আজ মঙ্গলবার, মার্চ ৯, ২০২১ | ২৪ ফাল্গুন, ১৪২৭

শিরোনাম

৭১ এর নারী রাজাকারদের ইতিহাস

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০২০


৭১ এর নারী রাজাকারদের ইতিহাস

এই সম্পর্ক বিস্তারিত জানতে গিয়ে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম পুরুষ দালালদের রেকর্ড থাকলেও এই ৫০ জন নারীর রেকর্ডগুলো পুরোপুরি মুছে দেয়া হয়েছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জানতে পারলাম এই ৫০ জনের মধ্যে বেশির ভাগ মহিলাই সম্ভ্রান্ত এবং ক্ষমতাধর পরিবারের ছিল। এদের বেশির ভাগই ছিল ইয়াহিয়া সহ পাকিস্তানী আর্মির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কেপ্ট, সোজা বাংলায় শয্যা সঙ্গিনী। এরা মনে প্রাণে পাকিস্তানের গণহত্যা সমর্থন করত ।মূলত নিজের এবং স্বামীদের উন্নতি সহ নানা সুযোগ সুবিধা পাবার জন্য এরা পাকিস্তানী অফিসারদের সাথে ঘনিষ্ঠ হত এবং দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করত।

মুক্তমন ডেস্ক ৭১ এর নারী রাজাকারদের ইতিহাস অনেকেই জানেন না। অথচ নারী রাজাকার ছিল এবং নারী রাজাকারদের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।

মার্চ ২৩, ১৯৭২ সালে দৈনিক পূর্বদেশ(বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস এ সংরক্ষিত)পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, তৎকালীন অর্থ মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে যান। সেখানে গ্রেফতারকৃত মোট ৯ হাজার ৪৯৩ জন রাজাকার হিসেবে গ্রেফতার হওয়া আসামী ছিল, যারা কোন না কোন ভাবে দেশের বিপক্ষে গিয়ে পাকীদের মদদ যুগিয়েছে। সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এদের মধ্যে ৫০ জন নারীও ছিল যারা ‘নারী রাজাকার’ হিসেবে পাকিস্তানীদের সহচরী হয়ে কাজ করায় দালাল আইনে গ্রেফতার হয়েছিল। এছাড়া সারা দেশে দালাল হিসেবে যে লিস্ট করা হয়েছে ছিল সেখানে ৬২ জন নারীর কথা উল্লেখ আছে।

প্রথমে  জেনে নিই দালাল আইন সম্পর্কে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব রাজাকার, আলবদর, আলশামস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেছে তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দ্য বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার ১৯৭২ বা দালাল আইন আদেশ শিরোনামে আইন প্রণয়ন করা হয়। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় দুই হাজার ৮৮৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় সাজা দেওয়া হয় ৭৫২ জনকে। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারা-দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিল।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর দালাল আইন বাতিল করার পর থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ঘোষণা দ্বারা আইনটির প্রয়োগ শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি আইনটির আদেশ জারি হলেও পরবর্তীতে একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি, ১ জুন এবং ২৯ আগস্ট তারিখে তিন দফা সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটি চূড়ান্ত হয়। পরবর্তীতে দালাল আইনের অধীনে ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিভিন্ন আদালতে তাদের বিচার আরম্ভ হয়। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে কর্মরতদের কেউ দালালি এবং যুদ্ধাপরাধ, রাজাকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন কি না তা যাচাই করার জন্য ১৯৭২ সালের ১৩ জুন একটি আদেশ জারি করে যা তখন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।


এই সম্পর্ক বিস্তারিত জানতে গিয়ে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম পুরুষ দালালদের রেকর্ড থাকলেও এই ৫০ জন নারীর রেকর্ডগুলো পুরোপুরি মুছে দেয়া হয়েছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জানতে পারলাম এই ৫০ জনের মধ্যে বেশির ভাগ মহিলাই সম্ভ্রান্ত এবং ক্ষমতাধর পরিবারের ছিল। এদের বেশির ভাগই ছিল ইয়াহিয়া সহ পাকিস্তানী আর্মির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কেপ্ট, সোজা বাংলায় শয্যা সঙ্গিনী। এরা মনে প্রাণে পাকিস্তানের গণহত্যা সমর্থন করত ।মূলত নিজের এবং স্বামীদের উন্নতি সহ নানা সুযোগ সুবিধা পাবার জন্য এরা পাকিস্তানী অফিসারদের সাথে ঘনিষ্ঠ হত এবং দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করত।

