বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত

ডেস্ক প্রতিবেদন : উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে আজ (১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।

দলটির মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এ ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এসব কর্মসূচির বেশিরভাগই পালিত হবে ঘরোয়া আয়োজনে। অতীতে বর্ণাঢ‌্য আয়োজনে নিজেদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করলেও এবার কিছুটা ব্যতিক্রম থাকছে কর্মসূচিতে।

সরকারের আক্রমণাত্মক মনোভাবের কারণে মন ভরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে আনন্দ উল্লাস করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপেদষ্টা শামসুজ্জামান দুদু।

তিনি বলেছেন, দেশে বর্তমানে স্বাভাবিক অবস্থা নেই। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্বল্প পরিসরে অায়োজন সেটারই বহিঃপ্রকাশ। যেখানে গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকে সেখানে স্বাভাবিক কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয় না।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান মনে করেন, সময়ের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অনেক কিছু করতে হয়। সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের কারণে দেশের কোথাও কোনো কর্মসূচি করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, কঠিন এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যতোটুকু করা যায় তারা তা করবেন। আলেচনা সভা, জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধাসহ নানা কর্মসূচি পালন করবেন তারা।

গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে আছেন, এই সময়ে বিএনপির সফলতা কী জানতে চাইলে বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য ও উপদেষ্টা বলেন, সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এটাই বিএনপির সফলতা।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচনে জিতে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতার দেখা পেয়েছিল দলটি। এক হিসেবে দেখা যায়, এখন এই দলটিই টানা প্রায় আট বছর ক্ষমতার বাইরে আছে। এর মাঝে দলটিতে অনেক উত্থান পতনের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম সবচেয়ে বড় বিপর্যস্ত অবস্থায় মঙ্গলবার ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন। এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সারা দেশের নেতাকর্মী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

দলটির ৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রায় ৩৪ বছর ধরে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন খালেদা জিয়া। এ ছাড়া দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। এরপর সংকটকালে ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের এ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণীতে খালেদা জিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে জনগণের ক্ষমতায়নে ভূমিকা পালন করার জন্য এ দিনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের যে রাজনীতি তিনি সূচনা করেছিলেন-তা বাকশালীয় একদলীয় রাজনীতিউত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রে জনগণের কাছে সমাদৃত হয়েছে বলে এদেশের জনগণ বারবার এ দলকে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বিএনপি সর্বদা জনগণের রাজনৈতিক দল হিসেবে সকল জাতীয়-রাজনৈতিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকুলতা ও রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশেও দেশের গণতন্ত্র যতবার বিপন্ন হয়েছে বা গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত এসেছে-বিএনপি সবসময় জনগণকে সাথে নিয়ে স্বৈরশাসন-গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তির চ্যালেঞ্জকে দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করেছে এবং গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অক্ষুন্ন রেখে দেশ ও জনগণের সেবায় বিএনপি আগামী দিনগুলোতেও বলিষ্ঠ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরো বলেন, জনগণের অধিকার আদায়, তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা আবারও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি অঙ্গীকারাবদ্ধ। জনগণের কাছ থেকে ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেয়া মৌলিক-মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন এখন জরুরী। জনগণের আকাঙ্খা অনুযায়ী সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পথ প্রশস্ত করবেন।
এ দলের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি।’

দলের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক সেপ্টেম্বরে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র‌্যালির আয়োজন করেছে বিএনপি। এ ছাড়াও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি। সম্পতি রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

রিপন বলেন, ‘দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক সেপ্টেম্বর ভোর ছয়টায় নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১০টায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। এ সময় ওলামা দলের আয়োজনে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।’

পরে বিকেল তিনটায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ ছাড়া সারাদেশে অঙ্গ-সংগঠনগুলো বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান পালন করবে বলেও তিনি জানান।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ তৎকালীন ১৮-দলীয় জোট নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলনে নামে। নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে দলটির ভেতরে এখন প্রায় কঙ্গালসার অবস্থা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের এক পটভূমিতে ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান।

প্রথমে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিতে রূপান্তরিত হয়।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে দলটি প্রথমবারের মতো নেতৃত্বের সংকটে পড়ে। দলের সেই সঙ্কটকালে ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া।

পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকা দলটিকে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। এরপর ২০০১ সালে আবারো ক্ষমতায় আসে দলটি।

দেশের বৃহত্তর এই রাজনৈতিক শক্তির ৩৭ বছরের উত্থান-পতনের ইতিহাসে প্রায় ৩৩ বছর ধরে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।তাকে আপোসহীন নেত্রী বলে দাবি করেন দলটির নেতাকর্মীরা।

কর্মসূচি : মঙ্গলবার ঢাকায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভোরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১০টায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেতা বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শেরেবাংলা নগরস্থ জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন।

এছাড়া বিকেল ৩টায় কাকরাইলস্থ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট কাউন্সিল হলে বিএনপির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এছাড়া থাকবে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি।

দলটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন এবং যথাসময়ে জিয়াউর রহমানের মাজারে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন