সাংবাদিক রুচির অবনমন

প্রকাশিত

মাসকাওয়াথ আহসান : সাংবাদিকতার পেশাটি বৃহত্তর অর্থে একজন শিক্ষকের পেশা। শিক্ষক এবং সাংবাদিক এই দুটি পেশার মানুষকে তারুণ্য অনুসরণ করে। তাদের কাছ থেকে জ্ঞান-তথ্য-শিষ্টাচার আহরণের চেষ্টা করে। আমি নিজেই বেড়ে ওঠার কালে ঈশ্বরদী এবং রাজশাহীতে সাংবাদিকদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করতাম। তারা যা লিখতেন পড়তাম, যা বলতেন তা শুনতাম। দেখেশুনে বুঝেছিলাম সাংবাদিকরা বন্ধুভাবাপন্ন হন এবং প্রতিটি শব্দচয়নে খুব সচেতন থাকেন। পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট শব্দ বা কোন স্ল্যাং (খিস্তি) তাঁদের কখনো উচ্চারণ করতে শুনিনি।
ঢাকায় বেড়ে ওঠার কালে এরপর পেশাজীবনে যে পিতৃপ্রতিম বা অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিকদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়েছে; দেখলাম একই ব্যাপার; আমার শৈশবে দেখা সেই আলোর মানুষদের মতই স্নেহপ্রবণ আচরণ তাদের। অনুজ প্রতিমদের সামনে কীভাবে কথা বলতে হবে সেটা শেখার ক্ষেত্রে উনারাই আমার শিক্ষক।
এখন শিক্ষক বা সাংবাদিক মানেই তাকে ধর্মযাজকের মতো হতে হবে তা নয়; নিশ্চয়ই সমবয়েসীদের সঙ্গে প্রত্যেক মানুষেরই একটি চটুল জীবন থাকে; সেখানে তারাও নিশ্চয়ই প্রাণখুলে কথা বলেন, সেখানে স্ল্যাং বা লঘুতা এসে পড়তেই পারে। কিন্তু কোন পাবলিক ফোরামে বা ফেসবুকে কোন সাংবাদিকের কাছ থেকে স্ল্যাং বা খিস্তির ব্যবহার একেবারেই কাংক্ষিত নয়। কারণ পাবলিক প্লেসে তিনি একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
ইড-ইগো-সুপার ইগো সব মানুষের মাঝেই আছে; ক্রোধ থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু যে কোন পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন; সেটিই তার ব্যক্তিত্বের প্রধান পরীক্ষা। ক্রোধ সংবরণ করতে না পারাটাকেই ব্যক্তিত্বের বিপর্যয়ের প্রধান সিম্পটম হিসেবে ধরা হয়। একজন সাংবাদিক যদি সুপরিচিত হন, সাংবাদিক নেতা হন, টিভি টকশো’তে অংশ নেন; তখন তিনি একজন সেলিব্রেটিতে পরিণত হন। এই খ্যাতি আসে কিছু দায়িত্ববোধের এসিড টেস্ট নিয়ে। কারণ তখন তার যে কোন কাজের সমালোচনার অধিকার জনমানুষ পেয়ে যায়। সেই সূত্রে অনুজপ্রতিম সাংবাদিকরাও একজন সেলিব্রেটি হিসেবে ঐ সাংবাদিকের কোন পদক্ষেপের সমালোচনা করতে পারে। কোন লেখক তাকে নিয়ে স্যাটায়ারও লিখতে পারেন। এরকম পরিস্থিতির মুখে বাংলাদেশের প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক গাফফার চৌধুরী বা ভারতের খ্যাতিমান সাংবাদিক কূলদীপ নায়ারও পড়েন অহোরহো। কিন্তু কোন পাবলিক ফোরামে উনারা কখনো পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট শব্দ ব্যবহার করেন না। খিস্তি ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠেনা। কারণ অন্য কারো আচরণবিধিতে শিষ্টাচারের বিপর্যয় ঘটলেও মি চৌধুরী এবং মি নায়ার সে উস্কানীর ফাঁদে পা না দিয়ে অত্যন্ত ধীর স্থিরভাবে যুক্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় উত্তর দিয়ে দেন।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একজন নারী সাংসদ কবি হেলাল হাফিজের কবিতা ব্যবহার করে খিস্তি করেছিলেন। উনি হয়তো জানেন না; সাহিত্যে শব্দচয়নের যে স্বাধীনতা আছে; পাবলিক ফোরামে কথা বলার সময় একজন সাংসদের ক্ষেত্রে তা অনুমোদিত নয়।কিন্তু প্রায় তিনদশক ধরে সাংবাদিকতা করছেন এমন একজন আলোর মানুষের অবশ্যই জানার কথা দার্শনিক ছফা তাঁর বিচূর্ণীভাবনার গ্রন্থে কোন প্রসঙ্গে কোন অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করলেও; পাবলিক ফোরামে কথা বলার সময় সচেতন থাকতেন। খুব ঘনিষ্টদের সামনে নিশ্চয়ই তিনি স্ল্যাং ব্যবহার করতেন, কিন্তু আমি অল্প পরিচিত ছিলাম, সুযোগ পেলেই উনার আজিজ সুপার মার্কেটের চেম্বারে ঢুকে পড়ে লক্ষ্য করেছি অত্যন্ত সচেতন ভাবে কথা বলতেন। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের সঙ্গেও একই অভিজ্ঞতা। কাজেই দার্শনিক ছফার কোন উদ্ধৃতি ব্যবহার করে সেই সংসদে খিস্তি ব্যবহারকারী সাংসদের মতো একজন অনুসরণীয় সেলিব্রেটি সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্টে পলিটিক্যালি অত্যন্ত ইনকারেক্ট খিস্তি ব্যবহারে চারপাশে সুরুচির বাতিগুলো নিভে যায়। যারা সেই খিস্তি পোস্টে লাইক দেয় ও তা শেয়ার করে; তাদের দোষ দিয়ে তো আর লাভ নেই। একজন শিক্ষকতুল্য সাংবাদিক যা শেখাবেন, উনার অনুসরণকারীরাও তাই শিখবেন। আশা করছি ভবিষ্যতে এমন ভুল অগ্রজপ্রতিমরা করবেন না। কারণ তাঁদের দেখানো আলোক সম্ভবা পথেই আমরা হাঁটতে চাই।

শেয়ার করুন