একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০ আসনে সমঝোতা চায় জাপা

মুক্তমন রিপোর্ট, ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন নিয়ে দরকষাকষিতে রয়েছে শরিক দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। আগামী নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করুক বা না করুক ৭০ আসনেই স্থির থাকতে চায় জাপা। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেছে, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে আওয়ামী লীগ থেকে জাপা নিজেদের জন্য ৭০টি আসন চাইবে। এবং এই ৭০ আসনেই প্রার্থী দেবে। আর বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে আওয়ামী লীগ থেকে ৭০ আসনে জয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে বাকি ২৩০ আসনে ডামি প্রার্থী দেবে। এবং চলতি দশম সংসদের মতো অন্তর্গত সমঝোতা রেখে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বারবার ঘোষণা দিয়ে আসছেন এককভাবে নির্বাচন করবে তার দল। তবে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে জাতীয় পার্টির মহাজোটগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন দলটির নেতারা। কারণ, মহাজোট থেকে বেরিয়ে গেলে জাতীয় পার্টি খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না বলে মনে করেন তারা। সে কারণে মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগের কাছে ৭০-এর বেশি আসন দাবি করবে। কিন্তু ৭০ আসনের নিচে নামবে না, তা যে পদ্ধতিতেই নির্বাচন হোক। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী হিসেবে জাতীয় পার্টির তিনজন নেতা আছেন। এদের মধ্যে প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পূর্ণ মন্ত্রী। অন্য দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য, মুজিবুল হক চুন্নু এবং মশিউর রহমান রাঙা আছেন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়। এরশাদ নিজেও পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। গত ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে জাতীয় পার্টিতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এরশাদ প্রথমে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে থাকলেও শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তখন রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে থাকে। যারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তাদের অবস্থান একরকম আবার যারা নির্বাচনে অংশ নেননি তাদের অবস্থান ভিন্ন। সেজন্যই এটা বলা অসমীচীন হবে যে, জাতীয় পার্টির ভেতরে এখন যে অস্থিরতা চলছে তা প্রধানত ক্ষমতার ভাগ পাওয়া না-পাওয়ার দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
এরশাদ নিজেও যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন সেজন্য তাকেও সরকারের অংশ বলেই ধারণা করা হয়। আবার জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের প্রধান এবং বিরোধীদলের নেতা হয়েছেন রওশন এরশাদ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলের বড় অংশ যেহেতু এরশাদের কথা মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই তারা চায় না বর্তমান সংসদ ও সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করুক। এরশাদ নিজেও এখন সরকার থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে। কারণ দেরিতে হলেও এরশাদ সম্ভবত এটা উপলব্ধি করেছেন যে, সরকারে থেকে বাস্তবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা যায় না। তারা সরকারের সমালোচনা করবে, আবার মন্ত্রী থাকবে– এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। কিন্তু যারা এমপি এবং মন্ত্রী হয়েছেন তারা আবার বর্তমান সংসদ ও সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করারই পক্ষে। জাতীয় পার্টিতে সরকার থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে যে অংশ তার স্বাভাবিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন জিএম কাদের। তিনি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেননি। সংসদে না থাকার কারণেই বর্তমান সংসদের প্রতি তার আস্থা বা আগ্রহ কোনোটাই নেই। সেজন্যই তিনি দলের মধ্যে সরকারবিরোধী বলে পরিচিতি অর্জন করেছেন। কিন্তু আগের মেয়াদে ৫ বছরই তিনি শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। তখন তাকেই জাতীয় পার্টিতে আওয়ামী লীগঘেঁষা বলে মনে করা হতো। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তার অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। তবে পট যেভাবেই পরিবর্তন হোক না কেন শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অংশ হয়েই জাতীয় পার্টিকে থাকতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগও জাতীয় পার্টিকে ছাড়বে না। তাদের ভয়– জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়ে তারা যদি বিএনপির সাথে জোট করে তা হলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। আর বিএনপি অংশ নিলে নির্বাচনি অঙ্ক মিলানো যাবে না। তাই নিজেদের অঙ্ক আর অবস্থান স্থির রাখতেই আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে হাতছাড়া করবে না বলেই সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আগামীতে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসবে। আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসতে প্রস্তুত। গত ২৫ বছরে দুটি দলই বারবার ক্ষমতায় এলেও জনগণকে কোনো কিছুই দিতে পারেনি। অন্যায় অবিচার করেছে। শুধু বড়ো বড়ো বক্তৃতা দেয়, তাই সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে সরকার বাধ্য থাকবে মন্তব্য করে এরশাদ আরও বলেন, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় সংসদের পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ বলেছেন, আমরা আর কারও ক্ষমতায় সিঁড়ি হবো না। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমরা ক্ষমতায় যাব এবং জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করব।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এককভাবে অংশ নেবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। ভোটের মাঠে জাতীয় পার্টি এখন একটা বড় ফ্যাক্টর। সারা দেশে জাতীয় পার্টির প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে।