বাংলাদেশে না ফিরতে নতুন ফন্দি নূর হোসেনের

কোলকাতা প্রতিনিধি : নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন মামলার অন্যতম অভিযুক্ত, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের দমদম জেলে আটক নূর হোসেনের মামলাটি তুলে নেওয়ার আর্জি পেশ করা হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসতের সিজি এম আদালতে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে মামলাটি তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়।  কিন্তু মামলার গতিপ্রকৃতি দেথে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশে ফিরতে চাইছেন না নূর হোসেন। নানা ‘উছিলায়’ তিনি মামলাটিকে দ্রুত শেষ করতে দিতে চান না। নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ না করে, অসুস্থতার ভান করে তিনি বারবার মামলার শুনানিতে উপস্থিত থাকতে চাননি। এতে মন্থর হচ্ছে মামলার গতি।

জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নূর হোসেনকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করা হয়। তাকে গ্রেফতারে ‘লুক আউট নোটিশ’ জারি করেছিল বাংলাদেশ সরকার। যা ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হয়। ভারতে ইন্টারপোলের নোডাল সংস্থা সিবিআই (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)। সেই সূত্রে ইন্টারপোল থেকেও সিবিআইকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর সিবিআই তার তৎপরতা শুরু করে। ইতিমধ্যে তারা বাংলাদেশ হাইকমিশনে ভারতের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠিয়ে নূর হোসেন সর্ম্পকিত খবরাখবর জানিয়েছে। এ বিষয়ে আরও বিশদ জানতে তারা বিধাননগর সিটি পুলিশকে প্রতিবেদন দিতে চিঠি পাঠিয়েছে। বিধাননগর সিটি পুলিশ জানায়, নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মামলা তুলে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। যদি মামলা তুলে নেওয়ার সম্মতি পাওয়া যায়, তবে তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে। যদিও এখন তা নির্ভর করছে আদালতের সম্মতির ওপর।

এদিকে, ভরাতের কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন মামলার প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেন দমদম সেন্ট্রাল জেলে বেশ আরামেই আছেন বলে জানা গেছে।

জেল সূত্র মতে, নূর হোসেনকে জেলের ৪ নম্বর সেলে রাখা হয়েছে। তার সেলে অপর এক বন্দিও রয়েছে।  সেই বন্দি বিষয়ে কোনও তথ্য জানা যায়নি। নূর হোসেনের অপর দুই সঙ্গি ওহিদুজ্জামান সালিম ওরফে সালিম এবং সুমন খান জামিনে মুক্ত আছেন।  তবে নূরের অপর সঙ্গি সুমন কেন আদালতে আসছেন না তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল।

তিনি এখন কোথায় আছেন  জানতে চাইলে তার আইনজীবী অনুপ ঘোষ বলেন, তিনি জানেন না সুমন কোথায় আছেন। আমার সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ নেই। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

সুমন বাংলাদেশে চলে গেছেন, না ভারতে আছেন তা জানা যাচ্ছে না। এর আগেও নানা কৌশলে নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগী অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন । কখনও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে, কখনও বিচারকের অনুপস্থিতি দেখিয়ে, আবার কখনও জামিনে মুক্ত একজনের আদালতে উপস্থিত না হওয়ার মাধ্যমে অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত করেন তারা।

এর আগেও নিন্ম আদালতে ৬ অক্টোবর ২০১৪ -তে সুমন বারাসাতের মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিমের আদালতে নির্ধারিত হাজিরা দেননি।  অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আদালতে হাজির না হওয়ার আবেদন করেন তিনি। সেবারও অভিযোগ গঠন করতে পারেননি আদালত। অপর দিকে নূর হোসেন নিজে এখন পর্যন্ত কোনও আইনজীবীকে তার পক্ষে নিয়োগ করেননি এবং জামিনের আবেদনও করেননি।

প্রথম প্রথম আদালতে উপস্থিত হয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলতেন, তার আত্মীয় কলকাতায় এলে তিনি জামিনের আবেদন করবেন। এখানে তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার।

এখন অবশ্য তিনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেন। তবে সাংবাদিক বা অন্য কারও প্রশ্নের জবাব দেন না। তার স্বাস্থ্যও ভাল রয়েছে। প্রতিদিন পরিষ্কার জামা-কাপড় পরে তিনি প্রায় ‘রিল্যাক্স মুডে’ আদালতে আসছেন। আবার ফিরেও যাচ্ছেন। বহুল আলোচিত এই নূর হোসেন ধরা পড়ার পর ঢাকার সংবাদ জগতের মতো কলকাতায়ও আলোড়ন হয়েছিল। তার গ্রেফতার ও কলকাতার কার্যকলাপ নিয়ে অনেক খবর প্রকাশিত হলেও আজ কলকাতার সংবাদপত্রের পাতায় তার খবর নেই।

কলকাতার পুলিশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এই নূর হোসেনের মতো অনেকে কলকাতায় ধরা পড়ে বা আত্মগোপনে থাকতে পারেন। কিন্তু তারা সচেতনভাবে ভারতে কোনও অপরাধ ঘটান না। তাই ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে বেআইনি অনুপ্রবেশ ছাড়া আর কোনও মামলা দায়ের করা যায় না। আর এই মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে কয়েকদিন সাজা খাটার পর তারা মুক্তি পান। এক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই।

নূর হোসেনের ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের নোটিশ ছিল, তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর যে তালিকা আদালতে পেশ করা হয়েছিল, তাতে রয়েছে ৫টি মোবাইল ফোন আর এগারোটি সিম কার্ড । এর মধ্যে একটি বাংলাদেশের সিমও ছিল। তবে কোনও অস্ত্র আটক করা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছিল। আদালতে নূর হোসেন আর তার দুই সঙ্গীর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, তারা বসিরহাট এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন কোনও ভিসা ছাড়া। তাদের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশি আইনের ১৪ নম্বর ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে।

যেহেতু ভারতে তারা কোনও অপরাধ করেননি,তাই নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার উল্লেখ করা হয়নি এফআইআর-এ। তবে এতে বলা হয়, আটককৃতদের আরও কয়েকজন সহযোগীর খোঁজ পাওয়ার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় তারা।

কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী কৌশিক মুদ্রা বলেন, অভিযুক্ত জামিনের আবেদন না করে, আইনজীবি নিয়োগ না করে কখনও অসুস্থতার ভান করে, বিচারপ্রক্রিয়াকে মন্থর করার চেষ্টা করছেন বলেই মনে হচ্ছে। এক্ষেত্রে তিনি হয়তো ভাবছেন দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলে তাকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করা হতে পারে। এবং নিজ দেশে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তাতে তার কঠিন শাস্তির সম্ভবনা আছেই বলেই তিনি এমনটা করছেন।

নূর হোসেনের অপর দুই সহযোগী ওহাদুজ্জামান শামীম ও খান সুমনের আইনজীবী অনুপ ঘোষ  জানান, রাজ্য সরকার নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের মামলা তুলে নেওয়ার পর তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া সহজ হবে। যেহেতু বাংলাদেশে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ‘রেড কর্নার নোটিশ’ জারি আছে, সেহেতু ভারত-বাংলাদেশ বন্দিবিনিময় চুক্তি মেনে তাকে খুব সহজে বাংলাদেশের হাতে প্রত্যর্পণ করা যাবে।