মনিরুল ইসলামেরা কেন ফিরতে পারেন না?

কিশোর রায় : মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশের সন্তান। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়া। তারপর মাস্টার্স করেছে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে। পিএইচডি করেছেন জর্জিয়া ট্যাক থেকে। এখন কাজ করছেন গুগলে।

এই মনিরুল ইসলাম পিএইচডি শেষে দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। কেন ফেরেননি, জানেন?

সে বিষয়ে খুব অল্প কথায় তিনি বলেছেন, ‘জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার সিকিউরিটিতে পিএইচডি করার পর ভেবেছিলাম দেশে ফিরব। তখন দেখলাম আমার বন্ধুরা এরই মধ্যে বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হয়ে গেছে। আমি যদি দেশে ফিরে শিক্ষকতা করি, আমাকে একবোরে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। আমার অনেকগুলো গবেষণাপত্র ছিল। যদি আরও গবেষণার কাজ করতে চাই, দেশে হয়তো সেই সুযোগ পাব না।’

মনিরুল ইসলামের মতো বাংলাদেশের অনেক তরুণ –তরুণী বিদেশে উচ্চ শিক্ষা শেষে দেশে ফিরতে চান। কিন্তু তারা ফিরতে পারেন না। কেন পারে না, জানেন? সারা দুনিয়াতে তরুণদের ইউনিভার্সিটিতে নিয়োগ দেওয়া হয় তাঁর গবেষণার যোগ্যতা, পাবলিকেশনের গুণগত মা, সুপারভাইজারদের নামডাক, রিসার্চ প্রপোজাল ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে।

ইউনিভার্সিটি ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-গবেষকদের প্রমোশন, বেতন এগুলো নির্ভর করে যাঁর যাঁর গবেষণা ও কন্ট্রিবিউশনের ওপর। এই মনিরুল ইসলাম যদি বাংলাদেশে ফিরতেন, তাহলে তিনি ইউনিভার্সিটিতে জব পেতেন লেকচারার বা অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে। (যদিও বা পেতেন!)

মজার বিষয় হলো, তাঁর যে কলিগরা অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর (কিংবা প্রফেসর) হয়ে বসে ছিলেন, দেখা যেতে, তাঁদের কোনো গবেষণার অভিজ্ঞতা নেই।

অর্থাৎ মনিরুল ইসলাম পিএইচডি, পোস্টডক করে গিয়ে লেকচারার বা অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর কিন্তু তাঁর কলিগ এত কিছু না করেই অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর! দুধ আর ঘিয়ের দাম যে রাজ্যে সমান হয়ে যায়!

সারা দুনিয়ার ইউনিভার্সিটিগুলো শিক্ষক নিয়োগের জন্য ট্যালেন্ট হান্ট করে। দেশ-বিদেশের যে কেউ সেসবে আবেদন করতে পারেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলোতে রিসার্চ ফান্ডসহ ওপেন অ্যাপ্লিকেশনের সুযোগ নেই বললেই চলে।

তাই এই মনিরুলেরা যখন কষ্ট করে বিদেশ থেকে গবেষণা করে ফেরেন, তখন বলা হবে, তোমার বয়স নেই, তুমি বিসিএস দিতে পারবে না। তোমার বয়স নেই, তুমি সরকারি চাকরিতে আবদন করতে পারবে না।

বলা হবে, বিদেশে কিছু করতে পারলে না, দেশে ফিরে এসেছো! মনিরুলদের ঘুরতে হবে নেতার পিছু পিছু। ঘুরতে হবে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকের দয়া-দাক্ষিণ্যের জন্য। আর মনিরুলদের বহু সাধনার অর্জন, ছয় মাসেই দুধ থেকে ছানায় পরিণত হবে!

অথচ আমাদের সমাজে একটা ধারণা বিদ্যমান, মনিরুলেরা বাংলাদেশের খেয়েপরে বিদেশ গিয়ে, দেশকে ভুলে গেছেন। বিদেশের জীবন পেয়ে দেশের কথা আর মনে রাখেননি।

কিন্তু এই মনিরুলেরাই যখন বাংলাদেশে গিয়ে একটি চাকরি পাবেন না, তাঁর পরিবারকে চালাতে পারবেন না, মা-বাবার ভরণপোষণ দিতে পারবেন না, তখন কিন্তু কেউ খোঁজ নেবেন না। কোনো দিনও না। এই মনিরুলেরা কি তখন জর্জিয়া ট্যাকের সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়ে বাঁচতে পারবেন?

আমরা কি কোনো দিন আমাদের সিস্টেমটা পরিবর্তনের জন্য বলি? কোনো দিন কি বলি, ইউনিভার্সিটিগুলোর উচিত ট্যালেন্ট হান্ট করা। ইউনিভার্সিটিগুলোর উচিত রিসার্চ প্রপোজাল, একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ইত্যাদির ওপর যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া। রিসার্চ ফান্ডসহ ওপেন অ্যাপ্লিকেশনের সুযোগ রাখা। দেশের মেধাবীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্প চালু করা!

মনিরুলরা দেশে ফিরলে, সরকার তাঁর পোষ্য শিক্ষক পাবে না। মনিরুলেরা প্রিন্সটন থেকে পড়ে গিয়ে নেতার ছবি ঝুলিয়ে পূজা দিতে পারবেন না। মনিরুলেরা ফিরে গেলে, দেশের ছেলেমেয়েরা আরও জ্ঞানী হবেন, সচেতন হবে।

তাহলে রাজনৈতিক দলের পোষ্য বাহিনী কে হবে? রাজনৈতিক দলগুলোর যদি পোষ্য বাহিনী না থাকে, তাহলে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে পারবে না। সুতরাং মনিরুলদের ফিরিয়ে নিয়ে বিপদ ডাকার কী দরকার! তার চেয়ে ঢের ভালো, অনুগত ছাত্র-শিক্ষক তৈরী করা।

মনিরুল ইসলামেরা ফিরতে পারেন না কারণ তাঁদের পেট আছে। ক্ষুধা আছে। তাঁদেরও পরিবার আছে। কষ্ট ও যোগ্যতা দিয়ে তাঁরা যেটা অর্জন করেছেন, সেটাকে তাঁরা কী করে অবলীলায় ভাসিয়ে দেবেন, বলুন! যে দেশটিতে মনিরুলেরা জন্ম নেন, সেই দেশ তাঁদের কখনোই ডাকে না।

অথচ, যে দেশে মনিরুলেরা জন্ম নেন না, সে দেশগুলোই তাঁদের খোঁজে। এমন বহু মনিরুল, মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসেন। তাঁদের পরিবারগুলো গ্রামে থাকে। উচ্চ শিক্ষিত হয়ে বিদেশে কাজকর্ম করেন বলে তাঁদের পরিবার বেঁচে আছে। দেশে ফেরার জন্য সকাল –সন্ধ্যা আকুলতা থাকলেও তাঁরা ফিরতে পারেন না। তাঁদের ফেরার জায়গা থাকে না। তাঁদেরকে কেউ ডাকেন না!

সূত্র;  লেখকঃ রউফুল আলম (বইঃ একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়)