‘সানি লিওনের ডেন্স ঠেকাও’

sany lionমাসকাওয়াথ আহসান : গ্রামগঞ্জের একটি মসজিদ জুম্মাহর নামাজের আগে কানায় কানায় পূর্ণ হয়। মাইক্রোফোনে ঘোষণা আসে, মোল্লা তাওয়াল একন আপনাদের সামনে দুচারটি কথা বলিবেন। আপনারা শান্ত হইয়া বসুন। মোল্লা তাওয়াল দীর্ঘ দাড়িতে দুইবার স্নেহের পরশ বুলাইয়া বলা নাই-কওয়া নাই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে; মানে রেগে ফায়ার যাকে বলে।
মুয়াজ্জিন সাহেব ফায়ার ব্রিগ্রেডের ফায়ার ফাইটারদের ন্যায় গোলাপজল ছিটিয়ে আগুণ নেভানোর মৃদু চেষ্টা করে দমে যায়। মোল্লা তাওয়াল বলে, আমি তাওয়া গরম করিতে মাত্র দুই মিনিট লইবো। আপনারা কী একটু হৈ চৈ থামাইয়া কাতার সোজা করিয়া বসিবেন। সামনের কাতার পূর্ণ করুন। আগাইয়া আসুন। ঘন হইয়া আসুন।
এইবার পিনপতন নিস্তব্ধতার মহাশ্মশান হয়ে ওঠে চারপাশ। মোল্লা তাওয়াল চিতার আগুণে ঘৃতাহুতি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
খবর রাখেন মিয়ারা; এই মুসলমানের দেশে ছানি লেওনি আইতেছে। আইতেছে কেন! যুবসমাজকে বিপথগামী করিতে। ছানিকে প্রতিহত করুন; আপনাদিগের চোখে কী ছানি পড়িয়াছে!
এক আগ্রহী মুসল্লী জিজ্ঞেস করেন, তা কে এই ছানি যারে প্রতিহত করতে হইবেক!
থতমত খেয়ে মোল্লা তাওয়াল তার নিকটস্থ যুবা ক্যাডারকে জিজ্ঞেস করে ফিসফিস করে। কিন্তু মাইক্রোফোন সামনে থাকায় শোনা যায়।
–ছানি কী করে?
–হুজুর লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা; সে ডেন্স করে।
মোল্লা তাওয়াল যুবাটিকে ইশারায় চুপ করিয়ে দিয়ে বলে ,
–শুনিয়াছি সে ডেন্স করে। আস্তাগফিরুল্লাহ; ইসলাম গেলো। ইসলাম গেলো। ছানিকে প্রতিহত করুন। দরকার হইলে আমরা বিমান বন্দর আক্রমণ করিবো!
মসজিদের ভেতরে কান্নার রোল ওঠে। বিদ্যুৎ বিভাগের মিটার রিডার থেকে সহসা শিল্পপতি হয়ে ওঠা এলাকার বিশিষ্ট মুরুব্বী আলহাজ্ব খবিরুদ্দিন হুংকার দিয়ে ওঠে, এই সবই ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র। ছানি পাঠাইয়া যুবসমাজের মগজ চিবাইয়া খাইতেছে। ছি ছি; কী লজ্জা কী লজ্জা! এসবই কেয়ামতের নিশানা।
পাশ থেকে এক হতাশ মুসল্লী বলে, কতদিন ধইরা হুনতেছি কিয়ামতের নিশানা দেখা পাওয়া গেছে; কিন্তু দিশা পাইনা! আসি আসি বলে কেয়ামত তো আর এলোনা। আইয়া পড়ুক। এতো ঝামেলা আর ভালো লাগেনা!
খবিরুদ্দীন চিৎকার করে, খামোশ!
মোল্লা তাওয়াল বলে, দুঃখের বিষয় ছানি যখন ঢাকায় আসিবে; আমি তখন মক্কায় থাকিবো; হজ্বের সিজনতো। আপনারা পারিবেন তো বিমানবন্দর আক্রমণ করিতে!
