের ৮ তারিখে খুলনায় আহমদিয়াদের মসজিদে বোমা হামলায় মারা যায় আট জন, আহত হয় ৪০ জন। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিলে রমনা পার্কের বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ নিহত ও একশরও বেশি আহত হয়েছে। ২০০১ সালের শেষের দিকে, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সভায় জঙ্গিদের বোমা হামলায় ৮ এবং ৪ জন যথাক্রমে মারা যান। আহতের সংখ্যা শতাধিক। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরাতে শক্তিশালী দুটি বোমা হামলায় মারা যায় ৩ জন, আহতের সংখ্যা ছিল ১২৫এরও বেশি। একই বছরের ৭ ডিসেম্বর সিরিয়াল বোমা হামলা চালানো হয় ময়মনসিংহের সিনেমা হলগুলিতে। মারা যায় ১৮ জন, আহত হয়েছিলেন ৩০০। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জে শহরে দানিয়ার এক মেলাতে বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় ৮ জনকে। আহত হন অনেকে। ২০০৪ সালের ১২ জানুয়ারি সিলেটের হযরত শাহ জালাল দরগার শরীফে এক বোমা হামলায় ১০ জন মারা যায় এবং আহত হয় ১৩৮ জন। ২১ মে, ২০০৪ সিলেটে তখনকার ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে চালানো বোমা হামলায় হাইকমিশনার বেঁচে গেলেও মারা যায় অন্য দুজন, আহত হয় ২০ জন। একই বছরের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক সিরিয়াল গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ঘটে। এতে নিহত হয় ২৩ জন, আহত হয় পাঁচ শতাধিক। এ হামলায় তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের একটি বৃহৎ অংশ, বিশেষ করে বিএনপির শক্তিশালী তরুণ নেতৃত্ব ও জামাতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে; বিষয়টি এখন বিচারাধীন। আওয়ামী লীগ প্রধান তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও মারা যান মহিলা আওয়ামী লীগ প্রধান আইভি রহমান। ২০০৫ সালে ১ জানুয়ারি বগুড়া ও নাটোরে বোমা হামলায় মারা যায় ৩ জন, আহতের সংখ্যা সত্তরের অধিক। একই মাসে হবিগঞ্জের বৈধর বাজারে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা হামলায় মারা যান সাবেক অর্থমন্ত্রী গোলাম কিবরিয়াসহ পাঁচ জন। আহত হয় ১৫০ জন। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে প্রতিটি জেলায় বোমা হামলা করা হয়। জঙ্গিরা তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা কেমন তা দেশবাসীকে জানান দেয় এভাবেই। নভেম্বরের ১৪ তারিখে ঝালকাঠিতে দু’জন সহকারী জেলা জজকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়। ২৯ নভেম্বরে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে একসঙ্গে বোমা হামলা করা হয়। এ হামলায় নিহতের সংখ্যা ৯, আহতের সংখ্যা ৭৮। ২০০৬ সালের ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ের সামনে এক বোমা হামলায় নিহত হয় ৮ জন, আহত ৪৮ জন।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৩ সালে জেএমবি, হিজবুত তাহিরির, হরকাতুল-জিহাদ-উল-ইসলাম (হুজি) ও ইসলামিক বিপ্লবী পরিষদকে (আইডিপি) নিষিদ্ধ করার জন্য বিএনপি-জামাত জোট সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের ভিতরের জঙ্গিবাদের সমর্থক অংশের বাধার কারণে সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়, বরং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে যাওয়া হয়েছে।

গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক, ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানের মত আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার লক্ষণ এখন সারা বাংলায়। বাংলাদেশের গোটা জনপদেই এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। এমন কি সরকার দলীয় নেতাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে এসব সন্ত্রাসীদের বেড়ে ওঠার কাহিনীও প্রায়ই মিডিয়ার খবরে আসে। সাম্প্রতিক গুলশান হামলাকে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । তার মতে, এই চক্রান্তের অংশ হিসেবেই কতিপয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রাজধানীর গুলশানের  রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় এবং সেখান অবস্থানরত নিরস্ত্র, বেসামরিক নাগরিকদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হত্যাকাণ্ড শুরু করে।এই ঘটনায় নিহত নাগরিকদের জন্য শোক পালন করছে ইতালি। জাপান সরকারের পক্ষ থেকে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। নিহতদের জন্য প্রদীপ জ্বেলে শোক জানানো হয়েছে কলকাতায়। অন্যদিকে হত্যাকান্ডের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গুলশানে হামলার হামলার নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এশিয়া বিষয়ক উপদেষ্টা ড. নীনা আহমেদ। সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন ভুটানের সাবেক রাজা ও বর্তমান রাজার বাবা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক।

অনেকের ধারণা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতেই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য। কেননা এ জঙ্গি হামলায় নিহত ২০ জনের মধ্যে ১৭ জনই বিদেশী নাগরিক। এবং এমন এমন দেশের নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছে যারা বাংলাদেশকে ভালোবেসে দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।  তাদের টার্গেট করা হয়েছে মূলত দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ করে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতেই। উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত আর্থ সামাজিক নানা অবস্থানে থাকা সব দেশ কম-বেশি এর শিকার। প্রকৃতই আমাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের পথে জঙ্গিবাদ বড় প্রতিবন্ধক। তাদের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। মানব সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দুরূহ হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে জঙ্গিবাদ বিস্তারের পরিধির তারতম্য থাকলেও এর পিছনে রাজনৈতিক ভূমিকা প্রায় একই। অপরাজনীতির কারণেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো সমাজে জঙ্গিবাদের শিকড় খুব গভীরে। উদাহরণস্বরূপ, এই দুটি দেশেই জঙ্গি গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থকরা জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে। ভারতেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণে গুজরাটের দাঙ্গা এবং অতিসম্প্রতি সংখ্যালঘু মুসলিম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের গরিব মানুষদের নানা সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে হিন্দুত্বকরণ হচ্ছে। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ জঙ্গিবাদে রূপ না নিলেও দেশটির বহু প্রদেশেই রাজনৈতিক জঙ্গিবাদ রয়েছে।

অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। একাত্তরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এ দেশের সব ধর্মের মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তাই দেশ স্বাধীনের পর রাষ্ট্রীয় চার মূল নীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষ রেখে সব ধর্মের মানুষের সমাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাছাড়া আমাদের ভারত উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পীর, দরবেশ, অলি, সুফিদের দ্বারা। বার আওলিয়ার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ কখনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে না। সহজ-সরল মানুষকে ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে তাদের শারীরিক নির্যাতন, হত্যা করা এগুলো ইসলামের পরিপন্থী গর্হিত কাজ। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, সরকারের পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের। জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে দুটি বড় দল যদি পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগ করে, তা সুযোগ তৈরি করে দেবে জঙ্গিদের।