পুলিশের ভাবমূর্তি ও গরীবের হয়রানী

প্রকাশিত

পুলক ঘটক : জাপানী নাগরিক কুনিও হোশি হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ চারজনকে আটক করেছে। এদের একজন রিকশাচালক, একজন বাড়িওয়ালা, যেখানে আততায়ীরা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার সন্নিকটবর্তী বাড়িটির এক তরুণ এবং যে ছেলেটি বিদেশি কুনিও’র সাথে থেকে তার দেখভাল করতেন।

এর ভাল দিক হল দেশি-বিদেশি সকল মিডিয়ায় এসেছে, “চারজন আটক”। যে “ভাবমূর্তি” নিয়ে এত উত্কণ্ঠা সেই “ভাবমূর্তি” রক্ষার চেষ্টা আরকি। বিএনপি-জামাত আমল, আওয়ামীলীগ আমল– সব আমলে ভাবমূর্তি নিয়েই যত কথা। এখানে ভাবমূর্তি সবচেয়ে সেনসিটিভ, সবচেয়ে সুকুমার বস্তু। অনেকটা ধর্মানুভূতির মত। ঘটনার চেয়ে; খুন-অঘটন-মানবিক আর্তনাদ- সবকিছুর চেয়ে ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবনা বেশি। সত্য চাপা থাক, ভাবমূর্তি বাচুক।

কনস্টেবল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যেকোনো পুলিশ সদস্যের সাথে একান্তে চা খেতে খেতে কথা বলুন। তারা কেউ বলবেনা যে তারা বিশ্বাস করে আটককৃত চার ব্যক্তি জাপানী নাগরিক হত্যায় জড়িত। তাদের সবার সাথে কথা বলুন। একজন পাবেননা যিনি বিশ্বাস করেন গাইবান্ধার এমপি লিটন দরিদ্র পরিবারের শিশুটির উপর গুলি চালায়নি। যিনি অপরাধ করেছেন বলে নিশ্চিত বিশ্বাস আছে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়না, অথচ যিনি অপরাধ করেননি বলে বিশ্বাস তাকে আটক করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়নি। এই আটক আর গ্রেপ্তারের মধ্যে পার্থ্যকের পর্দাটি কতটা ভারী? একটি সম্ভবত বেআইনি, একটি আইনি। গ্রেপ্তার করলে আদালতের সামনে হাজির করতে হবে এবং জিজ্ঞাবাদের প্রয়োজন থাকলে রিমান্ডের আবেদন করতে হবে। আদালত তার বিবেচনা অনুযায়ী হয় রিমান্ডে দেবেন, অথবা জেল হাজতে পাঠাবেন, অথবা জামিন দেবেন। আটকের ক্ষেত্রে এরকম কোনও ঝামেলা নেই। পুলিশ ইচ্ছেমত আটকে রাখবে, যেভাবে মন চায় সেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, মন চাইলে ছেড়ে দিবে।

আচ্ছা, আইন কি বলে? এভাবে আটক রাখা যায়? আইন যাই বলুক, সাধারণ মানুষের জন্য এটাই সুবিধা। যতক্ষণ থানায় আছে, দেন দরবার করার সুযোগ আছে। কোর্টে গেলতো মামলার জাল গিড়ে বসল।

এই মামলাটি দেশে বিদেশে মনিটর হচ্ছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দেখভাল হচ্ছে। সুতরাং অপরাধ না করলে তারা হয়তো ছাড়া পেয়ে যাবেন — যদিনা বলির পাঁঠার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তারা অপরাধী হলে সাজা পাক, নিরাপরাধ হলে মুক্তি পাক।

তাদের সন্দেহবসত, কিংবা মামলার তদন্তের স্বার্থে আটক করা হয়েছে; পুলিশ সন্দেহমুক্ত হলে ছেড়ে দেবে এইতো? আচ্ছা, জিজ্ঞাসার জন্য আটক করা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প ছিলনা? রিকশাচালক না হয়ে সমাজের বা রাস্ট্রের প্রভাবশালী কেউ হলে তাকে কি আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হত? যে ছেলেটি বিদেশি কুনিওকে সঙ্গ দিত বলে আটক হয়েছে, সে যদি পুলিশের কোনও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সন্তান হত? আবার আসি এমপি সাহবের কথায়। যেখানে খুনটা হয়েছে তার পাশের বাড়িটি যদি এমপি সাহেবের হত? কাছাকাছি এলাকায় খুন সংঘটিত হওয়ার কারনে এমপি সাহেবের বাড়ি থেকে তার ছেলেকে কি তুলে নিয়ে যাওয়া হত? গতকাল থেকে থানা হেফাজতে কেমন আছেন আটককৃত চার ব্যক্তি? কেমন সময় কাটছে তাদের পরিবারের? যদি তারা অপরাধী না হয়, তবে কি রাস্ট্রের কাছে এই হয়রানির প্রতিকার পাবেন? বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা আছে আইনের চোখে সকলে সমান, সবাই আইনগত সম-সুরক্ষা লাভের অধিকারী।

পুলিশকে আর ঘাটাইনা। এরকম একটা সংবেদনশীল মামলায় পুলিশকে সহযোগিতা করা সকল নাগরিকের কর্তব্য। আমাকে অমুলকভাবে আটক কিংবা আমার সাথে যথেচ্ছ আচরন করা হলেও আপাতত জাতীয় স্বার্থে মানতে হবে। বিশেষ করে আমরা যখন প্রবলভাবে অনুভূতি প্রবণ। অনুভূতিতে আঘাত লাগলে, ভাবমূর্তিতে টান পড়লে পুলিশের আছে ৫৭ ধারা।

লেখক : সাংবাদিক, (লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)।

শেয়ার করুন