একটি ইনবক্স বার্তার বেদনার উপাখ্যান

প্রকাশিত

মাসকাওয়াথ আহসান : ছেলেটি পারিবারিক ভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক হয়ে বেড়ে উঠেছে।

medicale andolonবঙ্গবন্ধু ও একাত্তর এই সমর্থনের প্রধান কারণ। একুশ বছর পেছনের দিকে যেতে থাকা একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এই পরিবারের মত অসংখ্য তৃণমূল পরিবার জনক হত্যার বিচার পায়নি, স্বজন হত্যার বিচার পায়নি, খুনিদের প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছে শীর্ষ মর্যাদায়। ক্ষীণ কিন্তু প্রত্যয়ী কণ্ঠে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের দাবী নিয়ে অপেক্ষা করে গেছে। একটা সময় গেছে এই দেশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ন্যায্য কথা বললেও ক্ষমতার দাপটের বিপরীতে ন্যায্য কথা চাপা পড়ে যেত। ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ পোষণকারী তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতাধারীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিদ্বেষের তীব্র বিষ দিয়ে সমাজে বিভক্তি এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, এই সমাজের বৃহৎ একটি অংশের কাছে বঙ্গবন্ধুর সমর্থক হওয়ার কারণে আড়ালে বা প্রকাশ্যে শুনতে হয় তুই মানুষ না আওয়ামীলীগ ?

এই দায় কি শুধু প্রতিপক্ষের? নিশ্চয়ই না। আওয়ামীলীগার মোটাদাগে দুই ধরনের। একাংশ আছে যারা আওয়ামীলীগ কে দুঃসময়েও ধারণ করে। ক্ষেত্রবিশেষ অন্ধের মত সমর্থন করে। দরকারে আবার সমালোচনাও করে। আর আরেক দল আছে যারা আওয়ামীলীগে ভর করে, আওয়ামীলীগের উদার কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের পাখি শিকার করে।খন্দকার মুশতাকের ভূত এখনও আছে। এখন আবার প্রতিপক্ষের ভাইরাসও আওয়ামীলিগের নৌকায় উঠে দূষণ তৈরি করছে আজকাল এসব খবর গনমাধ্যমে আসছে।

চল্লিশ বছর পর ন্যায়বিচারের সূচনা হয়েছে তাই আমরা অনেক অসংগতি সাময়িক ভাবে এড়িয়ে যাই এজন্যে যে, রাতারাতি সবকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমরা অনেক অসংগতি সাময়িক ভাবে এড়িয়ে যাই এজন্যে যে, রাষ্ট্রক্ষমতার এখনই পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের জন্য ভাল নয়। কিন্তু আমাদের সমাজের অনেকেই এভাবে ভাবেন না, তারা ভাবেন এখনই সময় দু হাত ভরে নিজের সবকিছু পাবার। তাদের কেউ কেউ এবার সুযোগ নিয়েছেন শীর্ষ মেধার জায়গা সরকারি মেডিকেল এ পড়ার সুযোগ টাকার জোরে কিনে নিতে। ধর্মীয় নৈতিকতা বা সুশিক্ষা নয়, তাদের কাছে বড় হয়ে গেছে দাপটের সাথে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। তাই ডাক্তার হওয়া নয়, তাদের লক্ষ্য ডাক্তারের পদবী আর আরো বেশী টাকা উপার্জন। আর অনেক ছেলে সৎ থাকার তাগিদে তিন দিন আগে ওই প্রশ্ন পাওয়ার সুযোগ পেয়েও নেয়নি। আস্থা রেখেছিলো আমাদের দূষণের শিকার ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি। বিনিময়ে পেয়েছে শক্তিবান রাষ্ট্রশক্তির দেয়ালে অক্ষম আর্তনাদ করেও নির্লিপ্ত অবহেলা, সুস্থ দৌড় প্রতিযোগিতার মাঝপথে তাদের হাঁটু ভেঙে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই সুযোগ পেতনা, কিন্তু সান্ত্বনা পেত সে সঠিকভাবে দৌড় শেষ করেছে এবং সঠিক ফলাফল পেয়েছে। হয়তো বলা হবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ লাগবে যে, প্রশ্নফাঁস হয়েছে। সেক্ষেত্রে বলবো আমরা জানতাম যুদ্ধপরাধী কারা, জনকের খুনী কারা। আইনের চোখে সত্য প্রমাণ করার ক্ষমতা সবসময় সবার থাকেনা। আমাদেরও আইনের চোখে সত্য প্রমাণ করার ক্ষমতা নেই যদিও আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের এতটা ক্ষমতা দেয়নি যে প্রবীর শিকদার এর মত দ্রুত প্রতিকার পাবো।

