মুসলিম বেয়াইহুড

মাসকাওয়াথ আহসান : বেয়াইপুরে বেয়াই কতৃক হিন্দু জমিদার বাড়ী ও জমি দখলের অভিযোগকে ঘিরে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ার হৈ চৈ-এ থলের মধ্যে থেকে কালো বেয়াইগুলো বেরিয়ে পড়ে। সলিম বুঝ খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। এতোদিন ধরে মুখে দেশাত্মবোধক কতনা গান গেয়েছে সে; অথচ আজ দেখা যাচ্ছে দেশদ্রোহী যুদ্ধাপরাধী তার বেয়াই; একথা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মুখে। সলিম বুঝের যুদ্ধাপরাধী বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটল ভীষণ টেনশানে। বেয়াইয়ের ক্ষমতার থলেতে সুখে ছিলো সে তার কালো ব্যবসা নিয়ে। হঠাতই বেয়াইপুরের দয়াময় বেয়াই বিতর্কিত হয়ে পড়ায় ভিলেজ পলিটিক্সের বেয়াই বেড়ালগুলো থলে থেকে বেরিয়ে পড়লো। প্রিন্স দ্য লিটল বেয়াই সে কালো তালিকার শীর্ষে। রাতে ঘুম হয়না। সকালে মুড স্টেবিলাইজার না খেলে সোফায় কুন্ডলি পাকিয়ে পড়ে থাকতে ইচ্ছা করে প্রিন্স দ্য লিটলের।

বেয়াইপুরের দয়াময় বেয়াই-এর আব্বাহুজুর ১৯৭১-এর শান্তি কমিটির লোক ছিলেন। সুতরাং শান্তিকারের ছেলে ভালো শান্তিকার হয়। বেয়াইপুরের গোপন পালদের নিয়ে আবার শান্তি কমিটি’২০১৫ তৈরী করে। বেয়াইপুরে শুরু হয় বর্ষব্যাপী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উতসব। বেয়াইপুরের পুতুল প্রশাসনের নিম্নপদস্থ লোকদের নিয়ে গঠিত হয় ভীষণ উচ্চ শক্তি সম্পন্ন তদন্ত কমিশন। দয়াময়ী ভবন রাতারাতি দয়াময় ভবন কী করে হয়ে উঠলো; সেই পুতুল নাচের ইতিকথাটিই লিখতে হবে তদন্ত কমিশনে। বেয়াইপুরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উতসব হচ্ছে। মানস মুখার্জি নামের এক মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক মিথ্যা মামলায় কারাগারে; উতসব চলছে, তার ছেলে সত্যজিত দেশান্তরী মিথ্যা মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে, উতসব চলছে, বেয়াইপুর থেকে ক্রমে ক্রমে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া হিন্দু পরিবার নিয়তির নো ম্যান্স ল্যান্ডে, উতসব চলছে। বেয়াইপুরে এবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুবাতাস হানা দিচ্ছে দয়াময় বেয়াইয়ের আয়োজনে। গোপন পালেরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ঢাক-ঢোল-কাসর বাজিয়ে ওম শান্তি ওম রব তুলেছে। দশচক্রে অরুণ গুহ ভুত হতে আর বুঝি বেশী বাকী নেই। এই অরুণ গুহের দয়াময়ী ভবনটি ক্রয় অথবা দখল নিয়েই থলের কালো বেয়াই বেরিয়ে আসে। শান্তি কমিটির আব্বাহুজুরের নামে নির্মিত পথ ধরে গোপন পালেরা কীর্তন গেয়ে বেড়ায়। এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য বেয়াইপুরের লোক আগে দেখেনি। সবই দয়াময় বেয়াই-এর জাদু।

কিন্তু সলিম বুঝ কিছুতেই তার বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটলকে থলেতে ফেরত পাঠাতে পারছে না। ব্রেণটা হ্যাং হয়ে আছে। এটা হয়। সর্বদা বোনের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল ভাইয়েরা ক্রমশঃ ক্ষীণবুদ্ধি হয়ে যায়। বুদ্ধাংক নীচে নেমে যায়। মাথার খুলি সংকুচিত হয়ে আসে। কিন্তু বুদ্ধি দেবার জন্য হনুফা বেয়াই আছে। সে চালাক-চতুর লোক। শান্তিকারদের কাছ থেকে পার পিস ৫লাখ টাকার বিনিময়ে প্রগতিশীল দলে যোগদানের ইনক্লুসিভ পলিটিক্যাল প্রজেক্টে হনুফা বেয়াই আছে বেশ রসেবশে। হনুফা বেয়াই বাড়ী বয়ে আসে। সেখানে জামাই আন্ডাকে দেখে খুশী হয়। কারণ আন্ডাটা খুব প্যাঁচ মারা বুদ্ধি নিয়ে চলে। হনুফা যতদূর বোঝে অত্র এলাকার অসাম্প্রদায়িকতার ভূত ছাড়াতে হবে। সবাইকে নিয়ে আসতে হবে মুসলিম বেয়াইহুডের ছাতা তলে। আন্ডা লাফ দিয়ে ওঠে।

