কত কমবে জ্বালানি তেলের দাম?

বিশেষ সংবাদদাতা : দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য পরিশোধ করে চিড়া-চ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৬ বছরে সর্বনিম্ন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে যাচ্ছে। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি এখানো। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করবে সরকার। তেলের দাম লিটার প্রতি ৫ টাকা থেকে ৮ টাকা কমতে পারে বলে জানা গেছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এ ব্যাপারে বলেছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, পেট্রল আর অকটেনের দাম ৫ টাকা কমানোর চিন্তা রয়েছে। আর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৭ থেকে ৮ টাকা কমতে পারে।

সূত্র মতে, সরকার এক নির্বাহী আদেশে ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে প্রতি লিটার অকটেন পাঁচ টাকা বেড়ে হয় ৯৯ টাকায়। পেট্রলের দর বাড়ে লিটার প্রতি পাঁচ টাকা। এখন প্রতি লিটার পেট্রল কিনতে হয় ৯৬ টাকায়। আর ডিজেল ও কেরোসিন লিটারে সাত টাকা করে বেড়ে হয় ৬৮ টাকা। ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে এই দুটিতে সরকারের কোনো ভর্তুকি লাগে না।

সূত্র বলছে, জ্বালানি তেল বিক্রি করে অস্বাভাবিক মুনাফা করছে সরকার। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক বছরে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। কিন্তু সরকার দেশের মধ্যে তেল বিক্রি করছে সেই আগের দরেই। দাম কমাচ্ছে না সরকার।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এর চেয়ারম্যান এ এম বদরুদোজা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম সম্বনয় করা হবে। তবে সেটি কবে তার কোন খবর আপাতত আমাদের কাছে নেই।

সহসা কমবে কি-না জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, একটি পরিকল্পনা তো আছে। তবে সেটি কবে থেকে কমবে, কত কমবে সেটি চূড়ান্ত করে বলার সময় এখনো আসেনি।

জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্বালানি তেল ব্যবহার করতে হয় সবাইকে। বিশ্ব বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি। এর ফলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে উৎপাদন খাত পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে ভোক্তা ও উদ্যোক্তাদের। কিন্তু এর প্রায় দুই বছর পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের মধ্যে তা আর কমানো হয়নি।

বিশ্ব বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ ডলারে নেমে এসেছে। ২০০৯ সালের মার্চের পর এই প্রথম জ্বালানি তেলের দাম এ পর্যায়ে নেমে এলো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাজার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটে (ডব্লিউটিআই) গত শুক্রবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৯ ডলার ৮৬ সেন্টে নেমে আসে। দিন শেষে এর দাম ৪০ ডলার ৪৫ সেন্টে উঠলেও বহুজাতিক মার্কিন ব্যাংক সিটিব্যাংক বলছে, ডব্লিউটিআইয়ের তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৩২ ডলারে নেমে যেতে পারে।

জ্বালানি তেলের দাম গত এক বছরে যে হারে কমেছে ১৯৮৬ সালের পর তেমনটা আর দেখা যায়নি। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুনের পর দেড় মাসের বেশি সময়ে তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।

সূত্র বলছে, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার এক বছর পার হলেও দেশে এখনো দাম কমেনি। তেলের দাম না কমানোর যুক্তি হিসেবে সরকার বলে আসছে, আগের ভর্তুকির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার লোকসান সমন্বয় করতে হলে আরো কিছু সময় দরকার।

এদিকে, তেলের এ উচ্চ মূল্য নিয়ে বিপিসি গত এক বছরেই লাভ করেছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। বিপিসি এখন অকটেন ও পেট্রল বিক্রি করে লাভ করছে সবচেয়ে বেশি, প্রতি লিটারে প্রায় ৪০ টাকা। আর ডিজেল, ফার্নেস তেল ও গরিবের জ্বালানি কেরোসিন তেল বিক্রি করে মুনাফা করছে ২০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ সরকার মুনাফা করছে মূলত সাধারণ ভোক্তাদের পকেটের অর্থ দিয়ে।

বিষয়টি সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে যতদ্রুত সম্বব জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা উচিত।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ৫৪ ডলার। পরের তিন মাস, অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে গড় মূল্য খানিকটা বেড়ে হয় ৬১ ডলার। অথচ এক বছর আগে এই তেল কিনতে হয়েছে ১১০ থেকে ১১৫ ডলার। এটি ৩৫ ডলারের নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।