আপোষের জঙ্গলে নিরাপোষ থাকা

মাসকাওয়াথ আহসান : প্রজাতন্ত্রের সেবক নিযুক্তির কোটা সংস্কার আন্দোলনে যে তরুণ- তরুণীরা বেদনার দিন-রাত্রি পার করেছে; তাদের যৌক্তিক দাবী শীঘ্রই পূরণ হতে যাচ্ছে নিশ্চিত। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত যুক্তিরই জয় হয়।

এই আন্দোলনের সময়ে যে রক্তপাত ও তিক্ত অভিজ্ঞতা; যে উপেক্ষা, যে অশ্লীল কথা-বার্তা তরুণ-তরুণীদের শুনতে হয়েছে; তা অত্যন্ত দুঃখজনক। খুব অল্প বয়েসে নিজের সমাজ-রাষ্ট্রে চলমান খুব নিম্ন রুচির সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হলো আন্দোলনকারীদের।

অবশ্য জীবন ফুলের বিছানা নয়; শান্ত জলে রাজহংসের সাঁতার নয়। তাই অত্যন্ত গ্রাম্য (গ্রামের কিছু অশালীন আচরণ অর্থে) মননের মেট্রোপলিটানে বসবাস আমাদের। এখানে দুর্নীতি বিপ্লবের ফলে কিছু লোকের নতুন টাকা পয়সা হয়েছে; রাজনৈতিক দলের ছত্র ছায়ায় খুনে ষাঁড় জন্মেছে; সেইসঙ্গে দায়িত্বপূর্ণ পদে মেরুদণ্ড ও বিবেকহীন কিছু আত্মকেন্দ্রিক লোক জায়গা নিয়েছে। এই অরক্ষিত অবস্থায় এই তরুণ তরুণীদের দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে।

এই বাধাসংকুল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মনের সৌন্দর্য্য ধরে রাখা খুব জরুরী। কারণ মনের সৌন্দর্য্য কেড়ে নিয়ে কদর্য মনের উপমানবের দলে নিয়ে যেতে সক্রিয় “তেলের বিনিময়ে খাদ্য”, “অনুভূতির বিনিময়ে খাসজমি”-র লোকেরা। এই আপোষের জঙ্গলে নিরাপোষ থাকাটাই জীবনের একমাত্র গন্তব্য।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অন্যান্য কোটার সঙ্গে “মুক্তিযোদ্ধা কোটা” থাকায় অনাকাংক্ষিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টিতে সামান্য মালিন্য এসেছে। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সুরুচির অভাবজনিত ভ্রান্তি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে খতিয়ান; তাতে এতো অল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে গত নয় বছরে সম্মানজনক জীবন বৃত্তে পৌঁছে দেয়া যে গেলো না; এর কারণ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের অভাব।

একজন অসহায় মা চারটি শিশুর সামনে একটি পাউরুটি ছুঁড়ে দিলে তা উপায়হীনতা। আর একজন ধনাঢ্য মা চারটি শিশুকে উটের জকি বানিয়ে উটের দৌড় দেখলে তা নিষ্ঠুরতা।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের তরুণ-তরুণীদের বিপরীতে লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীকে দাঁড় করিয়ে দেয়াটা রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার ঠেলেগুঁজে-জোড়াতালি দিয়ে সমস্যা সমাধানের যে “অচল চিন্তা” তারই ফলাফল।

তরুণ-তরুণীদের মনে রাখতে হবে “মুক্তিযুদ্ধ” “তেলের বিনিময়ে খাদ্য” সমাজের লোকেদের পকেটের কোন বিষয় নয়। এ হচ্ছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে ছড়িয়ে থাকা গর্বের চিহ্ন। তাই তেবিখার লোকেদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের গর্ব থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে ওদের ঐ “মনের সৌন্দর্য্য কেড়ে নিয়ে” নিজেদের মতো উপমানব বানানোর ফাঁদে পা দেয়া।

এ আন্দোলনের সময় তরুণ-তরুণীরা লক্ষ্য করেছে “তেলের বিনিময়ে খাদ্য”, “অনুভূতির বিনিময়ে খাসজমি”-র লোকেরা দুদিক থেকে হাত-পা ধরে টানাটানি করে। যে কোন আন্দোলনকে নিজেদের কোটে নিয়ে যাবার হাডুডু খেলাটা এদের মজ্জাগত। এই হাডুডু খেলার সময় “তেলের বিনিময়ে খাদ্যে”-র লোকেরা “রাজাকার” বলে ট্যাগিং দেয়। “অনুভূতির বিনিময়ে খাসজমি”-র লোকেরা “নাস্তিক” বলে ট্যাগিং দেয়। এটাই এদের পেশা; এইভাবে অন্যের সম্পদ কেড়েছিঁড়ে খাবার উইচহান্টিং এদের জেনেটিক কালচার।

জীবনে চলার পথে এই দুটি উপমানবগোষ্ঠীর মুখোমুখি বারবারই হতে হবে। এরা নিজেরা যেহেতু তেবিখার বা অবিখার মাধ্যমের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান ইত্যাদি সংস্থান করে; তাদের দৃঢ় বিশ্বাস মানুষ এরকই হয়। তাকে কোন না কোন গ্যাং-এ নাম লিখিয়ে চর্বি জমাতে হয়।

কিন্তু জীবন কী এতো ছোট হতে পারে! জীবন এক অপার সম্ভাবনার লাল-সবুজ জমিন। এখানে প্রতিটি ভোর আসে সত্য-সুন্দর – মঙ্গল
আর সাম্যভাবনার আলো নিয়ে।