কুমীর মিডিয়ার সৃষ্টি

প্রকাশিত

মাসকাওয়াথ আহ্সান : গোবরডাঙ্গায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যেসব কুমীর এককালে গণহত্যা চালিয়েছিলো তাদের গ্রেফতার করা হয়। শুধু বেয়াই কুমীরগুলো বাদে বাকী কিছু প্রতীকী কুমীরের বিচার চলতে থাকে। গোবরডাঙ্গার তরুণেরা নতুন সকালের স্বপ্ন দেখে। মুরুব্বীদের অনেকেই খুশী হন। চোখের সামনে যারা গণহত্যা করেছে; তাদের বিচার হচ্ছে এ অনেক বড় পাওয়া।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কুমীরবাদটা ঠিক সমাজ থেকে বাদ যাচ্ছে না। কুমীরেরা আন্ডা-বাচ্চা ফুটিয়ে পুরো গোবরডাঙ্গা ভরে ফেলেছে কট্টর কুমীরবাদে। আর যারা সহিষ্ণু সুন্দর মনের মানুষ; তাদের ছেলে-মেয়েরা সংখ্যায় কম। এ গ্রামটি যখন পদ্মডাঙ্গা ছিলো; এখানে একজন অভিভাবক ছিলেন যিনি কুমীর মুক্ত সম্প্রীতির গ্রাম গড়তে চেয়েছিলেন; তিনি সবাইকে উপদেশ দেন দুটোর বেশী সন্তান নিওনা। ছোট্ট গ্রাম। এখানে মানুষ যত কম হবে; অভাব তত কম থাকবে; সুন্দর একটা জীবন হবে সবার। অভিভাবকের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে এ গ্রামের মানুষেরা দুটি করে সন্তান নেয়। অন্যদিকে কুমীর সমাজের প্রধান ফতোয়া দিয়ে দেয়, মুখ দিয়াছেন যিনি; আহার দেবেন তিনি। ব্যাস তখন থেকে শুরু হয়ে যায় কুমীরের বাম্পার উতপাদন। এ গ্রামে ঐ গণহত্যা চালানো কুমীরেরাই পদ্মডাঙ্গার অভিভাবক সোনার মানুষটিকে হত্যা করে। তারপর থেকে পদ্মডাঙ্গা গোবরডাঙ্গা হয়ে যায়; আর কুমীরেরাই হয়ে পড়ে দন্ডমুন্ডের কর্তা। এমনকী কুমীরদের প্রতিপত্তিতে মুগ্ধ হয়ে মানুষেরা তাদের সন্তানাদির বিয়েও দেয় কুমীরের বাচ্চাদের সাথে। ফলে গোবরডাঙ্গা হয়ে পড়ে কুমীরের অভয়ারণ্য।

কুমীরেরা দরিদ্র মানুষের শিশুদের তাদের স্কুলে ভর্তি করে তাদের ব্রেণওয়াশ করতে থাকে, তুমি কুমীর; তুমি কুমীর। ফলে কিছু মানুষের বাচ্চাও কুমীর মন নিয়ে ঘুরতে থাকে। বুড়ো কুমীরেরা বলে দেয়, কুমীরের মত শক্তি যেহেতু তগো গায়ে নাই; চাপাতি নিয়া ঘোরাঘুরি কর। কিছুদিন পর পিঠে বোমা বাইন্ধা দিমুনে।

গণহত্যাকারী কুমীরদের বিচারের গতিটা শামুকের আত্মবিশ্বাসী হন্টনের মত। কিন্তু গোবরডাঙ্গায় কুমীরের বিচার হচ্ছে এই তো অনেক।

অনেকে জিজ্ঞেস করে, বেয়াই কুমীরদের বিচার কী হবে!

মানুষ সেজে বসে থাকা বাচ্চা কুমীরেরা ধমক দেয়, তোর দুইডা পা খাইয়া নিমু। পা চিবাইতে খুব ভালো লাগে।

হয়ও তাই। তরুণেরা ন্যায় বিচারের আনন্দে কাচ্চি বিরিয়ানী খায়; আর কুমীরেরা গ্রামের কিছু মানুষকে রাতের অন্ধকারে গ্রামছাড়া করে; তাদের ঘর বাড়ী দখল করে। এই যে ঘর বাড়ী-জমি দখল এ কিন্তু থেমে থাকেনা। কিছু মানুষ এর মাঝেও প্রতিবাদী হলে হাইব্রীড কুমীর-মানবেরা এসে বলে, আইদার ইউ আর উইদ আস; অর এগেইন্সট আস। চক্ষু তুইলা নিমু।

মানুষ চুপ করে যায়। বসে বসে বক্তৃতা শোনে। সুন্দর সুন্দর কথা। মুরুব্বীদের অনেকে বলে, গোবরডাঙ্গার গামলায়, কুমীরের ঠাই নাই। কুমীরদের বাঁচানোর যে কোন ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া হবে।

