‘তুলে নেওয়ার’ ৮১ দিন পর ব্লগার খুনে গ্রেপ্তার!

ডেস্ক প্রতিবেদন : বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তাওহিদুর রহমান ওরফে গামাকে (গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে তৌহিদুর রহমান) প্রায় তিন মাস আগে রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় একদল লোক। তাওহিদের বোন ডা. নাসেরা বেগম এ দাবি করে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে ধানমণ্ডি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরে একটি এজাহার দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু ৮১ দিন পর র‍্যাব বলছে, তাঁকে ব্লগার হত্যার ঘটনায় বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ডা. নাসেরা দাবি করেন, তাওহিদ কোনোভাবেই হত্যার পরিকল্পনা করতে পারেন না। তিনি খুব কমই ফ্ল্যাটের বাইরে বের হতেন।

তবে তাওহিদকে আগেই আটক করার দাবি নাকচ করে দিয়েছেন র‍্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান।

গত ১৮ আগস্ট র‍্যাবের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তাওহিদসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। ১৭ আগস্ট (বুধবার) রাজধানীর ধানমণ্ডি ও নীলক্ষেত থেকে তাঁদের আটক করা হয়।

র‍্যাবের দাবি, আটক হওয়া তিনজনই নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।

এ নিয়ে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় ‘বাংলাদেশে হত্যায় ব্রিটিশ নাগরিকের আটক নিয়ে সন্দেহ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ডেভিড বার্গম্যান ও মুক্তাদির রশিদের করা প্রতিবেদনে নাসেরার বক্তব্যসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়।

তৌহিদুর রহমানের বোন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাসেরা বেগম দাবি করেন, গত ২৮ মে দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয় দিয়ে তাওহিদুর রহমানকে ধানমণ্ডির বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাননি তিনি।

ডা. নাসেরা বেগম বলেন, ২৮ মে দুপুর পৌনে ২টার দিকে তিনি ফোনে বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি বাসায় এসে পৌঁছান সাড়ে ৩টার দিকে। এরপর স্বজনদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। বিকেলে ধানমণ্ডি মডেল থানায় যান এবং ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নম্বর-১৩৯৪, তারিখ-২৮-০৫-২০১৫। এরপর গত ৩ জুন তিনি একটি এজাহারও দায়ের করেন।

জিডিতে বলা হয়, ‘গত ২৮ মে অনুমান ১টা ৪০-এ অজ্ঞাতনামা চারজন লোক আসে এবং বাসার নিরাপত্তারক্ষীকে ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয়। এরা জোরপূর্বক বাসায় প্রবেশ করে ভাই তাওহিদুরকে আটক করে নিয়ে যায়। এ সময় বিষয়টি আমার মা মুঠোফোনে আমাকে জানালে আমি কাদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলি।’ জিডিতে বলা হয়, ‘তারা কোনো পরিচয় না দিয়ে মোবাইল ফোন কেটে দেয়।’

ওই জিডির কপিতে ধানমণ্ডি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাহিদুর বিশ্বাসকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। এনটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে তাঁকে ফোন করে জিডি নম্বরটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকের ভাইয়ের কথা বলছেন? হ্যাঁ উনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে জিডি হয়েছিল। পরে মামলাও হয়েছিল। এখন বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে আছে। এর বাইরে আমি আর কোনো কিছু বলতে পারব না।’

এ ছাড়া ৩ জুন ধানমণ্ডি মডেল থানায় দায়ের করা এজাহারে বলা হয়, ‘তাওহিদুর রহমান (৫৫) দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ লন্ডনে বসবাস করে এবং লন্ডনের নাগরিকত্ব লাভ করেছে। মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আমার ভাই, বোন ও মাকে দেখার জন্য আসে। আমার মা হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হওয়ায় ২০১৩ সালের মে মাসে তাওহিদুর বাংলাদেশে আসে এবং আমার মাকে দেখাশোনার জন্য থাকে। সে অবিবাহিত, বর্তমানে কোনো চাকরিও করে না ও নিয়মিত নামাজ পড়ে এবং বিগত আট বছর ধরে বাইপোলার রোগের জন্য নিয়মিত চিকিৎসাধীন।’

ডা. নাসেরা বলেন, তাওহিদুর রহমান বাইপোলার মানসিক রোগে আক্রান্ত। ঢাকায় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে তাঁর ভাইকে দেখানো হয়।

নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি ওই চিকিৎসকের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। থানার জিডি ও অসুস্থতার জন্য চিকিৎসাপত্র আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সাদা পোশাকে চার ব্যক্তি

