প্রসঙ্গ উৎসুক জনতা, জঙ্গিদের কৌশল, দূর্বল সেফটি প্রটেকশন, আমাদের বোধ হবে কবে?

চৌধুরী আকবর হোসাইন : গণমাধ্যমে সর্ব শেষ খবর হচ্ছে, দুই পুলিশসহ নিহত ছয়, আহত ৫০। খবরের প্রথম শব্দ হচ্ছে দুই পুলিশ, বাকিরা পুলিশ নয়, সাধারণ জনতা।অবশ্য আহত ৫০ জনের মধ্যে সাধারণ জনতার পাশাপাশি পুলিশও আছে।
আমার প্রশ্ন এখানেই, পুলিশ ছাড়া সাধারণ জনতার হতাহতের সংখ্যা কেন বেশি ? এখানে প্রথমেই জানিয়ে রাখি, সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমায় আতিয়া মহলের নিচ তলায় জঙ্গি আস্তান ছাড়া পুরো ভবনের বাকি ২৮টি ফ্ল্যাটের নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ ৭৮ জন বাসিন্দাকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এতে, সাধারণ ভাবে পরিস্কার জঙ্গিরা ভবনের বাসিন্দাদের জিম্মি করেনি, হত্যা করেনি। বাসিন্দারা জঙ্গিদের টার্গেট নয়।
প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে,সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমায় জঙ্গি আস্তানার কাছেই শনিবার জঙ্গি হামলা হয়েছে। এতে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। রাত দুইটায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সাংবাদিক, পুলিশ, র‍্যাব সদস্যসহ ৫০ জন আহত হয়েছেন।
শনিবার সন্ধ্যার দিকে আতিয়া মহলের প্রায় দেড়শ গজ দূরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেনাবাহিনী। এই সম্মেলন শেষ হতে না-হতেই আতিয়া মহল থেকে প্রায় আড়াই শ গজ দূরে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এর ৪০-৪৫ মিনিট পর আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দ্বিতীয় বিস্ফোরণস্থলটি ছিল প্রথম বিস্ফোরণস্থল থেকে শ খানেক গজ দূরে। এই দুটি বিস্ফোরণই ঘটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে।
খেয়াল করে শেষের অংশ আবার পড়লে পাবেন, ”দুটি বিস্ফোরণই ঘটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে।”
তাহলে ব্যাপারটা সাধারণ ভাবে পরিস্কার, জঙ্গিদের টার্গেট ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শুরুতে আমার প্রশ্ন ছিল, তাহলে পুলিশ ছাড়া সাধারণ জনতার হতাহতের সংখ্যা কেন বেশি ?
এই প্রশ্ন করার মানে এই নয় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বেশি হতাহত হোক তা চাইছি। প্রশ্ন এজন্য করছি, “দুটি বিস্ফোরণই ঘটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে।” নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে এত সাধারণ জনতা আসল কিভাবে ?
খবরে বলা হয়েছে, “তবে সেখানে মাঝেমধ্যেই কিছু উৎসুক লোকজন নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে ঢুকে পড়ছিল। তাদের ঠেকাতে দিনভরই বেগ পেতে হয়েছে পুলিশকে।”
প্রায় সময় দেখেছি, রাস্তায় ম্যানহোল থেকে মলমূত্র পরিস্কার করা হচ্ছে, তাও উৎসুক জনতা নাক চেপে দেখছেন। এই উৎসুক জনতার ভিড়ে আগুনলাগা ভবনের কাছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যেতে সমস্যা হয়। এই উৎসুক জনতার ভিড়ে এম্বুলেন্স যেতে সমস্যা হয়।
এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় আছে। তারা উৎসুক লোকজনকে ঠেকাতে বেগ পেয়েছেন,সফল হননি। তবে এক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষদের সহায়তা বেশি প্রয়োজন। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভূমিকা প্রয়োজন। সিলেটে নিহত ৬ জনের মধ্যে একজন হচ্ছেন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রলীগের উপ পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফাহিম।
আমি জানি না ফাহিম কেন সেখানে ছিলেন। তবে সংবাদকর্মী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় অভিযানের সময়, পরে দেখেছি, স্থানীয় সংসদ সদস্য সহ স্থানীয় নেতা, পাতি নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে জোর করে ঢুকে পড়েন। র‍্যাংক ব্যাজহীন কনেস্টেবল পুলিশের কি সাধ্য তাদের ঠেকানোর ?
কতটা উৎসুক দেখুন,শনিবার (২৫ মার্চ) দুপুর ২টার দিকে জঙ্গিদের ফ্ল্যাট লক্ষ্য করে শুরু হয়,সেসময় অভিযান দেখতে গিয়ে স্থানীয় এক অধিবাসী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির নাম শিবুল মালাকার। আতিয়া মহলের পাশের এক মন্দির থেকে গোলাগুলির ঘটনা উঁকি দিয়ে দেখতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
টেলিভিশনে অনেক দেশের অভিযানের খবর যখন দেখানো হয়, পরিস্কার দেখা যায় একটা নিদৃষ্ট এলাকা ঘেরা। পুলিশ, এম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, সাংবাদিক সহ প্রয়োজনীয় লোকজনের বাইরে কোন ভীড় নেই। এক্ষেত্রে অবশ্য তাদের দেশের জনতা কতটা উৎসুক সেটাও দেখার বিষয়। আমরা উৎসুক হয়ে খবর রাখবো ঠিক আছে, তবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নয়। আমাদের বোধ হবে কবে ?
জঙ্গিদের কৌশল বদলেছে এটা পরিস্কার। সিলেটের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরুর দিকে আতিয়া মহল থেকে জঙ্গিরা বারবার বলেছিল, সোয়াত পাঠান আমাদের সময় কম।
অতীতে জঙ্গিরা দেখেছে, কোন স্থানে অভিযান হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার ঘটনাস্থলে কাছে যান। এক সঙ্গে একই স্থানে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকেন।
ফলে, প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা যায় জঙ্গিদের টার্গেট ছিল ঘটনাস্থলের কাছে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দূর্বল সেফটি প্রটেকশন আছে বলে মনে হচ্ছে। এটা পরিস্কার সমসাময়িক ঘটনা থেকে, তারা শক্তিশালি বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। ফলে শুধু মাত্র বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট একমাত্র প্রটেকশন হতে পারে না। শক্তিশালী বোমার স্প্লিন্টার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানতে পারে। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে সেফটি প্রটেকশন নিয়ে ভাবা জরুরি।
আজ ৪৭তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে প্রিয় দেশকে মুক্ত করতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা। সেই একই ভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শুরু করতে হবে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। বিশ্বের বুকে শান্তিময়, স্বাধীন দেশে হিসেবে পরিচিতি পাবে সার্বভৌম বাংলাদেশ, প্রিয় বাংলাদেশ।
জয় বাংলা। জয় বাংলাদেশ।
( পুরোটাই একান্ত আমার নিজস্ব মত, যে কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কোন ক্ষেত্রে ভুল থাকলে জানাতে পারেন। )
লেখক : সংবাদকর্মী