আত্মঘাতী বাঙালি ও নব্য গোয়েবলস

প্রকাশিত

গোলাম মোর্তোজা

‘গোয়েবলসীয়’ প্রচারণার জন্যে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের নিয়ে আলোচনার কিছু নেই। কাজের অংশ হিসেবেই তারা ‘প্রোপাগান্ডা’ করছেন। উচিত-অনুচিত প্রশ্ন তোলাই অবান্তর। এ বিষয়ক ভাবনার সময় তাদের নেই। সর্বশেষ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দিয়ে গোয়েবলসরা বিএনপির পক্ষে বিক্ষোভ মিছিল করিয়েছেন! নব্য গোয়েবলসদের যোগ্যতাও বটে!

নিউ ইয়র্কের হিলটন হোটেলের বলরুমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ। একই সময় কোয়ালিশন অফ বাংলাদেশি অমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে হোটেলের সামনের রাস্তায় বিক্ষোভ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরা। বিক্ষোভ চলকালে ড. ইউনূস হিলটন হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার পর বিক্ষোভরত বিএনপির নেতাকর্মীরা তার সমর্থনে স্লোগান দিতে থাকেন। অনেকে তার সঙ্গে কথা বলেন, ছবি তোলেন।

এই ঘটনাটি ছড়ানো হয় এভাবে যে, ড. ইউনূস বিএনপির বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, সমর্থন দিয়েছেন। যা সীমা-পরিসীমাহীন মিথ্যা। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে যারা এই প্রচারণা চালিয়েছেন তাদেরটা তো বুঝলাম!
কিন্তু বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে যখন এই অসত্য, চরিত্রহননমূলক সংবাদের পেছনে ছুটতে দেখলাম, তখন বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকল না। অন্তত একজনকে দেখেছি তাৎক্ষণিকভাবে ভুল বুঝতে পেরে তা সরিয়ে নিয়ে নিজের ইমেজের প্রতি সুবিচার করেছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে দেখেছি প্রচারণা চালিয়ে যেতে। এটা কি তারা বিশ্বাস থেকে করেন, না বিবেচনাহীনতার কারণে করেন?

২.
গোয়েবলসীয় প্রচারণা সামনে এনে প্রতিনিয়ত আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে হত্যা করা হচ্ছে। এখনকার আলোচনা জঙ্গি ইস্যু, ইতালিয়ান নাগরিক হত্যা প্রসঙ্গ। বিষয়টি দেশের ইমেজের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আলোচনার চাপে প্রায় হারিয়ে গেল তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁসের সংবাদটি। ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়েছিলাম। কার সন্তান কত টাকা দিয়ে মেডিক্যালের প্রশ্ন ক্রয় করে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, ভালো ছাত্র হওয়ার পরও আগে প্রশ্ন না পাওয়ায় কার সন্তান ভর্তি হতে পারলেন না, সেই আলোচনা সর্বত্র। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সুযোগ নিয়ে যারা ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন আশেপাশে তাদের দেখছি। দু’জনের টেলিকথনে প্রশ্ন ফাঁসের বিস্তারিত অনলাইনে ছড়িয়ে রয়েছে। টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে স্বীকার করেছেন ফাঁস হওয়া প্রশ্ন তারা পেয়েছিলেন। তাতে কী? সরকার বাহাদুরের ক্ষমতা কি এত কম যে, সাধারণ মানুষ যা দেখে তাদেরকেও তা দেখতে হবে? এতে ইজ্জত থাকে সরকারের কর্তাদের!

তাছাড়া মেডিক্যালে কারা ভর্তি হলো তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের সন্তানরা দেশের মেডিক্যাল কলেজে পড়েন না। নিজেরা দেশে চিকিৎসা নেন না। চোখ-কান-হাঁটু ব্যথার জন্যে তারা আমেরিকা, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড চলে যান। যারা এসব জায়গায় যেতে পারেন না, তারা ভারতে যান। সুতরাং মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁস হলে তাদের কী?

গরু আর গাধার পার্থক্য নির্ণয়ের সময় নেই তাদের। বোকা অসহায় অভিভাবক, যাদের অধিকাংশের ক্ষমতা নেই সন্তানকে অর্থ খরচ করে বিদেশে পাঠানোর, তারা সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করছেন। পুরুষ পুলিশ ছাত্রী, নারী অভিভাবকদের নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে। দেশের বড় গণমাধ্যমগুলোতে সেসব সংবাদ গুরুত্ব পাচ্ছে না। ভাবটা এমন যেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে এটা নিয়ে আন্দোলন করার দরকার কী! শুধু শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির সরকারকে বিব্রত করা! দেখেন না সরকার বিব্রত হতে পারেন, এই শঙ্কায় লেখক-শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবীরা কেমন ‘মহান মৌনতা’ পালন করছেন!!

