খোদা হাফেজ বনাম আল্লাহ হাফেজ

প্রকাশিত

হাসান মীর : আমরা, এই উপমহাদেশের মুসলিমরা, সাধারণত পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় ” খোদা হাফেজ ” বা ” আল্লাহ হাফেজ ” বলে থাকি, যার অর্থ খোদা বা আল্লাহ আপনাকে হেফাজত বা রক্ষা করুন। দুই একজন আবার ‘ ফি আমানিল্লাহ ‘ও বলেন। খোদা হাফেজ কথাটি বহুদিন থেকে চলে আসছে, সেই তুলনায় আল্লাহ হাফেজ অপেক্ষাকৃত নতুন, ১৯৭০’ এর দশকের শেষ দিকে অথবা আশির দশকের প্রথম দিকে এটি বেশি শোনা যেতে থাকে। তবে কোনো আরব দেশে এ ভাবে আল্লাহ হাফেজ বা খোদা হাফেজ বলার রীতি- রেওয়াজ নাই। আমার এক বন্ধু কিছু দিন সৌদি আরবে ছিলেন, তাঁর কাছে শুনেছি সেখানকার আরবিভাষীরা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বলে থাকেন ” মা আস্ সালামা ” যার অর্থ ভালো থেকো আর যিনি বিদায় দিচ্ছেন তিনি বলেন ” ফি আমানিল্লাহ ” — আল্লাহ তোমার সহায় হোন অথবা তোমাকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করলাম। আবার অনেকে বিদায় নেওয়ার সময় ‘আল্লাহ করিম’ও বলে থাকেন। চাকুরিসূত্রে অনেক দিন লিবিয়া ও সৌদি আরবে ছিলেন আমার পরিচিত অন্য একজনের মতে, আল্লাহ – খোদার এই বিতর্ক ওয়াহাবী পন্থী সৌদি আর শিয়াপন্থী ইরানিদের মধ্যেকার অহি নকুল সম্পর্কের ফল। আল্লাহ – খোদা বিতর্ক অর্থহীন।

আমাদের মধ্যে অনেকেই অবশ্য বলে থাকেন আল্লাহ আর খোদা তো একই কথা, আল্লাহ আরবি শব্দ আর খোদা হচ্ছে পারসিক বা ফার্সি। এই উপমহাদেশে শত শত বছর ধরে খোদা শব্দটি প্রচলিত থাকায় এখন যেনো আল্লাহ আর খোদা অভিন্ন হয়ে গেছে। দুটি শব্দই বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা, নিরাকার, বিশ্ববিধাতাকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তবে বিষয়টিকে বোধহয় এভাবে সরলীকরণ করা যাবে না। আল্লাহ শব্দটি আরবি ” আল ” যার অর্থ সুনির্দিষ্ট বা একমাত্র এবং ইলাহ, যার অর্থ সৃষ্টিকর্তা — এই দুয়ের সম্মিলিত রূপ আল্লাহ , যার অর্থ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা বা একক ঈশ্বর । ইসলাম -পূর্ব যুগেও আরবে আল্লাহ নামটি ব্যবহার হতো, তারা অবশ্য তাদের অনেক দেবতার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতাকে ‘ আল্লাহ ‘ বলে জানতো এবং তার পুত্র-কন্যা কল্পনা করা হতো। প্রাচীন হিব্রু ভাষাতেও শব্দটি ছিল। আরবের খ্রিস্টানরাও প্রাচীনকাল থেকে আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। এমনকি শিখদের ধর্মগ্রন্থেও অনেকবার আল্লাহ শব্দের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ইসলামে যেভাবে আল্লাহকে এক এবং অদ্বিতীয়, আদি ও অন্তহীন ও একমাত্র উপাস্য গণ্য করা হয়, ইসলাম-পূর্ব যুগের ‘ আল্লাহ ‘ তেমন ছিল না। বর্তমানের খ্রিস্টানরা যীশুখৃস্টকে ঈশ্বরের পুত্র বলে উল্লেখ করে থাকে।
এখানে লক্ষণীয়, বিশ্বের মুসলমানেরা যে আসমাউল হুসনা বা আল্লাহর ৯৯টি গুণবাচক নামে বিশ্বাস করে থাকেন, তার কোনোটাই কিন্তু আল্লাহর বিকল্প নাম নয়, সেগুলি কেবল তাঁর গুণের নাম । এবং এতগুলি নামের মধ্যে ফার্সি বা পারসিক শব্দ ‘ খোদা ‘ নেই। উপরন্তু, প্রাচীন পারস্যে যেখানে খোদা শব্দের উদ্ভব ( খোদা শব্দের অর্থ স্বয়ম্ভু অর্থাৎ যিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন) সেখানে সমস্যা হচ্ছে প্রাচীন পারসিকদের খোদা ছিল দুইজন, একজন কল্যাণের আর অন্যজন অকল্যাণের খোদা, যা দ্বিত্ববাদের জন্ম দেয়। যাইহোক, সম্ভবত মোঘল আমলে আরও অনেক ফার্সি শব্দ ও পারসিক সংস্কৃতির সঙ্গে খোদা, নামাজ, রোজা, শবে বরাত, শবে কদর ( শব অর্থ রাত্রি, যা আরবিতে লায়লা, লায়লাতুল কদর) ইত্যাদি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। অনেকের মতে, পীর- মুর্শিদী, উরশ ও মিলাদ মহফিল, ঈদে মিলাদে নবী – এগুলিও নাকি ইরানি বা পারশিক সংস্কৃতির প্রভাব।

