কারবালার শোকের মাতম তাজিয়া মিছিলে

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এবার শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের শোকটা যেন একটু বেশিই ছিল। কারবালার শোকের সঙ্গে মিশেছে বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনার ব্যথা।

বোমা বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার পর কিছুটা সংশয় সৃষ্টি হলে রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের ঐতিহ্যবাহী হোসেনী দালানের ইমাম বাড়া কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেন, যথাসময়েই (সকাল ১০টায়) তাজিয়া মিছিল বের হবে। তবে কিছুটা দেরি করে শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে ইমামবাড়ার সামনে থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মিছিল বের করা হয়।

tajia misil1কালো-লাল-সবুজের নিশান উড়িয়ে, কারবালার শোকের মাতম ওঠে হাজার হাজার মানুষের মিছিলে। বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ মাতম ধ্বনি তুলে এগিয়ে যায় মিছিল, সবার পা ছিল খালি। মিছিলে ছিল ‘বৈল দল (ঘণ্টা পড়া তরুণ)’। কেউ বা এগিয়েছে নওহা (শোকগীতি) পড়তে পড়তে।

ন্যায় প্রতিষ্ঠায় হিজরি ৬০ সালের ১০ মহররম হযরত মুহাম্মদ (স.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) ইসলামের তৎকালীন শাসনকর্তা ইয়াজিদের সৈন্য বাহিনীর হাতে কারবালার প্রান্তরে শহীদ হয়েছিলেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে শিয়ারা এ ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় এ দিনটিকে সুন্নীদের তুলনায় ভিন্নভাবে পালন করে।

ঢাকায় হোসেনী দালান ঘিরে শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের ঐতিহ্য কয়েকশ’ বছরের।

tajia misil2মিছিলের সামনে ছিল কালো কাপড়ের ইমাম হোসেন (র.) এর তাজিয়া (প্রতীকি কবর)। মিছিলের শেষের দিকে সুদৃশ্য বড় আরেকটি তাজিয়া। নারী-পুরুষ শিশুদের হাতে অসংখ্য কালো, লাল ও সবুজ নিশান। তরুণদের (ভেস্তা) হাতে হাতে বিচিত্র আলাম (দীর্ঘ লাঠির মাথায় পতাকা)। আলাম বইতে শক্তি-সামর্থ্যের দরকার হয়। হোসেনী দালান পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন মিছিলে ৫০০ এর মতো আলাম ছিল।

একটি ঘোড়াকে ইমাম হোসেনকে বহনকারী ঘোড়া দুলদুলের প্রতীক হিসেবে সাজানো হয়। মিছিলে যাত্রার আগেই দুধ-ছোলা দিয়ে পা ধোয়ানো হয় ঘোড়ার, পড়ানো হয় সুদৃশ্য জিন (বসার আসন) ও মাথার খাপ। পথে পথেই চলে দুধ দিয়ে ঘোড়ার পা ধোয়ানো। শিয়া ধর্মাবলম্বীরা ঘোড়ার পা ধোয়ানো দুধ পবিত্র হিসেবে আরোগ্য কামনায় শরীরে মাখে ও ব্যবহার করে।

তাজিয়া মিছিলটি বকশিবাজার, উর্দ্দুরোড, লালবাগ চৌরাস্তা, ঘোড়া শহীদের মাজার, আজিমপুর, নিউমার্কেট হয়ে ঝিগাতলা (ধানমণ্ডি লেকের কাছে) গিয়ে শেষ হয়। পথের দুপাশে ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। কাউকে কাউকে ছাদে দাড়িয়ে, জানালা দিয়ে মিছিল উপভোগ করতে দেখা গেছে। পুরো পথেই মিছিল ঘিরে ছিল পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

দুপুর ২টার দিকে মিছিলটি শেষ হয় জানিয়ে হোসেনী দালান পরিচালনা কমিটির সদস্য ও মুখপাত্র সৈয়দ বাকের রেজা বলেন, সেখানে আমরা নামাজ আদায়সহ দোয়া-দরুদ পাঠ করেছি।

tajia misil3শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে হোসেনী দালান চত্বরে পরপর তিনটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় এ বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে এক যুবক মারা যান, অনেকে আহত হন। তবে হোসেনী দালান ইমামবাড়ার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলেছে এ ঘটনায় ‘কয়েকজন’ মারা গেছেন।

হোসেনী দালান ইমামবাড়ার তত্ত্বাবধায়ক এম এম ফিরোজ হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে শনিবার সকালে বলা হয়, ‘বিগত রাতে দুষ্কৃতিকারীরা যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তা শুধু হোসেনী দালান নয়, পুরো দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর বিরাট আঘাত। দেশের শান্তি বিনষ্টকারীদের এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো দেশবাসীর পক্ষ থেকে ধিক্কার জানাই।’বোমা হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এ জাতীয় কাপুরুষোচিত ও ন্যাক্কারজনক কাজ কারবালার প্রান্তে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এ দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেনের সঙ্গে ঘটেছিল যার পুনরাবৃত্তি আজ হোসেনী দালান ইমাম বাড়ায় ঘটেছে। এরা ইসলাম, দেশ ও জাতির শত্রু।’

হাজারীবাগ থেকে মিছিলে আসা তরুণ আব্দুল মামুন মিয়া বলেন, ‘এমন হামলার ঘটনা আমরা কোনো দিনও শুনিনি। মিছিল নিয়ে মহিলাদের ভয়টা বেশি। এবার সবার মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছে।’

মামুনের সমবয়সী মো. রুবেল বলেন, ‘ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যারা হামলা করেছে তারা শয়তানের দোসর ছাড়া কিছু না। এমন ঘটনা ঘটবে আমরা কোনো দিন চিন্তাও করিনি।’

ঢাকায় আশুরার দিনে তাজিয়া মিছিল শুরুর সঠিক ইতিহাস না পাওয়া গেলেও মনে করা হয় ১৬৪২ সালে সুলতান সুজার শাসনামলে মীর মুরাদ হুসেনী দালান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ শোক উৎসবের সূচনা করেন।

মিছিল শুরুর আগে সকাল পৌনে ১০টার দিতে হোসেনী দালানে বোমা বিস্ফোরণের স্থান পরিদর্শন করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ও ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া।

বোমা বিস্ফোরণের পরই বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবস্থান নেয় হোসেনী দালানে। সকালে মিছিলে আসা লোকজনকে তল্লাশি করে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।

প্রধান মিছিলের পর হয় ফাকা শিকানী। সকাল থেকে অনাহারী থাকার পর এর মাধ্যমে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ খাওয়া-দাওয়া করেছেন।

রাতে কারবালা প্রান্তরের নারী ও শিশুদের অসহায় অবস্থার স্মৃতিতে শনিবার সন্ধ্যার পর হোসেনী দালানে হবে শামে গরিবা (অসহায়দের সন্ধ্যা)। শামে গরিবার সময় দালানের সব সাজসজ্জা সরিয়ে ফেলা হয়। নিভিয়ে দেওয়া হয় আলো, মেঝেতে থাকবে না কোন বিছানা বা ফরাশ। এ অবস্থায় চলে বয়ান ও মাতম।

আশুরা উপলক্ষে পুরানা পল্টন, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে শিয়ারা তাজিয়া মিছিল বের করে বলে জানা গেছে।

শনিবার বিকেলে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের বিবিকা রওজা (১৬০০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে পুরনো ইমামবাড়া) থেকে বের হবে বোলতা গাওয়ার বোলতা গাওয়ারা (ছোটাছুটি বা দৌড়ে মিছিল) মিছিল।

শেয়ার করুন