যে ছেলেটির কথা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, সেই ছেলেটি সুষ্ঠু পরীক্ষা হলেও সরকারি মেডিকেল এ হয়তো সুযোগ পেতনা, সে মেডিকেল এর কোচিং ও করেনি, যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় সে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের দাবীতে মিছিলে গেছে এবং কেন গেল সেজন্য বাবার বকুনি শুনেছে। তার নাম দীপ্র আসিফুল হাই, তার ফেসবুকে লেখা যন্ত্রণার কথাগুলো আপনাদের পড়তে দেবার জন্যে এ লেখা লিখলাম। কোন আবেদন নিবেদন করতে চাইনা, কারন ন্যায় বিচারের প্রতীক্ষা করতে এম,বি,বি,এস কোর্সে শুরুতেই কতগুলা চোর ও প্রতারক ডাক্তারের ছদ্মবেশে ভবিষ্যতে ডাকাতির জন্য তৈরি হচ্ছে। এরা আমাদের সমাজের আমাদের মতই মানুষ, এই রাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু না আছে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, না আছে বিবেক ও রাষ্ট্রের আইনের প্রতি আনুগত্য। কিন্তু এরাই একদিন সুশীল সমাজ হয়ে রাজনৈতিক কর্মীদের সততার ও নৈতিকতার উপদেশ দিবে।

আমরা জনকের হত্যার বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পেতে শুরু করেছি, আমাদের আশা ক্রমে ক্রমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে আমরা এমন কিছু কেন দেখব যা আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে? মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায় সরকারের নয়। অন্যায়কারীদের দায় সরকার নেবে কেন? এসব ক্ষেত্রগুলোও কেন টেন্ডারবাজির মত দূষিত করে ফেলা হবে? দক্ষ সরকার নিজেইতো দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেবে। পড়ার টেবিল ছেড়ে আন্দোলন করে কেন সুষ্ঠু পরীক্ষার দাবী জানাতে হবে? সবকিছু আইন দিয়ে সমাধান হয়না। সমাজের ভেতর থেকে দূষণরোধ করতে হয়। পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়িয়েছে তাতে তো দল আওয়ামীলীগেরই উচিত সরকারের কাছে সমাবেশ করে, আন্দোলন করে ন্যায্য দাবী আদায় করা। যারা আওয়ামীলীগ ধারণ করে ইতিহাসের নিরিখে তাদের তো সেটাই করা উচিৎ। তা না হলে দীপ্র আসিফুল হাইয়ের মত আওয়ামীলীগ নিজের মাঝে ধারণ করা এবং না করা এদেশের নামমাত্র নাগরিক হওয়া কিশোরেরা জীবনের শুরুতেই জীবনের সমাপ্তির যাতনা পেয়ে, বেদনায় হেরে যাবে। আর এরকম বেদনার কথা লিখবে যা নীচে সংযুক্ত হল-

দীপ্র আসিফুল হাই
“যে ছেলের ৮৫ থেকে ৯০ পাওয়ার কথা, সে ৭০ পায় কেন ? তার বাকি ১৫ থেকে ২০ মার্কস কে কিনে নিল ? আমার খুব দেখার কৌতূহল এই ধরণের মানুষকে যারা বিনা পরিশ্রমে অন্যের মেধার ফসল কিনে নিতে পারে । মাত্র ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করলেই আরেকজন মানুষের ১৫ থেকে ২০ বছরের কষ্টের অর্জন কিনে ফেলা যায় ! এর থেকে আমরা কি শিখলাম ? আমরা শিখলাম যে, এইদেশের অর্থনীতিতে আসলেই সাফল্যের জোয়ার এসেছে । এটা আমাদের মানতেই হবে । দেশে বেকারত্বের হার কমছে, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, দারিদ্র্যও নাকি আগের থেকে কমেছে । এখন আমরা (নিম্ন) মধ্যম আয়ের দেশ । সবই ঠিক আছে । শুধু যেটা কমা দরকার সেটাই কমছেনা । মানুষে মানুষে বৈষম্য কমছেনা কিছুতেই । এখনো সব সুযোগ-সুবিধা, অধিকার, নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা যাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের পকেটে । ২০১৫ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এর সর্বশেষ প্রমাণ । রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের বিভিন্ন ভেল্কিবাজি দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে রাখে । যুদ্ধাপরাধের বিচার, মধ্যম আয়ের দেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, নারী শিক্ষার প্রসার, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, সোনার বাংলা আরো হেনতেন কত হাবিজাবি ! সবই হচ্ছে আফিম । আমাদের আফিম গিলিয়ে নেশায় মাতাল করে রাখা হয় । আমরাও যা গেলায়, তাই গিলি । নিজেরটুকু পেয়ে গেলেই হলো । মানুষের সাথে মানুষের সাম্য ? ফু! মার্ক্সিজমের দিন শেষ । সাম্যের কথা যে বলবে তার গায়ে কমিউনিস্ট ট্যাগ সেঁটে দাও । ব্যস! তবে শেষ কথা কি জানেন ? ইতিহাস এখনো মানুষের, শোষিত মানুষের, যারা সত্যিকার অর্থে মানুষ, তাদের হয়ে কথা বলে । ইতিহাস সমাজ-রাষ্ট্রের উপরতলার বাসিন্দাদের পক্ষে কখনো যায়নি । কোনোদিন যাবেও না । ঠিক যেভাবে পূর্ববর্তী শাষক-শোষকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে এখন যারা মসনদে বসে আঙুল চাটছে, তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে, তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে । বিশ্বাস করুন, ইতিহাস কখনো প্রতিশোধ নিতে ভুল করেনা।“

(সোহাগ পারভেজের ইনবক্স বার্তা থেকে)

লেখক : সাংবাদিক

শেয়ার করুন