মুসলিমদের মধ্যে আমরা যাদের একটু গোঁড়াপন্থী বলে চিহ্নিত করি, তারা বলেন ঈশ্বর বা ভগবান যেমন আল্লাহ্‌র সমার্থক নয় ( এদের স্ত্রীলিঙ্গ হয়, কিন্তু আল্লাহ হচ্ছেন নিরাকার, তাকে নারী কিংবা পুরুষ রূপে চিহ্নিত করা যাবে না) একইভাবে তারা খোদা শব্দটিকেও আল্লাহর সমার্থক বলে গ্রহণ করতে রাজি নন। তবে নামাজ, রোজা কথাগুলি ( আরবিতে সালাত ও সওম ) এমনভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে যে এদের বাদ দেয়া অসম্ভব বলেই মনে হয়। সেই তুলনায় খোদা হাফেজের জায়গায় আল্লাহ হাফেজকে পুনঃস্থাপন করা সহজ হতে পারে। উপরন্তু আমরা খোদা হাফেজ বাদে অন্য অনেক ক্ষেত্রেই আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করি, যেমন – আলহামদুলিল্লাহ, সোবহানাল্লাহ, বিসমিল্লাহ, নাউজুবিল্লা, ইনশাআল্লাহ্‌, ইন্নালিল্লাহ, ওয়াস্তাগফিরুল্লা ইত্যাদি। তাই অনেক ক্ষেত্রেই যখন আল্লাহ যুক্ত হয়ে আছেন তো এক ‘ হাফেজের ‘ বেলায় আল্লাহ থাকলে বিতর্ক কিসের ? মানুষের আমল ( কাজ ) তো তার নিয়তের ( উদ্দেশ্য) ওপর নির্ভর করে। তাই যদি হয়, তাহলে আল্লাহ আর খোদায় কী আসে যায় ! কিন্তু বিতর্ক ফেলে সবাই যে কোনো – ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাবেন, আমাদের সমাজে এমনটি আশা করাও দুরাশা বলে মনে হয়। না হলে যত মত, তত পথ – কথাটির উদ্ভব ঘটতো না। বিতর্কের কিছু না পেলে আমরা পানি না জল – এ নিয়েও তো তর্কে লিপ্ত হই যদিও এর কোনটাই বাংলা শব্দ নয়। তাই আল্লাহ হাফেজ আর খোদা হাফেজ নিয়েও অযথা বিতর্কে না গিয়ে যার যেমন খুশি বললেই হয়, বস্তুত এটা আদৌ কোনো বিতর্কের বিষয় নয়।। ( আমার এই লেখা নিতান্তই সাধারণজ্ঞান নির্ভর, ধর্ম বা শাস্ত্র সম্পর্কে আমার বাড়তি কোনো বিদ্যা নেই। ) । পুনশ্চ — এই লেখায় কোনো অসঙ্গতি থাকলে পাঠককে জানাতে অনুরোধ করছি৷।

লেখক : সাবেক বেতার কর্মী, বাংলাদেশ বেতার ও রেডিও এনএইকে জাপান।

শেয়ার করুন