জানুয়ারি মাসের সংবাদ। রবিবার ১৭ই পৌষ ১৩৭৮। সাইম সরকার নিখোঁজ। সেই সংবাদের পাশেই নিউজ হয়েছে- আরো ৩৯ জন দালার গ্রেফতার। ৩৯ জনের নাম প্রকাশ করা হয় হয় এর মধ্যে দুইজন নারীর নাম রয়েছে।এরা নারী রাজাকার ছিল। এদেরকে গ্রেফতার করা হয় ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে।

নামগুলো হল-

২৫ নম্বর নামটি বেগম রোকেয়া আব্বাস।ঢাকা ২৯ ফরিদা বেগম। শিবচর ফরিদপুর।


তৎকালীন বেশ নাম-ডাক ওয়ালা ঔষধ কোম্পানি করিম ড্রাগস এর মালিকের স্ত্রী এই তালিকায় ছিল। পরবর্তীতে মেজর জিয়া দালাল আইন বাতিল করার সুযোগে মামলা মুক্ত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।এখানে একটা তথ্য দিয়ে রাখি পরবর্তীতে করিম ড্রাগস-এর বড় একটি শেয়ার বর্তমান বেক্সিমকো কোম্পানি কিনে নেয়। এছাড়াও আফরোজা নূর আলী নামে এক মহিলার নাম পাওয়া যায় যে তৎকালীন এক উচ্চপদস্ত সরকারী কর্মকর্তার স্ত্রী ছিল।

এখানে আরও একজনের নাম পাওয়া যায়। শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হকের মেয়ে রইসী বেগম, যে তৎকালীন পাকিস্তান জমিয়তুল সিলমের প্রেসিডেন্ট ছিল, সে (১২ই এপ্রিল ১৯৭১) সালে তার বিবৃতিতে লিখেছে-


আমাদের প্রিয় পাকিস্তানের সীমান্তের ওপার থেকে শত্রুপক্ষ কর্তিক সংগঠিত ও প্ররচিত কতিপয় দেশদ্রোহীদের দ্বারা চরম ভয়ভীতি ও হুমকির মধ্যে কাল কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ্‌ মহান আল্লাহ্‌তালা লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত মুসলমানদের সারা রাতের আকুল প্রার্থনা কবুল করেছেন এবং পাকিস্থান কে সমূহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এটা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার যে শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের জাত শত্রুদের সহায়তায় পাকিস্তানের সাতকোটি জনগণের এ অঞ্চলকে বিশ্বনাথ, কালি, ও দুর্গার মন্দিরে পরিণত করার ষড়যন্ত্র লিপ্ত ছিলেন। আল্লাহ্‌ আকবরের স্থলে শেখমুজিব পৌত্তলিকদের যুদ্ধের শ্লোগান জয় বাংলা আমদানি করেছিলেন।

এই মহিলা, ধর্ম কে ঢাল বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশদ্রোহী , ধর্মদ্রোহী আর শেখ মুজিবুর রহমান কে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়েছিল। সে হুমকি দিয়েছিল যে পাকিস্তানের কাছে বশ্যতা স্বীকার না করলে পাকিস্তান এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবে।

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি ১৯৭২ । সেক্টর ২-এর অধীনস্থ সিদ্দিক বাজার গেরিলা ইউনিটের দুর্ধর্ষ সেনানীরা কুখ্যাত জরিনা’কে গ্রেফতার করা হয়। এই মহিলার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর সহায়তা করতো এবং গেরিলা কার্যকলাপ সম্বন্ধে তাদের কাছে খবরাখবর আদান প্রদান করতো। গ্রেফতারের পর জরিনা স্বীকার করে যে, তার সহায়তায় পাক বাহিনী বহু মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়। জরিনা অবশ্য দাবী করে যে, এই সমস্ত মেয়েদের ভরণ-পোষণের ভার তার (জরিনা) হাতেই ন্যস্ত ছিল।



৭ জানুয়ারি ১৯৭২, সেক্টর ২-এর অধীনস্থ সিদ্দিক বাজার গেরিলা ইউনিট কুখ্যাত ‘নারী রাজাকার’ জরিনা’কে গ্রেফতার করে।

দৈনিক পূর্বদেশ এ প্রচারিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ, খুলনাতে মহিলা প্রতিরোধ কমিটি নামে পাকিস্তান সমর্থক মহিলাদের একটা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।সেখানে বক্তারা যে কোন মূল্যে পাকিস্তান রক্ষার প্রতিজ্ঞা করেন।