তরুণ ক্যাডারেরা একযোগে উত্তর দেয়, ইনশাল্লাহ।হুজুর আপনি এগিয়ে চলুন। আমরা আছি আপনার পিছে।
মোল্লা তাওয়ালের মুখে ঈষত হাসির রেখা! যাক তাওয়া যথেষ্ট গরম হইয়াছে।
হিন্দু সম্পত্তি দখল করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ আলহাজ্ব দবির উদ্দীন আর্তনাদ করে উঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। ছি ছি ছি; ভারত থেকে এসে ডেন্সের মত বেশরিয়তী কাজ করিবে; আমরা চাহিয়া চাহিয়া দেখিবো! ইহাও কপালে ছিলো; হে আল্লাহ আমারে তুলিয়া লও ছানি আসিবার আগেই।
জুম্মার নামাজ শেষে বিক্ষোভ মিছিল। কিছু লোকের মধ্যে ছানির নাচ দেখার একটা চাপা লোভ গুমরে কাঁদে। এক মাঝবয়েসী লোক একটু লাজুক মুখে জিজ্ঞেস করে পাশের এক তরুণকে, ছানির নাচ দেখতে কয় টাকার টিকেট।
সপ্রতিভ ছেলেটি উত্তর দেয়, সর্বনিম্ন টিকেটের মূল্য ১৫ হাজার টাকা। আমাদের রিচের বাইরে আংকেল।আর এর নাম ছানি নয়, সানি লিওন।
লোকটা বিমর্ষ হয়ে যায়। মনের মধ্যে সানি লিওন নামটা দমকা হাওয়ার মতো ধাক্কা দেয়। টাকাটাই তাহলে সব। টাকা না থাকলে জীবন মেঘলা দিন হয়। সানি ডে হয়না।
সানি ঠেকানোর আলোচনাটা মিডিয়া হয়ে; সোশ্যাল মিডিয়া ধুয়ে; এরপর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
হেফাজতে ইসলামের মোল্লারা যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে। শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ধৃত ও পরে পার পিস পাঁচ লাখ প্রকল্পে জামিনে থাকা মাদ্রাসা শিক্ষক থেকে শুরু করে টেলিফোনে লইট্টা ফিশ ও অলৌকিক টেবিল বিষয়ক কিংকি কলার আগামীর মেশিনম্যানেরা নৈতিকতার ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে ‘সানি লিওনের ডেন্স ঠেকাও’ আন্দোলনের ডাক দেয়।
বিশুদ্ধ সংস্কৃতি মোল্লাদের চোখেও এটা হাজার বছরের বাঙ্গালী সংস্কৃতির এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় ছাড়া কিছু নয়। বিশুদ্ধ সংস্কৃতি মানেই অঞ্জলি লহো মোর বলে কটা মোমবাতি হাতে নিয়ে স্টেজের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে হবে মৃদু লয়ে, বা নাঁকি গলায়, নাঁ সজনি নাঁ; আমি জাঁনি জাঁনি সেঁ আঁসিবে নাঁ গাইতে হবে। এসব আইটেম নাম্বার ফাম্বার সব মূল্যবোধের ভীষণ ভূমিকম্প।
সমাজের রুচির ভার্ণিয়ার ধ্রুবকেরা ছ্যা ছ্যা করে, একজন নীল ছবির নায়িকা থেকে যে মেইন স্ট্রিম ফিল্মে এসেছে; তাকে নিয়ে অশালীন শো! এসব কী শুরু হলো বলেই প্রতিশ্রুতিশীল আভাগার্ড ফিল্মের সাইটে গিয়ে সানি লিওন লিখে সার্চ দেয় রুচি চানাচুর সমাজ। দরজার সিটকিনি আটকে দিয়ে রুচির দর্জিরা সানি লিওন বিষয়ে এম ফিল দূরশিক্ষণ সম্পন্ন করে।
গুগল লক্ষ্য করে গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে সানি লিওনকে বেশী সার্চ করা হয়েছে। অথচ আগের সপ্তাহেই জাকির নায়েককে বেশী বার সার্চ করা হয়েছিলো। হঠাত এই পাবলিসিটি কে করলো বুঝতে পারেনা তারা। এরপর রিসার্চ উইং থেকে খবর আসে, মোল্লা তাওয়াল নামে এক লোকের হেইট স্পিচেই সানির হিট বেড়েছে। বেটা ফ্রিতে সানি লিওনের পি আর ফার্মের কাজ করেছে ভেবে মনে মনে হাসে গবেষকেরা।
একজন বিনোদন প্রতিবেদক এই সানি লিওনের ইভেন্ট আয়োজনকারী সংস্থাকে জিজ্ঞেস করে, কেন সানি লিওনকে আনছেন, আর টিকেটের দামওতো অস্বাভাবিক!
পনিটেল করা ইভেন্ট ম্যানেজার, হিকস ভাইয়া (আব্দুল হাকিম) বাংলা ইংরেজী মিশিয়ে যা বলে তার অর্থ দাঁড়ায়; দেশে কোটি-কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। অনেকগুলো ব্যাংক লুট হয়েছে; আর ইসলামী ব্যাংকের অনুপ্রেরণাতে দেশে অনেক ছোটখাট মুঘল জায়গীরদার তৈরী হয়েছে। মুজরা মুঘল সংস্কৃতির অংশ। তাই এই নৃত্যানুষ্ঠান জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ ব্যাংকক এই উঠতি হেলথ টুরিস্টদের চাপ আর নিতে পারছে না। সানির এই পারফরমেন্স প্রফিটেবল কোন ভেঞ্চার নয়; নেহাত নব্য কোটিপতিদের জন্য সিএস আর (কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) কার্যক্রম।
হিকস ভাইয়া বলছে, একটি খাম পাঠানোতে তাওয়াল সাহেব ঠান্ডা হয়ে এসেছে প্রায়। কিন্তু মামু বাড়ীর আবদার জুড়েছে, সানি লিওনকে মুসলমান হতে হবে। নাম হতে হবে সানিয়া লাইলাতুন। এটা একটা বড় প্রবলেম!
হিকস ভাইয়া সানি লিওনের ম্যানেজারের সঙ্গে সমস্যাটা নিয়ে কথা বলে। ম্যানেজার পনেরো মিনিট পর কল ব্যাক করে।
–ম্যাডাম সানি বলছেন এতে কোন সমস্যা নেই। ঢাকার শো’তে সানিয়া লাইলাতুন হিসেবে পারফর্ম করে;মুম্বাই ফিরে মুসলমান থেকে হিন্দুতে ধর্মান্তরিত হয়ে; মাঝখান থেকে পাঁচ লাখ রুপি কামিয়ে নেয়া যাবে হিন্দুত্ববাদী শিবসেনাদের কাছ থেকে!

লেখক : সাংবাদিক, (লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া)।