অপরাধীর কোন রং নেই !

প্রকাশিত

মানিক মুনতাসির : আমার এই লেখা পড়ার পর হয়তো অনেকেই আমাকে গালিগালাজ করবেন । কিন্তু আমি যা বলছি শুধু কয়েকটি ঘটনামাত্র । ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো মানুষটি ছিলেন হযরত বিলাল (রা:) । যার আযানের সুর ছিল সবচেয়ে সুমধুর। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন কৃতদাস এবং কৃষাঙ্গ। আর তাঁর মা ছিলেন শাহজাদী! তিনি কেন কৃতদাস ছিলেন তা জানতে হলে পাঠককে আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। এই বিলাল (রা), ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন। তিনি ছিলেন একজন ইসলামের জন্য আমৃত্যু লড়াই করে যাওয়া সাহসী যোদ্ধা।

হযরত বিলাল (রা) জন্ম নেন সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে। জাতিতে তিনি একজন আফ্রো-আরব। পিতার নাম রাবাহ আর মায়ের নাম হামামা। তাঁর পিতা একজন ক্রীতদাস হলেও মা হামামা ছিলেন শাহজাদী।

শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে। সেই বছরই আবিসিনিয়ার বাদশা আবরাহা তার বিরাট হস্তি বাহিনী নিয়ে পবিত্র মক্কা নগরী আক্রমণ করেন। হস্তি বাহিনীর ভয়ে আরবরা ভয়ে আতঙ্কিত হলেও আল্লাহর ঘর রক্ষা করার ব্যবস্থা করলেন আল্লাহ নিজেই। হস্তিবাহিনীসহ আবরাহা পরাস্ত হল। এই ঘটনার কথা মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন শরীফে সূরা ফিলে উল্লেখ করা আছে। আরবি ‘ফিল’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘হাতি’।

এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আবরাহার বাহিনী পালিয়ে গেলো। যারা পালাতে পারলো না তারা আরবদের হাতে বন্দী হলো। এই বন্দীদেরই একজন ছিলেন বিলাল (রা) এর মা হামামা। হামামা ছিলেন স্বয়ং বাদশাহ আবরাহার ভাতিজী। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে হলেন দাসী। সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের এক ব্যক্তি খলফের ঘরে তার স্থান হলো বাদী হিসেবে। সেখানেই আবিসিনিয়ার আরেক দাস রাবাহ কাজ করতো। সেখানেই রাবাহ এবং হামামার বিয়ে হয় এবং তাদের ঘরেই জন্ম নেন ইসলামের একনিষ্ঠ কাণ্ডারি হযরত বিলাল (রা)। বিলালের চেহারা ছিল অত্যন্ত কুৎসিত। কৃষাঙ্গ। কিন্তু তিনি ছিলেন খুব সুঠাম দেহের অধিকারী । তিনি যেখানে কৃতদাস ছিলেন সেখানে চরম অন্যায় , অত্যাচার সহ্য করেও নিজ ধর্ম থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হননি।

গত অক্টােবর যখন আমেরিকায় গেলাম। তখন ওয়াশিংটন ডিসির ২১ স্ট্রিট , বাড়ি ৮৩০। নর্থইস্টে, ছিলাম দুই সপ্তাহের বেশি। সেটা ছিল কৃষাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকা। বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর থেকে ট্যাক্সিতে উঠলাম আমরা তিনজন। ট্যাক্সিচালক একজন আমেরকিান নাগরিক। নাম ফিলিপ । ট্যাক্সিতে উঠার সাথে সাথে আমাদের গন্তব্যের লোকেশন শেয়ার করলাম। ফিলিপ তা গুগল ম্যাপে দেখলেন। আর নর্থইস্ট শোনেই ফিলিপ বললেন ওহ নো ইটস ভেরি ডেঞ্জার জোন। ইয়োর নেইবার ইজ ভেরি রাফ। বি কেয়ারফুল টু স্টে অ্যাট নাইট অ

অ্যান্ড ডে। প্রায় ২০ মিনিটের পথ।। এ সময়ের মধ্যে ফিলিপ (সে ছিল শেতাঙ্গ) আরো অন্তত ৫ বার বলল ইয়োর নেইবার ইজ ভেরি রাফ। এবং আমরা যখন পৌঁছলাম তখন পড়ন্ত বিকাল। বাড়ির সামনে চমৎকার বাগান। মন মতানো পরিবেশ। রাস্তার দুই ধারে শুধুই গাড়ি। ভাড়া মিটিয়ে দুই ডলার টিপসও দিলাম। ফিলিপ তখন আবারো বলল বি কেয়ারফুল টু স্টে ডে-অ্যান্ড নাইট। ইয়োর নেইবার ইজ ভেরি রাফ।

সেই রাতে আমরা ঘর থেকেই বেরুই নি। তবে পরদিন রাত ১১ টার পর আমাদের পূর্ব পরিচিত শাহাদাত (আমেরিকা প্রবাসী) গাড়ী নিয়ে এলে আমরা পোটোম্যাট নদীর পাড়ে বেড়াতে যাই। বাইরে ছিল বেশ ঠান্ডা ছিল। সম্ভব ৫ কি ৬ ডিগ্রি। পরদিন সম্ভবত শুক্রবার ছিল। সারারাত রাস্তায় গাড়ির শো শো শব্দ। মাঝে মাঝে হর্ণ। ডি জে নাচের আওয়াজ। ইত্যাদি। পরদিন জানলাম এটা সারা আমেরিকাতেই হয়ে থাকে । যে কয়দিন সেখানে ছিলাম খুব একটা স্বস্তি ছিল না। তৃতীয় দিন সকালে হঠাৎ বাড়ির দরজায় কোন এক কৃষাঙ্গ নক করলো। লুকিং গ্লাস দিয়ে দেখেই চমকে গেলাম। আমরা ভয়ে দরজা খুলছিলাম না। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল । আগন্তুক বার বার দরজা খোলার জন্য বলছিলেন । রীতিমত দরজায় ধাক্কা মারছিল । বিরক্ত হয়ে। তার চেহারায় বেশ রাগান্বিত ভাব ছিল। দরজা খোলার পর তিনি পরিচয় দিলেন তিনি অ্যান্থনী । এই বাড়ির মালিকের স্বামী। পরে অ্যান্থনীর সাথে আমাদের বেশ ভাব হয়। এখানে বলে রাখা ভাল আমরা বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলাম অনলাইনে। ভাড়াও পরিশোধ করা হয়েছিল অনলাইনে্। সেটি ছিল একটি স্যুট। ফলে বাড়ির মালিকের সঙ্গে সরাসরি দেখা কিংবা কথা বলার কোন সুযোোগ ছিল না। যাক গে সে অনেক কথা । সেখানে প্রায় প্রতি রাতেই আমরা ভয় পেতাম বাইরের বিভিন্ন রকম শব্দ শুনে ।

এবার আসুন কয়েকজন সফল কৃষাঙ্গের কথা বলি। বারাক ওবামা । বলা হয় এখন পর্যন্ত আমেরিকার সবচেয়ে সহনশীল প্রেসিডেন্ট। নেলসন ম্যান্ডেলা সারাজীবন লড়েছেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে । আর অপরা উইনফ্রে একজন সফল ও জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যাক্তিত্ব। মার্টিন লুথার কিং একজন আফ্রিকান -আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী।

আবার ভারতের এক ধর্মীয় গুরু রাম রহিম ধর্ষণ আর অপকর্মের অপরাধে জেল খাটছেন। তিনি কিন্তু কালো নন। বরং নুরানী চেহারার অধিকারী। তবে পুুলিশের তথ্যমতে, ঢাকায় যারা জাল টাকার ব্যবসা করেন । কিংবা মাদক কারবারী তাদের বেশিরভাগই কৃষাঙ্গ প্রবাসী। এরা ভয়ংকর অপরাধ প্রবণ।

এবার আসুন সবশেষ নৃ:শ্বংস খুনের শিকার স্বাপ্নবাজ তরুণ উদ্যোক্তা তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ফাহিম সালেহ’র খুনীর কথা বলি। তিনিও একজন কৃষাঙ্গ। মাত্র ২১ বছর বয়সী ঐ খুনী। টাইরেস ডেভোন হ্যাসপিল একজন আমেরিকান নাগরিক । তিনি ফাহিমের সহকারীও ছিলেন। ফাহিমের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ ডলার চুরি করেছিল এই টাইরেস। বিষয়টি জেনেছিলেন ফাহিম। সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার একটি সমঝোতা করে টাইরেস ফাহিমের ফার্ম ছেড়েছিল। তবে পরবর্তীতে টাইরেস চুরি করা অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার পালন করেনি। তদন্ত কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, ফাহিমকে অনুসরণ করে নিনজা স্টাইলে কালো পোশাকে যে ব্যক্তি ওই ভবনের এলিভেটর দিয়ে ফাহিমের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে পর্যন্ত গিয়েই আঘাত করেছে বলে সিসিটিভিতে দেখা গেছে, সেই ব্যক্তি অর্থাৎ ঘাতকটি হচ্ছে টাইরেস। আর্থিক ফায়দা হাসিলের জন্যই ফাহিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন। তবে এমন নৃশংসতার নেপথ্যে কারও মদদ রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু আমার মনে হয় না শুধু লাখ ডলারের জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এখানে নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক কোন চক্রান্ত রয়েছে। বাংলাদেশী বংশ উদ্ভুত কোন তরুণের এমন জাগরণ হয়তো মানতে পারছিলেন না দুস্কৃতীকারীরা। হয়তো এই ফাহিমই একদিন বিশ্বের সেরা ধনী হতো। হয়তো জিতে যেত নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কারও। এজন্য উত্থানে আগেই তাকে থামিয়ে দেয়া হলো। একইভাবে একটা মেসেজ দেয়া হলো যে বিশ্বের প্রতিটি সেক্টরই শাসন করবে ইউরোপ-আমেরিকান কিংবা নষ্ট আরবীয়রা।

এবার আসুন আমাদের দেশের সাবরিনা, সাহেদ, আরিফ চৌধুরী, পাপিয়াদের কথা বলি । এদের কেউই কিন্তু কৃষাঙ্গ নয়। এমন কি ঘৃন্য অপরাধী মা-বাবার হত্যাকারী কিশোরী ঐশীও কৃষাঙ্গ ছিলেন না। ফলে অপরাধীর কোন রং নেই । তার কোন জাত নেই। তার কোন ধর্মও নেই। নেই কোন পরিচয়। তার একটাই পরিচয়। সে অপরাধী। ফলে বিচার হতে হয় অপরাধের ধরণ দেখেই । শাস্তিও হয় অপরাধের মাত্রাভেদে । তাও ভাল যে, ফাহিমের খুনীকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা হয়নি। যেমনটি বলা হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের মসজিদের হামলাকারীর (বন্দুকধারী) কথা। আহা! কি বাঁচাটাই না বেঁচেছেন আমাদের তামিম মুশফিকরা । আশা করি হ্যাসপিল, সাহেদ, সাবরিনা, আরিফ আর ক্যাসিনো সম্রাটদের বলায় তাই হবে । একইভাবে অনুসৃত হবে ব্যাংক লুটেরা, পাচারকারী, সরকারি সম্পদের লুটেরা, করের টাকার অপব্যবহারকারী যদি কোন সচিবও হন।

লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শেয়ার করুন