উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে গেল সব রাস্তাঘাট!

প্রকাশিত

গোলাম মাওলা রনিঃ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের উল্লাস যেন আর ধরছে না। তারা তাদের লক্ষ-কোটি মুখে আরো কয়েক কোটি মাইক লাগিয়ে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগে উন্নয়ন। তারপর গণতন্ত্র। তারা তাদের নেত্রীকে ঈশ্বর প্রদত্ত বিশেষ নেয়ামত বলে মনে করেন। তাদের হৃদয়ে এ কথা চমৎকারভাবে গেঁথে গেছে এবং তাদের মন-মস্তিষ্কও সে কথা বিশ্বাসযোগ্য রূপে গ্রহণ করেছে যে, শেখ হাসিনা এই শতাব্দীর সেরা রাষ্ট্রনায়ক। সরকারি দলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রী, মেয়র, এমপি এবং অঙ্গসংগঠনগুলো দেশের শীর্ষ পত্র-পত্রিকার প্রথম অথবা শেষ পাতাজুড়ে যে বিজ্ঞাপন দেয়, তাতে উল্লেখ করা হয় যে, শেখ হাসিনাই পৃথিবীর মধ্যে সেরা রাষ্ট্রনায়ক। তিনি বাংলাদেশের জনগণের ক্ষমতায়নে এমন সব কর্ম করেছেন যে, পৃথিবীতে তার নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসব কর্ম যদি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নেতা-নেত্রীরা করতেন তবে সারা পৃথিবীতে শান্তি চলে আসত। আওয়ামী যুবলীগের একটি বিজ্ঞাপনের ভাষা এরূপ- ‘বিশ্বশান্তির দর্শনে জনগণের ক্ষমতায়নে, ধরিত্রী সেরা তুমি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তোমার কীর্তি আমাদের গর্ব।’
বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগের শাসনামলে কী কী বিষয়ে ক্ষমতা লাভ করেছে তা বিশ্ববাসী না জানলেও দেশবাসী খুব ভালো করেই জানেন। কাজেই সম্মানিত পাঠকদের এসব ব্যাপারে নতুন করে আমার জ্ঞান দেয়ার দরকার আছে বলে মনে করি না। তার চেয়ে বরং শিরোনাম প্রসঙ্গে চলে যাই। সারা দেশে এখন উন্নয়নের জোয়ার চলছে। জোয়ারের তোড়ে বড় বড় রুই, কাতলা, বোয়াল, গজার, পাঙ্গাশ ও ভেটকি মাছ তো বটেই, সাগরের নীলতিমির মতো রাক্ষুসে মাছেরা পর্যন্ত পানি ছেড়ে ডাঙ্গায় চলে এসেছে। এদের সংখ্যা এত বেশি এবং এরা এত বেশি জীবন্ত, প্রাণোচ্ছল এবং শক্তিশালী যে অভুক্ত মানুষজন বুঝতে পারছে না- জোয়ারের রাঘব বোয়ালেরা তাদের খেয়ে ফেলবে নাকি তারা ওগুলোর স্বাদ-গন্ধ চেখে দেখার সুযোগ পাবে।
আগেই বলেছি, ক্ষমতাসীনদের সাফ কথা- আগে উন্নয়ন। তারপর গণতন্ত্র। অনেকে আগ বাড়িয়ে বলছেন, বাংলাদেশ হবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের মতো, ওসব দেশে তো একসময় গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও ছিল না। তারা যেভাবে গণতন্ত্রকে বাক্সবন্দী করে উন্নয়নের জোয়ারে দেশবাসীকে ভাসিয়ে দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে মহাজোটের সরকারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে এমন কিছু করে দেখাবে যে, সারা দুনিয়া অবাক বিস্ময়ে নতুন করে ভাবতে বসবে- এইটা হইল ক্যামনে! বিদেশীরা হাজারো আন্তর্জাতিক পুরস্কার বাংলাদেশে নিয়ে আসবে এবং উন্নয়নের রূপকার, সৈনিকদের পদতলে সেসব পুরস্কারের প্রণতি জমা রেখে করজোড়ে প্রার্থনা করে বলবেÑ ওহে ধর্মাবতারবৃন্দ! এ দেশে আসার পূর্বে আমরা কবিগুরুর শেষের কবিতা মুখস্থ করে এসেছি। এই যে পুরস্কার! যা দিলাম তা আপনাদেরই দান। যতই গ্রহণ করবেন ততই আমরা উপকৃত হবো, কৃতজ্ঞ হবো এবং ঋণী হবো।
উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে কিছু মুখপাত্রের মাংসল দেহ এমনভাবে আন্দোলিত হয় যে, জনগণের পিলে চমকে ওঠে। তাদের চর্বিযুক্ত মসৃণ এবং উজ্জ্বল ত্বকে কুইক রেন্টালের বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি এমনভাবে বিকিরিত হয় যেন জমিনে চাঁদ-তারার মেলা বসেছে। তাদের সুর শুনলে বিসমিল্লা খানের সানাইয়ের কথা মনে পড়ে। তাদের মুখনিসৃত শব্দমালা এবং টেবিল চাপড়ানোর শব্দ আল্লা রাখা খানের তবলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বক্তৃতার মঞ্চে তাদের অঙ্গভঙ্গি এবং উল্লম্ফন নৃত্যসম্রাট পণ্ডিত উদয় শঙ্করের চেয়েও উত্তম বলে বিবেচিত হয়। তাদের বক্তৃতামালার শব্দচয়ন, বাক্যের ব্যবহার এবং যতি ও বিরামচিহ্নের প্রয়োগ দেখে রোনাল্ড রিগ্যান, আব্রাহাম লিংকন, বিল ক্লিনটন ও মার্গারেট থ্যাচারের কথা মনে পড়ে।
ক্ষমতাসীনেরা কথায় কথায় মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের কথা বলেন, সিঙ্গাপুরের কথা বলেন বটে কিন্তু উন্নয়নের রূপকার লি কুয়ানের নাম উচ্চারণ করেন না। অন্য দিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের জনক পার্ক চুং হি এবং চীনের মহান নেতা দেও জিয়াং পিংয়ের নাম উচ্চারণ করেন না। মাহাথির বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন। ফলে এ দেশের পোলাপানও নাম জানে। অন্য দিকে, লি কুয়ান, পার্ক চুং হি ও দেংয়ের নাম জানতে একটু বেশি বিদ্যাবুদ্ধির দরকার পড়বে। অন্য দিকে, এসব নেতা কোন প্রেক্ষাপটে কখন এবং কিভাবে উন্নয়ন করেছিলেন তা মূল্যায়ন করার জন্য রীতিমতো পাণ্ডিত্যের দরকার পড়বে। দেশের খাদ্যশস্যের অতিরিক্ত উৎপাদন এবং উন্নয়নের জোয়ারের কারণে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকের যে মড়ক আরম্ভ হয়েছে, তাতে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই দেশে জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক নামক জিনিসের দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যাবে। ফলে ক্ষমতাবানেরা ইচ্ছে করেই দুর্ভিক্ষজাত দ্রব্যসামগ্রী থেকে নিজেদের দূরে রাখছেন এবং বেশি বোকাসোকা জনগণকে ওপথে পা না বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৮০-এর দশকে মাহাথির যে পরিস্থিতি পেয়েছিলেন সেই পরিস্থিতি এখন মালয়েশিয়ায় নেই। ফলে ১৯৮০ সালের কেরামতি ২০১৫ সালে মাহাথির তো দূরের কথা, তার চেয়ে উত্তম নেতার পক্ষেও সম্ভব ছিল না। ১৯৮০ সালে দেশটি ছিল চরম