৭১ এ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্য পাক প্রতিনিধি দলের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। সেখানে দুজন নারী সদস্যের নাম পাওয়া যায় যারা। একজন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রী রাজিয়া ফয়েজ ( মৃত) এবং আর একজন ড: ফাতেমা সাদিক। এরপর রাজিয়া ফয়েজ ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ (খান এ সবুর) থেকে প্রথম নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরশাদের সময়ে তিনি সাতক্ষীরা সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শিশু ও মহিলা এবং সমাজ কল্যাণ বিষয়ক পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন।


নারী রাজাকার রাজিয়া ফয়েজ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যও ছিলেন এই রাজিয়া ফয়েজ। ২০০৬ সালের শেষের দিকে তিনি জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দেন। গত কাউন্সিল অধিবেশনে তাকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।

সোহরাওয়ার্দী কন্যা বেগম আক্তার সোলায়মান ১৯৭১ সালের ১২-ই জুন রেডিও পাকিস্তানে বক্তব্য রাখে। ভাষণে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্যদেরকে নিজ নিজ এলাকায় জনগণের মধ্যে পাকিস্তানের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা স্থাপনের জন্যে কাজ করার আহবান জানায়। আক্তার সোলায়মান তার ভাষণে ‘টিক্কা খান’ এই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সঠিক ব্যবস্থা নিয়েছে’ বলে উল্লেখ করে।

তথ্য সূত্র – ( দৈনিক আজাদ, ১৩ ই জুন )

বেগম আখতার সোলায়মান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্টত-ই বিরোধিতা করেছিলেন। সৌদি বাদশাহ খালেদ খন্দকার মোশতাকের কাছে পাঠানো এক বার্তায় বলেন,‘আমার প্রিয় ভাই, নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় আপনাকে আমি নিজের ও সৌদি জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশে আগস্টের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন খন্দকার মোশতাক ক্ষমতাসীন, ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেগম আখতার সোলায়মান ভুট্টোকে এক চিঠিতে লেখেন:‘আমি সব সময় আপনাকে একজন অসীম সাহসী, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও ব্যতিক্রমী দূরদর্শী মানুষ হিসেবেই জানি। “বাংলাদেশ” বিষয়ে আপনি সকল প্রত্যাশাকে অতিক্রম করে গেছেন। আপনি মুসলিম ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন দেখিয়ে অত্যন্ত উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।’তথ্য সূত্র -(এ এল খতিবের, এর হু কিলড মুজিব )

রোকেয়া কবীর এবং মুজিব মেহেদী ‘মুক্তিযুদ্ধ ও নারী’ এই বইটিতে লিখেছেন , –নারীরা সর্বত্রই সক্রিয়, যেমন সক্রিয় ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী ভুমিকায়ও। যারা এ রকম ভুমিকায় লিপ্ত ছিলেন, তাদের অধিকাংশেরই ওই কাজের পেছনে পারিবারিক স্বীকৃতি ছিল। যদিও মূলে ছিল ধর্মান্ধতা। পরিবারই এদের প্ররোচিত করেছে নেতিবাচক ভুমিকায় লিপ্ত হতে। এ ক্ষেত্রে সকল শ্রেণি ও স্তরের নারীদের সক্রিয়তা থাকলেও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত স্তরের নারীদের সক্রিয়তাই ছিল বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। লক্ষণীয় যে, এরকম প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই সক্রিয়দের পিতা বা চাচা, স্বামী বা ভাই কিংবা পুরো পরিবারটিই শান্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। অবশ্য নিম্নবিত্তদের ক্ষেত্রে অন্য কারণও লক্ষ করা গেছে। যেমন, পাকসেনা বা রাজাকারদের ক্যাম্পসমুহে কর্মরত আয়ারা।

১৯৭১ সালের  ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখে দৈনিক পূর্বদেশ এ , একটি সংবাদ প্রচারিত হয় শিরোনাম ছিল, ‘সহস্রাধিক মেয়ে রাজাকার হয়েছে’ । সেখানে বলা হয়, এক হাজারের বেশী যুবতী মেয়ে আপওয়ার রাজাকার হিসেবে নাম রেজিস্ট্রি করেছে বলে আপওয়ার সহকারী সভানেত্রী বেগম প্যাটেল জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মেয়ে রাজাকারদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে দান সংগ্রহ, কাপড় সেলাই, দানের জিনিসপত্র প্যাক করা এবং বেসামরিক জনতার উপর ভারতীয় বিমান আক্রমণের ফলে আহতদের চিকিৎসা করা। বেগম প্যাটেল বলেন, পাকিস্তানী বীর যোদ্ধাদের ব্যাবহারের জন্য পাঁচশত দান পার্সেল আজ সমাজ কল্যাণ দফতরেও পার্সেলগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাবেন।