বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা অ্যাশেজ হোক

ডেস্ক: ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ড ও ক্রিকেটের তীর্থভূমি অস্ট্রেলিয়া। আজ থেকে ১৪০ বছর আগে (১৮৭৭ সালে) দুটি দেশ একই সঙ্গে টেস্ট স্ট্যাটাস পায়। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর তাদের মধ্যেই কেবল টেস্ট খেলা চলছিল। এর ঠিক ৫ বছর পর ১৮৮২-৮৩ মৌসুমে দেশ দুটির ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের অনানুষ্ঠানিক নাম অ্যাশেজ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অবশ্য এই ‘অ্যাশেজ’ নামকরণ হওয়ার পেছনেও রয়েছে মজার এক ইতিহাস।
১৮৭৭ সালে টেস্ট ক্রিকেট শুরু হওয়ার পর ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টে জয় পায়নি অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ১৮৮২ সালে মাত্র ৮৫ রানের টার্গেট ছুড়ে দিয়েও ইংল্যান্ডকে রুখে দেয় অস্ট্রেলিয়া। ৮৫ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৭৭ রানে অলআউট হয় ইংলিশরা।

         বাংলাদেশের কাছে হারার পর শ্রীলঙ্কার দ্য আইসল্যান্ড পত্রিকায় প্রকাশিত অবিচুয়ারি
তখন ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় পত্রিকা দ্য স্পোর্টিং টাইমসের নবীন সাংবাদিক রেজিনাল্ড শার্লি ব্রুকস ‘ইংলিশ ক্রিকেটের অবিচুয়ারি’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘ইংলিশ ক্রিকেটকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে ওভালের ২৯ আগস্ট, ১৮৮২ তারিখটি। গভীর দুঃখের সাথে বন্ধুরা তা মেনে নিয়েছে। ইংলিশ ক্রিকেটকে ভস্মিভূত করা হয়েছে এবং ছাইগুলো অস্ট্রেলিয়াকে প্রদান করেছে।’
তরুণ সাংবাদিক শার্লির এই কা-টি তখন বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরের বছর ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া সফরে যায়। সফরে যাওয়ার আগে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ইভো ব্লাই বলে যান অ্যাশেজ ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছি। তখন ইংল্যান্ডের পত্রিকাগুলো তার কোড নিয়ে লিখে যে ‘অ্যাশেজ/ছাই ফিরিয়ে আনতে অস্ট্রেলিয়া গেল ইংল্যান্ড’। সেবার ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে ইংল্যান্ড।
সিরিজ শেষে মেলবোর্নের কয়েকজন নারী ওই ম্যাচের স্ট্যাম্পের বেল পুড়িয়ে একটি ছোট পাত্রে ভরে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ইভো ব্লাইকে দেন। এটিকে যে ‘অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের ভস্ম/অ্যাশেজ’ হিসেবে উল্লেখ করে কিছু পত্রিকা। সেই থেকে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের এই লড়াইয়ের অলিখিত নামকরণ হয়ে যায় ‘অ্যাশেজ’।

১৮৮২ সালে ইংল্যান্ডের দ্য স্পোর্টিং টাইমস ও ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার দ্য আইসল্যান্ড পত্রিকায় প্রকাশিত অবিচুয়ারি

এর ঠিক ১৩৫ বছর পর সেই ঘটনার পুনঃরাবৃত্তি হলো? তারিখ ও সময় ভিন্ন হলেও ভেন্যুর নাম কিন্তু একই রকম! ওভাল। সেটা ছিল দ্য ওভাল। আর এটা পি. সারা ওভাল। ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ তাদের শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কাকে ৪ উইকেটের ব্যবধানে হারিয়ে দেয়। এর আগে কখনো শ্রীলঙ্কা দল বাংলাদেশের কাছে হারেনি। সেটা হোক শ্রীলঙ্কায় মাটিতে, কিংবা বাংলাদেশে। শ্রীলঙ্কার এমন হারে সমর্থকরা বেশ মর্মাহত হয়েছে। এমন হারের পর রেজিনাল্ড শার্লির মতো শ্রীলঙ্কার দ্য আইসল্যান্ড পত্রিকাও ‘অবিচুয়ারি’ লিখেছে।
১৮৮২ সালের সেই ঘটনার মতো করেই তারা লিখেছে, ‘শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে ওভালের ১৯ মার্চ, ২০১৭ তারিখটি। গভীর দুঃখের সাথে বন্ধুরা তা মেনে নিয়েছে। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটকে ভস্মিভূত করা হয়েছে এবং ছাইগুলো বাংলাদেশের নিয়ে যাওয়া হবে।’ এর আগে পত্রিকাটি বড় করে শিরোনাম করেছে ‘রেস্ট ইন পিচ (আরআইপি) শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট’। আর নিচের দিকে একটি কার্টুনও প্রকাশ করেছে তারা। সেখানে দেখা যায় শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা শব বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন।

জয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাংলাদেশের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের উল্লাস
দ্য আইসল্যান্ড যা করেছে তার মধ্য দিয়ে যদি বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা মধ্যকার ‘অ্যাশেজ’ সিরিজ চালু হয়ে যায় তাহলে সেটা এশিয়ার ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য দারুণ কিছু হবে। কারণ, পাকিস্তান তাদের ঘরের মাঠে খেলতে পারছে না বহুদিন ধরে। ভারত নিজেদের অভিজাত দাবি করে। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাটাই তাদের হাতে। ক্রিকেটের তিন মোড়লের একজন তারা।
বাংলাদেশ প্রথম টেস্টটি ভারতের বিপক্ষে খেললেও টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ১৭ বছরের মাথায় বাংলাদেশকে তারা খেলতে ডেকেছিল তাদের ঘরের মাঠে। নিয়মিত তাদের সঙ্গে টেস্ট আয়োজন করা হয়তো সম্ভব হবে না। এশিয়ার দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতীম দেশ। সেক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ‘অ্যাশেজ’ সিরিজের মতো কিছু হতেই পারে।

শততম টেস্ট ম্যাচে জয়ের পর বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের গ্রুপ ছবি
ভারত টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে ১৯৩২ সালে। ইতিমধ্যে তারা পাঁচ শতাধিক টেস্ট খেলে ফেলেছে। পাকিস্তান টেস্ট স্ট্যাটাস পায় ১৯৩৩ সালে। তারাও চার শতাধিক টেস্ট খেলে ফেলেছে। এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা টেস্ট স্ট্যাটাস পায় ১৯৮২ সালে। তারা ইতিমধ্যে ২৬০টির মতো টেস্ট খেলেছে। আর বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পায় ২০০০ সালে। দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশও খেলে ফেলেছে ১০০টি টেস্ট। বন্ধুপ্রতীম দেশ ও বর্তমান সময়ে সমশক্তির দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত ৩ কিংবা ৫ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ আয়োজন করা যেতে পারে। যার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘অ্যাশেজ’ কিংবা অন্য কোনো নাম। যেমন- ‘বাঘ-সিংহ’ কিংবা লঙ্কা-বাংলা সিরিজও।
বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচকভাবে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড এগিয়ে আসলে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ‘অ্যাশেজ’ সিরিজের মতো একটি সিরিজ অসম্ভব কিছু নয়।