ঢাকাই ছবিতে যেভাবে চলছে নকল নাচ-গানের দৃশ্যধারণ !

বিনোদন ডেস্ক : রাজধানীর শশব্যস্ত শ্যুটিং এলাকা কোক স্টুডিও। ২২ আগস্ট শনিবারও একাধিক ইউনিটের শ্যুটিং চলছে। ইতিউতি ঘুরে তিন নম্বর ফ্লোরে যাওয়া। চলছে কর্মযজ্ঞ। রঙিন সাজে তৈরি সেট। নায়িকা নিপুণ দৃশ্য বুঝে নিতে ব্যস্ত। নৃত্য পরিচালক ও ছবির পরিচালক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার মনিটরের দিকে। অন্যপাশে ক্যামেরার ফোকাস/ডিফোকাস নিয়ে ব্যস্ত চিত্রগ্রাহক। পাশে ল্যাপটপে একটি ভিডিও গান ছেড়ে প্রস্তুত আরেকজন।

ড্যান্স ফ্লোরে নায়িকার সহশিল্পীদের উদ্দীপনার কমতি নেই। নির্দেশক ওয়ান টু থ্রি অ্যাকশন বলতেই শুরু হলো গান। নেচে উঠলেন নিপুণ। কিন্তু শব্দ নিয়ন্ত্রকের ল্যাপটপে যে মেয়ে নাচছে তার সঙ্গে ঠিক মিলছে না নিপুণের চেহারা। দূর থেকে দেখায় হয়তো এমন লাগতে পারে, এই ভেবে কাছে যাওয়া। না, দূর আর কাছের দেখা- একই। এটি অন্য মেয়ে, অন্য দল, অন্য ছবির নাচ-গান। কিন্তু কস্টিউম ও সেটের সাজসজ্জা প্রায় কাছাকাছি। দেখে বোঝা যায়, এরা ভারতীয় শিল্পী। চেহারায় তামিল ছাপ। তাদের নাচের সঙ্গে বেজে চলেছে নিপুণের জন্য তৈরি রিমেক গান, ‘প্রেম রসিয়া হব কেমনে।’ অর্থাৎ এই শ্যুটিংয়ে ভারতীয় একটি সিনেমার নাচের অনুকরণেই নাচছেন নিপুণ।

ল্যাপটপে চলছে তামিল গানের ভিডিও

তবে কি এভাবে প্রকাশ্যেই চলছে নকলবাজি? এটি ‘ছেড়ে যাস না’ ছবির সেটের ঘটনা।

এ বিভ্রাট নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো ল্যাপটপের পাশের জনকে। তিনি তথ্য দিতে নারাজ। শুধু বললেন, ‘এ বিষয়ে পরিচালক ভালো বলতে পারবেন’। যৌথ প্রযোজনার এ ছবিটির পরিচালক দু’জন। কলকাতার তপন চক্রবর্তী ও বাংলাদেশের নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামূল।

পরিচালকের দারস্থ হওয়ার আগে নিশ্চিত হওয়া গেল, গানটির দৃশ্য ভারতের কোনও তামিল ছবির নকলে করা হচ্ছে। বেশ কৌশলে দু’একটা পার্থক্য আনা হয়েছে। যেমন নিপুণের সঙ্গে টেকো মাথার একজন অংশ নিয়েছেন আর ভারতীয় ভিডিওতে আছেন ঝাঁকড়া চুল-দাড়িওয়ালা শিল্পী। দুজনই পরেছেন সাদা পাঞ্জাবি। ভারতীয় ভিডিওতে একদল মেয়ে মূল শিল্পীর সঙ্গে নাচছেন আর নিপুণের সঙ্গে আছে ছেলেরা। পরিচালক নেয়ামূলের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘এটা কোনও নকল নয়। আমরা কোনও গান থেকে নকল করছি না। আবহটা একইরকম রাখার জন্য ল্যাপটপের ভিডিওটা পাশে রাখা হয়েছে।’

একপাশে চলছে তামিল ভিডিও, অন্যপাশে নৃত্য পরিচালক মাসুম বাবুল ও ছবির পরিচালক নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামূল

তাহলে নৃত্য পরিচালক মাসুম বাবুলের নির্দেশনা কেন ভিডিওর নাচের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে? তবে কি নাচগুলো নকল করা হচ্ছে?

এবার উদাহরণ টেনে বিস্তারিত বললেন পরিচালক, ‘এটা মোটেও কোনও গানের নকল নয়। বেশ কয়েকটি গান কেটে একত্রিত করা হয়েছে এখানে। আপনি তো গানের শেষপর্যন্ত এখনও দেখেননি, তাই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। গানগুলো জোড়া দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করা হয়েছে যেন আমার গানের আবহটা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়। হুবহু কিছু নয়। জাস্ট শুধু দৃশ্যটা (আবহ) কাছাকাছি ধরনের দেখতে লাগবে। আপনি কি আমার ‘এক কাপ চা’ ছবির গানগুলো দেখেছেন? এগুলোতেও একইভাবে কাজ করেছি। আর আমার তৈরি বিজ্ঞাপনগুলোতেও একইভাবে কাজ করেছি। বেশ কয়েকটি গানের ভিডিও কোলাজ তৈরি করে পরে আমাদের গানটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে কিছু নয়।’