দারিদ্র্যপীড়িত, রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া বহু জাতি, বর্ণ, সম্প্রদায়ের পারস্পরিক বিভেদ এবং বিশাল ভূখণ্ডের মধ্যে অঞ্চলভিত্তিক মানুষের ভিন্ন ভিন্ন আচরণ ও মনমানসিকতা। ফলে একজন সাধারণ মানের সৎ-শিক্ষিত, কর্মঠ ও রুচিবান নেতার পক্ষে এমন জাতিসত্তা এবং ভূখণ্ডে উন্নয়নের জন্য অনেক কিছুই করা সম্ভব। অন্য দিকে লি কুয়ান যখন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০-৪০ হাজার, যা কিনা বাংলাদেশের একটি মাঝারি আকৃতির ইউনিয়ন পরিষদের সমান। সিঙ্গাপুরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাইরে বিরাট একটি অংশ ছিল ভারতীয়, চীনা ও মালয়ি। পশ্চিমা দুনিয়া বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরকে যখন একটি পোতাশ্রয় এবং ট্রানজিট পোর্ট হিসেবে গড়ে তুলতে চাইল, ঠিক তখনই লি কুয়ানের কপাল খুলে গেল।
দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং হি ছিলেন একজন সামরিক জেনারেল। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ১৯৬১ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত মোট ১৮ বছর তিনি সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেন। চর্বিযুক্ত ক্ষমতার টাক মাথাওয়ালা বক্তারা না বুঝেই দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে আসেন। তারা যদি বেশি বেশি কোরিয়ার কথা বলেন, তবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং ১/১১-এর কুশীলবদের সফলতা যে সামনে চলে আসে সে কথা তাদের বলার মতো লোককে তারা ধারে কাছেও ভিড়তে দেয় না।
যা বলছিলাম- উন্নয়নের জোয়ার। সরকার বারবার বলছে, বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গায় উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়েছে। গত সাত বছরে উন্নয়নের বিস্তার এত দ্রুত সব কিছুকে গ্রাস করেছে যে, অতীতের কোনো কিছুই এত দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়েনি। এমনকি আগুন কিংবা ঝড়-বন্যার গতির চেয়েও উন্নয়নের গতি বেশি। উন্নয়নের সর্বব্যাপী বিস্তার যেকোনো মহামারী রোগজীবাণুর চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো সম্মানিত পাঠক যদি রাগ হয়ে বলেন- এই মিয়া, মশকারা করার আর জায়গা পান না। উন্নয়নের গতি আগুনের চেয়ে বেশি হয় কী করে- আর বিস্তার কলেরা, ডেঙ্গু কিংবা গুটিবসন্তের চেয়ে দ্রুত কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পাঠকের এমন প্রশ্নে উন্নয়নের প্রবক্তারা একটুও বিব্রত হবেন না। বরং মুখ ভেংচিয়ে বলবেন- এই মিয়া! না বুইজ্যা কতা কও ক্যান? সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদু্যুৎ দিচ্ছে। এখন বলো, আগুনের গতি বেশি না বিদ্যুতের গতি? আর বিদ্যুতের খাম্বা, তার এবং ডিশ লাইনের তারমার দেইখ্যা কি বুঝো না কিভাবে পথে-প্রান্তরে, মাঠে-ঘাটে, কোনা-কাঞ্চিতে উন্নয়ন বিস্তার লাভ করেছে!