–এক্সজাক্টলি।এই কথাটা মিলিয়ন ডলার কথা।

সলিমবুঝের সব সময় মাথা ঝিম ঝিম করে। সে বলে, এইটা কীভাবে করবেন; অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ না থাকলে বিরোধী দলের সঙ্গে আর আমাদের কী পার্থক্য থাকে!

আন্ডা লাফ দিয়ে ওঠে, সাম্প্রদায়িক দলগুলো তো  আপনাদের প্রতিপক্ষ নয়, বেয়াই বা ভাগ্নে বা জামাই। নতুন শত্রু খুঁজতে হবে আপনাদের। নতুন প্রতিপক্ষ দাঁড় করাতে হবে।

হনুফা লুফে নেয় প্রস্তাব, একটা ক্যাচাল পাকিয়ে দিলে ঐ ডামাডোলে প্রিন্স দ্য লিটল বেয়াই আবার থলেতে ঢুকে আরামে ঘুমাতে পারবে।

সলিম বুঝের মুখে হাসির ঝিলিক। এখন তাইলে একটা ক্যাচাল দরকার। হঠাত বিরক্ত হয়ে বলে, হনুফা বেয়াই আপনে যখন এতোই বোজেন, তখন ক্যাচাল পাকাইলেন না ক্যানো। আপনার হাতে এলিমেন্টের তো অভাব নাই।

আন্ডা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, কে বলে উনি ক্যাচাল পাকাননি। সানি লিওনের ঢাকায় এসে স্টেজ শো বন্ধের একটা শোরগোল তো উঠেছিলো। কিন্তু অধিকাংশ লোক সানিকে মনে মনে পছন্দ করে বলে, ক্যাচালটা সাসটেইন করেনি।

হনুফা হতাশার স্বরে বলে, সলিম বুঝ ভাই, হেফাজত দিয়ে প্রিন্স দ্য লিটল বেয়াইয়ের কেসটা ধামাচাপা দেয়া যাচ্ছেনা।

আন্ডা হাসে, কিন্তু বেয়াইপুরের দয়াময় আংকেলের ইস্যু থেকে কিছুটা ডিসট্র্যাকশান করা গেছে।

সলিম বুঝ জিজ্ঞেস করে, ডিসট্র্যাকশান কী! খালি ইংরাজি দিয়া কথা বলো কেন আন্ডা!

হনুফা গম্ভীরভাবে বলে, ঐ পলান টুক টুক খেলা আর কী। মাইনষের মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরাইয়া দিয়া দয়াময় বেয়াইয়ের বাড়ী-জমি দখলের ইস্যুটা পোতাইয়া দেওয়া আর কী!

সলিম বুঝ অর্ধৈর্য্য হয়ে ওঠে, এখন নতুন কী ক্যাচাল পাকানো যায় সেই বুদ্ধি দেন; বেয়াই আমার দুইবেলা ফোন করে কাঁদাকাটি করে; বৌমাও খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে; বোঝেন না; লোকলজ্জা বলে একটা বিষয় তো আছে।

আন্ডা বলে, লজ্জা জয় না করলে পলিটিকস করা যায়না মামা।

হনুফা বলে, প্রগতিশীল সমাজতন্ত্রী কিনুর পিছে লাগা যায়; সে খুব বাড়ছে, হাই কমান্ডের খুব কাছে চইলে গিইয়েছে। ফেভারিট হইয়ে পড়ছে।

সলিম বুঝ বলে, কিন্তু কিনুতো ভালোই কাজ করতেছে; ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ কী!

–বর্তমানের অভিযোগ না থাকলে অতীতের অভিযোগ নিয়া আইসতে হবে।

–অতীতের কী অভিযোগ!

–বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য কিনুরা দায়ী ছিলো; এইটা বইলে দিলে বাকীটা সাম্প্রদায়িক দলেরা বুইঝে নেবে।

সলিম বুঝের খুব ভালো লাগে প্লটটা। বেয়াইকে ফোন করে,

–হ্যালো বেয়াই, আমি ৭৫ নিয়া বিতর্ক তুলবো কিনুগো সমাজতান্ত্রিক দলরে দায়ী করে। আপনি একটু শান্তিকার ও দক্ষিণপন্থীদের দিয়া আমার গানের কোরাস গাওয়াইয়া নেবেন। ৭৫ বিতর্কে আপনার ৭১-এর ব্যাপারটা যদি চাপা দেয়া যায়।

–বাঁচালেন বেয়াই। আমি এক্ষুণি ওদের উপঢৌকনসহ পয়গাম পাঠাচ্ছি।

প্রিন্স দ্য লিটল দক্ষিণপন্থী মহেশ্বর এবং ফ্যাসাদকে ফোন করে সমবেত সংগীত শিল্পীদের প্রস্তুত করে।

সলিম বুঝ কিনু সংক্রান্ত ক্যাচালটা মিডিয়ায় তুলে দেয়। বঙ্গবন্ধু জাতির জনক হলেও সলিম বুঝ বঙ্গবন্ধুকে মামা ও অত্র এলাকাকে তার মামাবাড়ী মনে করে। ফলে তার মামুবাড়ীর আবদার, বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটল এখানে ছোট্ট নধর শরীর দুলিয়ে নারী বডিগার্ড নিয়ে গাদ্দাফি হয়ে ঘুরবে। লোকে তাকে বলতে পারবে না সে ৭১-এর ঘাতক। যে বলবে সেই দেশদ্রোহী।

কিনু বিতর্কে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডান মোর্চার মহেশ্বর-ফ্যাসাদ ইত্যাদি দেশপ্রেমিকেরা। সাম্যবাদের বিরুদ্ধে ধণাঢ্য উপমানবদের ঘ্যোঁত ঘ্যোঁতের রোগ দীর্ঘদিনের। সাম্যবাদীরা শিক্ষিত হয়, মানুষের অধিকারের কথা স্পষ্ট করে বলতে পারে। আর এই অশিক্ষিত সলিম বুঝ-হনুফা, মহেশ্বর-ফ্যাসাদ এরা নিজের স্বার্থের কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারে কিন্তু মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তোতলায়। এমনকি অর্ধশিক্ষিত আন্ডাটি যেহেতু মুসলিম বেয়াইহুডের ফসল, তারও শিক্ষিত-অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদীদের অসহ্য লাগে।কিনু বিতর্কটি বাজার পেয়ে যায়।

অমনি বেয়াইনগরের হাইব্রীড শান্তিকাররা কিনু কিনু কিনু করতে থাকে তোতা পাখীর মত।

আনন্দে সর্বদলীয় ঠিকাদার সমিতি সন্ধ্যায় পেয়াজ খাওয়া বাড়িয়ে দেয়। বাজারে পেয়াজের দাম যায় বেড়ে। সুতরাং পেয়াজ সংকটের মতো আর একটি ইস্যু এসে যায় মুসলিম বেয়াই ব্রাদারহুডের অপকীর্তিগুলো ঢেকে দিতে। গৃহপালিত বুদ্ধিজীবীরা শান্তির সুবাতাসে ২৪/৭ পেয়াজ খেতে থাকে। যারা একসময় সংখ্যালঘু নির্যাতন বিরোধী দোকান খুলে নাম-ডাক করেছে তারাও এব্যাপারে স্পিকটি নট হয়ে বরং সমাজের মুক্তচিন্তকদের সীমা লংঘন না করার ফতোয়া দেয় বেয়াইনগরের শহীদ মিনারে গিয়ে। এ যেন হাটহাজারী ও শাপলা ক্ষেতের ফতোয়ার ঐকতান।

মুসলিম বেয়াইহুডের ঘটক ‘খন্দকার’ সেইকালে সলিম বুঝের বিয়ের ঘটকালি করে তাকে মুসলিম বেয়াইহুডে রিক্রুট করে।সলিম বুঝের সেই ঘটক পিতাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার দেশজ মাস্টার মাইন্ড। সলিম বুঝের বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটল ৭১-এর যুদ্ধাপরাধী। সে আন্ডার পরামর্শ অনুযায়ী লজ্জা-শরম জলাঞ্জলি না দিয়ে থাকলে কোন মুখে সমাজতন্ত্রীদের ছিদ্র খুঁজে বেড়ায় এটা বেয়াইনগরের অনেকেই ঠিক বুঝতে পারেনা। নীরব দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

বেয়াইপুরের নতুন ‘খন্দকার’ কিংবা প্রিন্স দ্য লিটল কী তবে এভাবেই মুসলিম বেয়াইহুডের কালো পতাকা উড়িয়ে প্রতিটি সেপ্টেম্বরে যশোর রোডে হিন্দু শরণার্থীদের কালো নিয়তি হবে।

লেখক : সাংবাদিক, (লেখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)।