৩.
বিএনপির ভাষ্য দেশে কোনও জঙ্গি নেই। এই ভাষ্য নতুন নয়। বাংলাভাইকে তারা তৈরি করে বলেছিল ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’।
আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদের ভাষ্য (তিন চার দিন আগে পর্যন্ত) দেশে জঙ্গি আছে। লন্ডন থেকে অর্থ সহায়তা পাচ্ছে এসব জঙ্গিরা। জামায়াতে ইসলামী জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার সহযোগী সন্ত্রাসী সংগঠন। এসব বক্তব্য ছাড়াও জঙ্গি আছে এমন অনেক বক্তব্য তারা দিয়েছেন।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আসা না আসাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বক্তব্য এক হয়ে গেছে ‘দেশে জঙ্গি নেই’।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন বাংলাদেশে ‘আইএস’-এর কোনও কর্মকাণ্ড নেই। যদিও তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বছরের ১৯ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল দেশে আইএস জঙ্গি আছে।

“সাখাওয়াতুল কবির, আনোয়ার হোসেন ওরফে বাতেন, রবিউল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম নামক চারজন আইএস জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। এর মধ্যে সাখাওয়াতুল কবির মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক সমন্বয়ক।”

২০ জানুয়ারি দেশের সকল পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল, চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামীকে আল কায়েদার সহযোগী সংগঠন হিসেবে পরিচিতি দিয়ে কি বলা যায় দেশে আল কায়েদা নেই?

এ বছরের ২ জুলাই র‌্যাব গ্রেফতার করে ১২ জন জঙ্গি, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ-বিস্ফোরক এবং ‘জেহাদি বই’। গণমাধ্যমের সামনে তাদের উপস্থাপন করা হয় আল কায়েদা জঙ্গি হিসেবে। গ্রেফতারকৃত ১২ জনের মধ্যে ছিলেন, আল কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার বাংলাদেশ সমন্বয়ক মুফতি আইনুল ইসলাম এবং উপদেষ্টা মাওলানা জাফর আমিন। ২০ জানুয়ারির সকল পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়, চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়। জঙ্গি বিষয়ক অসংখ্য সংবাদ থেকে দুটি উল্লেখ করলাম মাত্র।

৪.
ডিবি, র‌্যাব এদের আইএস, আল কায়েদা হিসেবে উপস্থাপন করল। গণমাধ্যমে আমরা তা প্রচার করলাম। দেশ-বিদেশের মানুষ তা জানল। এতবড় জঙ্গিদের পরে কী হলো, তা আর জানলাম না, জানতে চাইলাম না। এও জানতে চাইলাম না যে, কীসের ভিত্তিতে এদের আইএস বা আল কায়েদা বলা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন বলছেন, দেশে আইএস নেই- তখনও জানতে চাইছি না, আগে আইএস, আল কায়েদা হিসেবে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের বিষয়ে এখন বক্তব্য কী? তদন্তে কী পাওয়া গেছে তাদের থেকে? আবিষ্কার কি করা গেছে গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে আইএস, আল কায়েদার কতটা সম্পৃক্ততা ছিল? যদি সম্পৃক্ততা না পাওয়া গিয়ে থাকে, তবে কেন সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হলো না সেই তথ্য?

গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে কোনও কিছু অনুসন্ধান না করে, র‌্যাব-পুলিশ যাদেরকে যে পরিচয়ে উপস্থাপন করছে, আমরাও তা হুবহু প্রচার করছি কেন? কেন আইএস, আল কায়েদা হিসেবে উপস্থাপনকারী জঙ্গিদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়ার দাবি করছি না?

পুলিশ হয়ত কথা বলতে দিচ্ছে না, কিন্তু ফলোআপ বা নিজস্ব অনুসন্ধান না করে প্রচার করছি কেন?

বনশ্রীর নিরপরাধ শিশু উপকারী কিছু মানুষকে পুলিশ বলে দিল শিশু পাচারকারী, আমরাও তা হুবহু দেখালাম? আমাদের কোনও দায়-দায়িত্ব নেই? পুলিশকে কি আমরা এতটা বিশ্বাস করি?

জানি না, আমরাও বুঝে বা না বুঝে কোনো না কোনোভাবে ‘গোয়েবলসীয়’ প্রচারণার অংশীদার হয়ে যাচ্ছি কিনা?

৫.
‘জঙ্গি নেই, জঙ্গি নেই’ বলতে শুরু করলে এর পরিণতি কী হবে? দেশে আইএস বা আল কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের জঙ্গি নেই, ঠিক আছে।

কিন্তু ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসী মানসিকতার জঙ্গি তো অবশ্যই আছে। তারা যেন আবার ছাড় পেয়ে না যায়! তথ্য যেন গোপন করা শুরু না করি।

ছোটকে বড় হিসেবে দেখানো বা প্রকৃত ঘটনা আড়াল করা, কোনোটাই যুক্তিযুক্ত নয়। বাস্তবতার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। যার অনুপস্থিতি আমাদের সব অঙ্গনে।

হত্যাকাণ্ড আমেরিকাতেও ঘটে। সেখানে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয় না, সঠিক কথা। কিন্তু আমেরিকার আইনের শাসনের সঙ্গে কি আমাদের তুলনা করা যায়?  হত্যা মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাপ্ত আসামির সাজা মওকুফ করে দেয় পৃথিবীর কোনও সভ্য দেশের সরকার?

৬.
আমাদের সবারই সবকিছু নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। পথে অন্যের জন্যে কাঁটা বিছিয়ে নিজেই সেই কাঁটায় বিদ্ধ হচ্ছি। ‘আত্মঘাতি বাঙালি’ কবে বুঝব তা?

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

শেয়ার করুন