জীবনযুদ্ধে পরাজিত কিন্তু অঙ্গের যুদ্ধে বিজয়ী কোনো সম্মানিত শিক্ষক যদি প্রশ্ন করেন, গত ৭ বছরে দেশের ১৬ কোটি মানুষের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ কোটি টাকা ট্যাক্স আদায় করা হয়েছে। এই টাকার মধ্যে কত অংশ উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হয়েছে এবং কত টাকা অনুন্নয়ন খাতে খরচ হয়েছে। এই ২০ লাখ কোটি টাকার কত অংশ লোপাট হয়েছে এবং কত অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। গত সাত বছরে যেসব উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে একমাত্র দৃশ্যমান হলো বিদ্যুৎ খাত। এই সরকার এ যাবৎ সাকুল্যে ছয় হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযোজন করতে পেরেছে। এখন প্রশ্ন হলো- ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের মধ্যে সরকারি অর্থে কত মেগাওয়াট হয়েছে এবং দেশী-বিদেশী অর্থায়নে কত মেগাওয়াট? কুইক রেন্টালে বছরে কত হাজার কোটি টাকা গচ্চা দেয়া হচ্ছে? জনগণের অর্থ তাও আবার ২-১ টাকা নয়, রীতিমতো প্রতি বছর ১০-১২ হাজার কোটি টাকা কুইক রেন্টালে গচ্চা যাচ্ছে। এই ব্যয় করার অধিকার কে দিলো, উন্নত বিশ্বে এমন ভর্তুকি দিতে হলে গণভোটের আয়োজন করতে হতো।
রাষ্ট্রীয় মদদে চোর, বাটপার, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজেরা জনগণের টাকা মেরে দিয়ে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে রীতিমতো মাইলফলক স্থাপন করেছে। শেয়ার মার্কেটের ডাকাতগুলো সাধু সেজে রাষ্ট্রের কলকাঠি নাড়ছে। ব্যাংক লুটেরারা সৎ ব্যবসায়ীদের ভাগ্যবিধাতা হয়ে বসেছে আর সুবিধাবাদী দুর্নীতিপরায়ণ অযোগ্য সরকারি কর্তারা জাতির নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রক হয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। এ অবস্থায় সারা দেশে উন্নয়নের জোয়ার কিভাবে উপকূলগুলোতে আঘাত হেনেছে তা কেবল ভুক্তভোগীরাই ভালো করে বলতে পারবে। চলুন এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই-
আওয়ামী লীগের মধ্যে আমার পছন্দের মানুষের তালিকায় সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অন্যতম। নব্য এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফও আমার পছন্দের মানুষ। কাদের ভাই আমার নেতা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। অন্য দিকে, মোশাররফ ভাই দূরতম সম্পর্কে টেনেটুনে আত্মীয় হলেও ওই পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করেছে নেত্রীর সাথে তার আত্মীয়তার কারণে। আমরা সবাই তাকে নেত্রীর বেয়াই বলেই সমীহ করি। যদিও সমীহ পাওয়ার মতো আরো অনেক কিছুই তার রয়েছে। এই দু’জন গুণী মানুষ এখন বাংলাদেশের সব রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, ব্রিজ এবং ফেরি পারাপারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। কাদের ভাইয়ের অধীনে রয়েছে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা- অন্যদিকে, মোশারফ ভাই তদারক করেন প্রায় ৭৮ হাজার কিলোমিটার সড়ক। দুয়ে মিলে সড়ক, মহাসড়ক, ভিলেজ রোড এবং নগর-মহানগর ও পৌরসভার সব রাস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় এক লাখ কিলোমিটার।
এলজিআরডির তৈরি করা এক কিলোমিটার রাস্তার খরচ পড়ে গড়ে ২০ লাখ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকা। অন্য দিকে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের খরচ ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। গত ৭ বছরে এই দুই মন্ত্রণালয়ের রাস্তাঘাটে উন্নয়নের জোয়ার কতটুকু লেগেছে তা কাদের ভাইয়ের সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করে চুপ হয়ে যাওয়া থেকেই অনুমান করা যায়। বহু ঘটনার পর সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন যখন ভীষণভাবে বিতর্কিত, বিরক্তিকর এবং অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী অনেকটা বাধ্য হয়েই ভদ্রলোককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিলেন।
