সার্চ কমিটিতে দৃষ্টি বিএনপির

বিশেষ প্রতিনিধি : বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের আগে  রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হলেও ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ কমিশন হয়নি বলে অভিযোগ জানিয়ে আসা বিএনপি এবার এই প্রক্রিয়ার ওপর প্রখর দৃষ্টি রাখছে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। এ অবস্থায় নতুন ইসি গঠনের জন্য সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে সম্প্রতি সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে মন্তব্যের পরে নড়চেড়ে বসেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।

নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যাতে জনমতের প্রতিফলন ঘটে এবং একটি গ্রহণযোগ্য কমিশন হয়, সে ব্যাপারে সম্ভাব্য সবরকম কাজ করবে বিএনপি।

দলটি মনে করছে, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনই আগামীতে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে। সেজন্য নতুন কমিশন গঠনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে দলটি।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য সার্চ কমিটি বা অন্য কোনো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। জনমতের বাইরে কোনো কমিটি গঠন হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা অবশ্যই নির্বাচন চাই। তবে সেটি গণতান্ত্রিক উপায়ে এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে হতে হবে, গৃহপালিত ইসির অধীনে নয়। নিজের মতো করে সবকিছু সাজিয়ে নেবেন, তা হবে না। সার্চ কমিটি করেন, আর যে কমিটিই করেন, জনমতের বাইরে গিয়ে কোনো কমিটি এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না।’

গতবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। এরই মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, এরপর রাষ্ট্রপতি যথাসময়ে সংবিধান অনুসারে ইসি গঠন করবেন।

সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রপতি সবসময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনার (ইসি) নিয়োগ দিলেও ২০১২ সালে সর্বশেষ কমিশন গঠিত হয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে। সে সময় প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান।

সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি নিয়োগের আভাস দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এবারও আগের প্রক্রিয়ায় কমিশনার নিয়োগ করা হবে। ২০১২ সালে যেভাবে বর্তমান ইসি গঠন করা হয়েছিল, এবারও সেভাবেই হবে।’

সিইসি ও ইসি নিয়োগে সংবিধানে আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও গত চার দশকের বেশি সময়ে তা হয়নি। আনিসুল হক বলেন, ‘সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়নের বিষয়টি এখনো সরকারের বিবেচনায় আসেনি; তেমন পরিকল্পনা নেই।’

সার্চ কমিটি নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় তাদের শূন্যস্থান কীভাবে পূরণ হবে, সে প্রক্রিয়ার ওপর প্রখর দৃষ্টি রাখছে দলটি। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ফর্মুলা দেওয়ার চিন্তাও রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সম্ভাব্য সবরকম কৌশল প্রয়োগ করবে তারা।

দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই অবাধ নির্বাচন সম্ভব। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন থাকলে সরকার ইচ্ছা করলেও ভোটে কারচুপি কিংবা প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাবে না। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এতোটা বেপারোয়া আচরণ করবে না। তবে কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে সরকার ‘গৃহপালিত’ ইসি গঠনের দিকে এগোলে তা প্রতিরোধ করার মতো কর্মসূচিও দিতে পারে বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন, ২০১৪ সালের চেয়ে ‘নিকৃষ্ট নির্বাচন’ করার জন্য সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠনের নামে সরকার মুলা ঝুলিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা রাষ্ট্রপতির অধীনে কোনো নিরপেক্ষ কমিশন গঠন হতে পারে না, এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে।’

‘সকল রাজনৈতিক দল মিলে নির্বাচন কমিশনের পাঁচ সদস্য নির্বাচন করুক। রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করবেন। এটা একটা পথ হতে পারে। তা নাহলে এই সার্চ কমিটি দিয়ে, আরেকটা রকিবউদ্দীন মার্কা নির্বাচন কমিশন করলে সেই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারবে না,’ বলেন গয়েশ্বর।

দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে যাদেরকে ইসির নেতৃত্বে আনা হয়েছিল, তাদের দিয়ে কী নির্বাচন হয়েছে তা মানুষ দেখেছে। সার্চ কমিটির নাটকের পরিচালক আওয়ামী লীগ। এই নাটক দেশের মানুষ দেখে না।

‘আবার সেই সার্চ কমিটির কথা বলা হচ্ছে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার জন্য। বাংলাদেশের মানুষ এই সার্চ কমিটি আর গ্রহণ করবে না। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। তা না হলে গঠিত নির্বাচন কমিশন দিয়ে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন মানুষ কখনো গ্রহণ করবে না’, বলেন আমির খসরু।

সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন না হলে, তা প্রতিহত করা হবে বলেও হুঁশিয়ার করেন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই সদস্য।