কথা খুব সুন্দর সুন্দর; কিন্তু ঘটনা ঘটতে থাকে খুবই অসুন্দর। কুমীরদের প্রশিক্ষণ দেয়া চাপাতি মানবেরা ক্রমশঃ দানব হয়ে ওঠে; একের পর এক তরুণ নিহত হয়; প্রতিদিন স্বপ্ন হনন করে কুমীরেরা। গ্রামবাসী বিচার চাইলে, মুরুব্বীরা বলে, এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল।

কুমির অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে যেন কেউ আর কথা না বলে; সেজন্য আইন হয়। শিশু-কিশোর-তরুণ-প্রৌঢ় একের পর এক গ্রেফতার হতে থাকে কু্মীর অনুভূতি; বিশেষতঃ বেয়াই কুমীর অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অপরাধে।

বিবেকসম্পন্ন মানুষেরাও প্রাণভয়ে চুপচাপ থাকে। কেউ কেউ পঞ্চায়েতের বরাদ্দ থেকে কলাটা-মূলোটা খেয়ে এক ধরণের কৃত্রিম সুবাতাস অনুভব করে।

মানুষ ও কুমীরের বিবাহ বন্ধনজনিত বেশ কিছু হাইব্রীড কুমীর জন্ম নেয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে যায়। সেই পদ্মডাঙ্গার সোনার মানুষটি যিনি মানুষের গ্রাম রচনার জন্য সারাটা জীবন উতসর্গ করেছিলেন, তাঁর স্বপ্নগুলো অশ্রুবৃষ্টি হয়; মানুষ কষ্ট পেলে।

পঞ্চায়েতের কিছু মানুষ যারা সেই মানুষের গ্রাম রচনার স্বপ্নের সঙ্গী ছিলেন, তারা দেখেন পাশের চেয়ারে বসে হয় হাইব্রীড কুমীর-মানব বা বৃদ্ধ বেয়াই কুমীর।

হাইব্রীডেরা গ্রামের মানুষের সামনে হুংকার দেয়, আইদার ইউ আর উইদ আস অর এগেইন্সট আস।

মানুষ প্রতিবাদী হলে পঞ্চায়েত চৌকিদার লেলিয়ে দেয়; চৌকিদারদের মধ্যে যারা কুমীরের বাচ্চা তারা বাড়াবাড়ি করে।

গ্রামে ছেলের সামনে মা ধর্ষিতা হলে, মানুষ প্রতিবাদ করলে, চারটে লাশ পড়ে থাকে রাস্তায়। গ্রামের স্কুলে কুমীরের বাচ্চারা ভর্তি হয়। মানুষ যাতে ভর্তি হতে না পারে সে ব্যবস্থা পাকা করে দেয় কুমীর-সমাজ। শিশুরা প্রতিবাদ জানালে তাদের ওপর চড়াও হয় কুমীর চৌকিদারেরা। এভাবে জনমত পঞ্চায়েতের বিপক্ষে চলে গেলে; সুবাতাস খাওয়া ভাঁড়েরা বুদ্ধি দেয়; একটা গণহত্যাকারী কুমীরের বিচারের রায় দেন; গ্রামটা উতসব মুখর হোক; আমাদের ভুলগুলি ফুল হয়ে ফুটবে।

হয়ও তাই। তরুণেরা ন্যায় বিচারের আনন্দে কাচ্চি বিরিয়ানী খায়; আর কুমীরেরা গ্রামের কিছু মানুষকে রাতের অন্ধকারে গ্রামছাড়া করে; তাদের ঘর বাড়ী দখল করে। এই যে ঘর বাড়ী-জমি দখল এ কিন্তু থেমে থাকেনা। কিছু মানুষ এর মাঝেও প্রতিবাদী হলে হাইব্রীড কুমীর-মানবেরা এসে বলে, আইদার ইউ আর উইদ আস; অর এগেইন্সট আস। চক্ষু তুইলা নিমু।

এতোগুলো তরুণ হত্যার পরেও পঞ্চায়েত বলতে থাকে, এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল; গোবরডাঙ্গায় কোন কুমীর নাই; যারা ছিলো তাদের বিচার হচ্ছে।

মানুষ প্রতিবাদ করে। বেয়াই কুমীরেরা সোনার জামা পরে ঘুরছে; গ্রামের অনেক মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে; জেলের ঘানি টানাচ্ছে, হাইব্রীড কুমীর মানবেরা তরুণী নির্যাতন করছে; ঘটা করে পঞ্চায়েত জমি উপহার দিচ্ছে কুমী্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে; কুমীর নাই মানে, কুমীরে গিজগিজ করছে।

থিংক-ট্যাংক কুমীরেরা বুদ্ধি দেয়, দেন আরো একটা গণহত্যাকারী কুমীরের বিচারের রায় দেন। ছেলেরা কাচ্চি উতসব করুক।