নতুন মন্ত্রী হলেন ওবায়দুল কাদের। কাদের ভাই দায়িত্ব নেয়ার পরপরই শুরু করলেন নতুন আঙ্গিকে মন্ত্রণালয় পরিচালনা। তিনি সচিবালয়ে বসে না থেকে প্রায় প্রতিদিনই সারা দেশ চষে বেড়াতে লাগলেন। জনগণ বিষয়টি নতুনভাবে গ্রহণ করল এবং নতুন যোগাযোগমন্ত্রী সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতে থাকল- যদিও প্রধানমন্ত্রী তার এই দৌড়াদৌড়ি একদম পছন্দ করেন না। তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের একাধিকবার বলেছেন- কাদের শুধু হুদাই দৌড়াদৌড়ি করে- কাজ তো সব আবুল হোসেনই করে গেছে। এত কিছু জানার পরও কাদের ভাই দৌড়াদৌড়ি বন্ধ করেননি। তার নিশ্চয়ই কষ্ট হতো কিন্তু আমরা স্বস্তি পেতাম। গত বছর বাংলাদেশের অনেক জেলা ভ্রমণ করে কাদের ভাইয়ের দৌড়াদৌড়ির সুফল দেখেছিলাম। কিন্তু গত ঈদে দেখলাম- সর্বনাশ ঘটে গেছে l
ঢাকা থেকে পাটুরিয়া হয়ে ফরিদপুর। তারপর বরিশাল-পটুয়াখালী হয়ে আমার নির্বাচনী এলাকা। ফিরতি পথে রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা। চলতি পথের বেশির ভাগ রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু কিছু রাস্তা তো যান চলাচলের অনুপযুক্ত। অন্য দিকে, ঢাকাসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার রাস্তার বেহাল দশা প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়। কিন্তু পত্র-পত্রিকায় আসে না- এমন সব মফস্বল এলাকার হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা চলাচলের একেবারেই অনুপযুক্ত, যা কিনা এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীন। দৌড়াদৌড়ি এবং ঘন ঘন টেলিভিশন সাক্ষাৎকার ও পত্রপত্রিকার কভারেজের জন্য দেশবাসী কাদের ভাইকেই বেশি চেনে। জনগণ মনে করে, দেশের সব রাস্তাঘাটই বোধ হয় ওবায়দুল কাদেরের অধীন। ফলে লোকজন মুখে তেল মেখে সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছে।
আমি জানি না, জনাব ওবায়দুল কাদের সারা দেশের রাস্তাঘাটের বেহাল দশা সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিবহাল। আমি এও জানি না, তিনি বর্তমান সরকারের উন্নয়নের মহাজোয়ারের কোন পর্যায়ের প্রবক্তা এবং তার মনমস্তিষ্ক সরকারের মতলববাজদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা এবং স্থূল কর্মকাণ্ড কতটুকু সমর্থন করেন অথবা কোন দৃষ্টিতে দেখেন। তবে তার সাম্প্রতিক চুপ হয়ে যাওয়া থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারি, তিনি ভালো নেই। তা তিনি ভালো থাকুন কিংবা মন্দ থাকুন- এ নিয়ে জনগণ কিন্তু মাথা ঘামাবে না। বরং দেশের লাখো-কোটি মানুষ এত দিন যে ওবায়দুল কাদেরের প্রশংসা করছিল তারা কিন্তু এখন উল্টোরথে চড়ে অকথ্য ভাষায় তাদের বিরক্তি, ক্ষোভ ও ক্রোধ প্রকাশ করে যাচ্ছে।
উন্নয়নের জোয়ারে প্লাবিত হতে হতে দেশের প্রায় এক লাখ কিলোমিটার রাস্তার উল্লেখযোগ্য অংশ এখন চলাচলের অনুপযোগী। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আর তখন উন্নয়নের চাঁদ-তারাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। শত শত বিদেশী পুরস্কার, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদির সনদপত্র এনে দেশের রাস্তাঘাটে বিছিয়ে রাখলেও মানুষজনকে উন্নয়নের কল্পকাহিনী বিশ্বাস করানো যাবে না। তারা বলবে- আমাদের কাছ থেকে বছরে প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা আদায় করো। এই টাকা কোথায় ঢালো- দেশে? নাকি বিদেশে? উন্নয়নে? নাকি উন্নয়নের সনদ জোগাড় করার কাজে?

লেখকঃ সাবেক সংসদ সদস্য (লেখা ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)।

শেয়ার করুন