আল-জাজিরার কাছে নাসেরা বেগম দাবি করেন, তাওহিদ কোনোভাবেই হত্যার পরিকল্পনা করতে পারেন না। এমনকি তিনি খুব কমই ফ্ল্যাটের বাইরে বের হতেন।

বাসার প্রহরী মাহের আলী আল-জাজিরাকে বলেন, ‘গত ২৮ মে সাদা পোশাকে থাকা চারজনের একটি দল তাঁকে ওই বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘চার ব্যক্তি বাড়ির গেটে এসে তাদের তাওহিদুর রহমানের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে বলেন। তিনি এরপর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ককে ডেকে আনেন।’

বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক স্বপন বড়ুয়া বলেন, ‘ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে ফ্ল্যাটে যাই। তবে আমাকে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।’ স্বপন বড়ুয়া আরো বলেন, ‘আমি নিচে নেমে আসি এবং ফোন করে তাওহিদুর রহমানের কাছে ওই ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চাই। তিনি জানান, তাঁরা প্রশাসন ও পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) থেকে এসেছেন। তাঁর বোনকে ফোন করতে বলি আমি।’

নাসেরা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এক ব্যক্তি ফোনে বলেন জিজ্ঞাসাবাদ করতে কয়েক ঘণ্টার জন্য ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি তখন ভাইকে অন্য কোথাও নিতে না করি। জানাই তিনি অসুস্থ। এরপর আমি তাঁদের পরিচয় জানতে চাই কিন্তু ওই ব্যক্তি ফোন রেখে দেন।’

তাওহিদের ছোট ভাই ওয়াহিদুর রহমান ডেল্টা বলেন, ‘আমি জানতে চাই, বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ৮১ দিন আমার ভাইকে কোথায় রাখা হয়েছিল।’

ব্রিটিশ হাইকমিশনও অবগত

আল-জাজিজার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ জুন নাসেরা বেগম তাওহিদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনে জানান। তিনি হাইকমিশনের সহযোগিতা চান।

তবে ব্রিটিশ হাইকমিশনের এক মুখপাত্র আল-জাজিরার কাছে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

‘নিখোঁজের ঘটনা বাড়ছে’

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের মতে, বাংলাদেশে এমন নিখোঁজের ঘটনা ধীরে ধীরে বাড়ছে। আইন অনুযায়ী আটকের ২৪ ঘণ্টা পর আদালতে নেওয়ার কথা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এমন ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ, অবৈধভাবে তাঁদের আটক রাখা হয়, নিখোঁজ থাকেন, কেউ জানে না মাস বা সপ্তাহ ধরে তাঁদের কোথায় রাখা হয়। এরপর হঠাৎ করেই পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিটি আর ফিরে আসে না।’

‘অপরাধীদের কৌশল’

তাওহিদকে আগে আটক করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন র‍্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনে আমরা যা বলেছি তা-ই বাস্তব। অনেক সময় অপরাধীরা এমন বক্তব্য দেয়। এটা অপরাধীদের কৌশল। তারা তাদের পরিবার থেকে পালিয়ে যায়।’

গত বুধবার র‍্যাবের সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা দাবি করেন, ওইদিনই (১৭ আগস্ট) সকালে ঢাকার একটি নামকরা কাবাব রেস্টুরেন্টের বাইরে থেকে তাওহিদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ১২ ঘণ্টা তাঁদের হেফাজতে থাকা ব্রিটিশ এই প্রযুক্তিকর্মী স্বীকার করেছেন, তিনি ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাস হত্যার পরিকল্পনা করেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বাংলাদেশি ব্লগার অভিজিৎ রায় এবং মে মাসে সিলেটে অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যা কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি চুপ থাকেন

আল-জাজিজার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৯ আগস্ট বুধবার আদালতে তাওহিদসহ তিন ব্যক্তির সাতদিনের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তাওহিদের আইনজীবী এ এল এম কালাম উদ্দিন আদালতকে বলেন, ‘তাকে অবৈধভাবে আটক করা হয়েছে।’ ওই আইনজীবী পুলিশের কাছে অভিযোগের অনুলিপি আদালতে জমা দেন। এ এল এম কালাম উদ্দিন বলেন, ‘বিচারক এই বিষয়ে কোনো কিছুই বলেননি। তিনি চুপ থাকেন।’

এনটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে আইনজীবী এ এল এম কালাম উদ্দিন বলেন, ‘থানার জিডি ও অসুস্থতার চিকিৎসাপত্রসহ সব ধরনের নথিপত্র যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।’