হঠাত গ্রামের বাইরে থেকে আসা এক লোককে কুমীরেরা মেরে দেয়। ব্যাপারটা রহস্যজনক। বড় বড় গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানরা তাদের গ্রামের মানুষকে গোবরডাঙ্গায় আসতে নিষেধ করে দেয়।

হাইব্রীড কুমীর মানবেরা আবার সবাই বড় বড় গ্রামে সেকেন্ড হোম বানিয়ে, কুমীর বৌ ও বাচ্চা কুমীরদের সেখানে রেখে এসেছে। তবে গোবরডাঙ্গার পঞ্চায়েত রাজনীতির স্বার্থে বিবৃতি দেয়, গোবরডাঙ্গায় কোন কুমীর নাই; কুমীর মিডিয়ার সৃষ্টি।

পঞ্চায়েত প্রধান মানুষটা ভালো; কিন্তু বেয়াই কুমীরদের যন্ত্রণায় তার প্রাণ অতিষ্ট। একটু দম ফেলার ফুসরত পাননা। এক থিংক ট্যাংক বেয়াই কুমীর পরামর্শ রাখে, বড় গ্রামগুলিরে ধমক দেন; এইগুলি ষড়যন্ত্র; গোবরডাঙ্গার উন্নয়নে তারা ঈর্ষান্বিত; তারা দেখতে পায়না গোবরডাঙ্গায় এখন গোবরমুঠিও সোনামুঠি হচ্ছে।

পঞ্চায়েত প্রধান এতো কিছু না বলে শুধু বলেন, বড় গ্রামগুলোতে যখন মানুষ হত্যা হয়; আমরা কী তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কিছু বলি!

হাইব্রীড কুমীরেরা বাহ বাহ বাহ বাহ বলে, যেন কোন শেরশায়েরি শুনছে।

আর সুবাতাস সভার কলা-মূলো খাওয়া লোকেরা বলে সাধু সাধু।

পদ্মডাঙ্গার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃস্টান মিলে মিশে থাকবে এ স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই সোনার মানুষটি যাকে কুমীরেরা হত্যা করেছিলো। বর্তমান পঞ্চায়েত প্রধান সেই স্বপ্নের আলোয় পথ হাঁটেন; কিন্তু যে গ্রাম তিলে তিলে পদ্মডাঙ্গা থেকে গোবরডাঙ্গা হয়ে গেছে; সেখানে সবাই মিলে মিশে থাকার স্বপ্নটা আর ঠিক হাতে ধরা দেয়না।

সুবাতাস সভার উপদেষ্টারা মনে করে, তরুণ হত্যা-ভিনগ্রাম থেকে আসা লোক হত্যা-প্রতিবাদী মানুষ হত্যা-তরুণী নিগ্রহ-মানুষের বাড়ী জমি দখল-কুমীর অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেফতার এতো ঘটনা জমা হয়ে গেছে; এখন দুটো গণহত্যাকারী কুমীরের বিচারের রায় অনুযায়ী ফাঁসি না দিলেই নয়।

ফাঁসিকে ঘিরে কাচ্চি খাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টানরা ঠিক বুঝতে পারেনা তাদের ওপরে চলা ধারাবাহিক গণহত্যার জন্য সেসময়ের বেয়াই কুমীর ও এসময়ের হাইব্রীড কুমীর মানবের বিচার তারা কী করে চাইবে! কুমীরদের এক ভাই পঞ্চায়েতে ক্ষমতাসীন দলে তো আরেক ভাই আরো ভয়ংকর বিরোধী দলে; যারা হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-আদিবাসীদের ধারাবাহিক নিধন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল।

এখন বড় গ্রামগুলো যখন বলছে গোবরডাঙ্গায় কুমীর আছে; সব বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী দুটি দলের দুটি কুমীর মুখপাত্র সমস্বরে বলছে, গোবরডাঙ্গায় কোন কুমীর নাই। অন্যধর্মের মানুষের ওপর নির্যাতনেও এমন একটি সুরেলা ঐকমত্য আছে তাদের।

গ্রামের পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল এবং ফিলগুডের জারী-সারী-মুর্শিদী-মারফতী গান বাজতে থাকে চারপাশে।

বেয়াই কুমীর সলাজ হাসি দিয়ে হাইব্রীড কুমীর মানবদের বলে, আরো কিছু গণহত্যাকারী কুমীর গ্রেফতার করা যাক। গ্রামের মানুষ পঞ্চায়েত বিরোধী আন্দোলন করলেই একটা কইরা বৃদ্ধ অপরাধী কুমীর জবাই দিয়া দিলেই হবে। ইয়াং কুমীরগুলিতো মোটাতাজা হইতেছেই; অসুবিধা কী; কুমীরবাদের তো বিনাশ নাই; কী কও!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। লেখা ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।

শেয়ার করুন