পরিচালকের ব্যাখ্যাতেও শুভঙ্করের ফাঁকি চলে আসে। তার মানে সেট ডিজাইন ও পোশাক পরিকল্পনাটা নকল। কিন্তু সামনাসামনি বসে দেখা যায় নাচের মুদ্রাতেও বেশ মিল। এমনকি সেটে শিল্পীদের অভিব্যাক্তিতেও মিলগুলো স্পষ্ট।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা বললেন মজার কথা। তাদের মতে, চাইলেও হুবহু নকল করার সাধ্য আমাদের নেই। কারণ তামিল বা বলিউডের ক্যামেরা, সেটের জন্য কাঁচামাল ও আসল কস্টিউম আনা সম্ভব নয়। এ ছাড়াও তারা আলাদা সেট তৈরি করে থাকে। যা খুব ব্যয়বহুল। তাই নকল করতে গেলেও কিছুটা পার্থক্য থাকে।’

এদিকে ছবির নাচ নকলের অভিযোগ আছে নৃত্য পরিচালক মাসুম বাবুলের বিরুদ্ধে। মজার বিষয় হলো, নকলের অভিযোগের পরও চলতি বছরের বেশিরভাগ ছবিতে তিনিই কাজ করেছেন। এমনকি ‘ছেড়ে যাস না’ ছবির সেটেও অন্য গান দেখে দেখে নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে এ নৃত্য পরিচালককে।

মাসুম বাবুল সম্পর্কে জানা যায়, প্রায় আড়াইশ ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। চলতি বছরের বেশিরভাগ ছবিই তার নৃত্য পরিচালনায়। কিন্তু শ্যুটিং স্পটে থেকে সবার সামনে ভারতীয় ছবির ভিডিও গান দেখে দেখে এই নৃত্য পরিচালনার কী মানে? সে উত্তর মেলেনি কারও কাছে। অনেকে বলেছেন, নৃত্য পরিচালক সংকট। তাই গল্পে নতুনত্বের কথা উঠলেও নৃত্য ও গান হরহামেশাই নকল হচ্ছে। আর সেদিকে খেয়াল করার সময় খুব কম।

এমনও অভিযোগ রয়েছে, নৃত্য পরিচালকদের দিয়ে মূলত ভারতীয় বিভিন্ন ছবির গানের ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। সেই সংগ্রহ থেকে ছবির মূল পরিচালক নৃত্য পরিচালককে একটি বা কয়েকটি গান বাছাই করে দেন শ্যুটিংয়ের জন্য। এক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে, ছবিগুলোর নৃত্য পরিচালকের কাজ এটুকুই। এসব বিষয়ে মাসুম বাবুলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে চেয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দেশের অনেক প্রতিথযখা নৃত্যশিল্পী মূলধারার চলচ্চিত্রে যুক্ত হননি। বর্তমান সময়ের শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীদের কাউকেই কখনও চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনায় পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য নির্দেশক শিবলী মোহম্মদ বললেন, ‘আমি কখনও চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনার প্রস্তাব পাইনি। হয়তো তারা আমাকে যোগ্য মনে করেননি। তবে এটা দুঃখের যে পাশের দেশে ‘দেবদাস’সহ অনেক ছবিতে শাস্ত্রীয় গুরু বিরজু মহারাজ কাজ করেছেন। তিনি আমার শিক্ষক। আমি তো তার কাছেই শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখেছি। আমার মনে হয়, শাস্ত্রীয় শিল্পীরা চলচ্চিত্রে কাজ করতে পারে না- এটা একেবারেই ভুল ধারণা।’

নৃত্যের পাশাপাশি গানের কথা ও সুরেও চলছে এখন বলিউড ও তামিলের ছোঁয়া। গতবছর ঢাকাই চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের অধিকাংশ ছবিতে গল্প ও গান নকলের অভিযোগ ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘রোমিও বনাম জুলিয়েট’, ফেব্রুয়ারিতে শাফি উদ্দীন সাফি পরিচালিত ‘বিগ ব্রাদার’র গল্প, এপ্রিলে মুক্তি পাওয়া ইস্পাহানি আরিফ জাহানের ‘গুন্ডা- দ্য টেরোরিস্ট’,  ওয়াজেদ আলী সুমনের ‘পাগলা দেওয়ানা’ ছবির গল্প ও কয়েকটি গান, মে মাসে ইফতেখার চৌধুরীর ‘অ্যাকশন জেসমিন’র গল্প, জুনে এস আই মানিকের ‘দুই পৃথিবী প্রেম’- এর গল্প, আগস্টে অনন্য মামুনের ‘ব্ল্যাকমেইল’, শাফি উদ্দীন শাফির ‘ব্ল্যাক মানি’, ফারুক ওমরের ‘লাভার নম্বর ওয়ান’র গল্প  এবং বর্তমানে মুক্তিপ্রতীক্ষিত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘আশিকি’ ছবির একটি গান একই অভিযোগে অভিযুক্ত। শীর্ষ তারকা ও পরিচালকদের ছবি বাদ দিলে অন্যদের অবস্থা আরও নাজুক।

‘ছেড়ে যাস না’ ছবির পরিচালক নেয়ামূল জানালেন, তার এ ছবির পুরো গান দেখলে সব সংশয় দূর হয়ে যাবে। এখনে কোনও নকল নেই।