স্থবিরতা কাটাতে এসএমই লিংকেজ নীতিমালা করুণ

প্রকাশিত

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক:কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সারাদেশেই ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তারা এখনও প্রণোদানা প্যাকেজ হতে আশাব্যঞ্জক পরিমাণে ঋণ সহায়তা পাননি বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এসএমই লিংকেজ নীতিমালা প্রণয়ন, দেশের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের দ্রæততার সাথে প্রণোদানার প্যাকেজ হতে ঋণ সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং কোভিড সময়ে বকেয়া ট্যাক্স, ভ্যাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল এক বছর স্থগিত রেখে পরবর্তী বছরে তা কিস্তিতে পরিশোধের দাবি জানান তারা।

গতকাল বুধবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এ দাবি জানান তারা। ‘পুরোনো ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের অবদান বজায়ে রাখার লক্ষ্যে চলমান পরিস্থিতিতে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের জন্য করণীয় নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক ও বিশেষায়িত ব্যবসায়ী সমিতিসমূহের সাথে মতবিনিময়’ শীর্ষক এ ওয়েবিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি ও আনোয়ার গ্রæপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেন খালেদ।

ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ পোষাক প্রস্তুুতকারক সমিতির সভাপতি আলহাজ¦ মোঃ আলাউদ্দিন মালিক, ঢাকা শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি হোসেন এ সিকদার, বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারী প্রস্তুুতকারী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এবং বাংলাদেশ পাইকারী ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মোঃ গোলাম মওলা প্রমূখ।

স্বাগত বক্তব্যে শামস মাহমুদ বলেন, আমাদের দেশে বেশির এসএমই উদ্যোক্তাই ব্যাংক সেবার সাথে তেমনভাবে সম্পৃক্ত নয়। এখাতের উদ্যোক্তাদের সবসময়ই ঋণের অপ্রতুলতা, বাজারের অভিগম্যতার অভাব, পণ্যের গুনগতমান বৃদ্ধি না করা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের অভাব এবং সর্বোপরি দক্ষ জনশক্তির অভাব প্রভৃতি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের পুরোনো ঢাকার ব্যবসায়ীদের সার্বিক সহায়তা প্রদানে ব্যাংক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহŸান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় এমএসএমই লিংকেজ নীতিমালা প্রণয়ন এবং এ খাতের উদ্যোক্তাদের ট্যাক্স, ভ্যাট এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির প্রভৃতির বিল ১ বছর স্থগিত রেখে, পরবর্তী বছরের কিস্তিতে প্রদানের সুযোগ দিতে হবে।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেকাংশেই এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের উপর নির্ভরশীল জানিয়ে হোসেন খালেদ বলেন, আমাদের এসএমই উদ্যোক্তাদের আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি চলমান রাখা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে এসএমই খাতের উদ্যোক্তাবৃন্দ এবং এ খাতের উদ্যোক্তাদেরকে ব্যবসায়িকি কর্মকাÐ চালিয়ে রাখতে সর্বাতœক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। এছাড়াও তিনি উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মাঝে আতœবিশ^াস ফিরিয়ে আনার ওপর জোরারোপ করেন। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এর ফলে উদ্যোক্তাদের বিক্রয়ের পরিমাণ ৩৫%-এ নেমে এসেছে, এর ফলে উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এ অবস্থা উন্নয়নে তিনি পাশর্^বর্তীসহ অন্যান্য দেশ কি করছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার আহŸান জানান।

আলহাজ¦ মোঃ আলাউদ্দিন মালিক বলেন, পহেলা বৈশাখ ও ঈদ-উল ফিতর সময়ে লকডাউন থাকার কারণে বন্ধ ছিল, ফলে এখাতের উদ্যোক্তাবৃন্দ উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেনি, যার কারণে এখাতের উদ্যোক্তা মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তিনি এখাতের সাথে ডাইয়ং, এমব্রোয়েডারি সহ অন্যান্য খাতের উদ্যোক্তা জড়িত, তাই এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্যাকেজ হতে আর্থিক নিশ্চিতকরণের আহŸান জানান। তিনি ঈদ-উল আযহা উপলক্ষে শপিংমল ও দোকানসমূহ সন্ধ্যা ৭টার পরিবর্তে ১ ঘন্টা বাড়িয়ে দেওয়ার আহŸান জানান।
হোসেন এ সিকদার বলেন, কেরানীগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে প্রায় ১২০টি শিল্প রয়েছে, তবে কোভিড-১৯ এর কারণে স্থানীয় বাজারের চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়া, বিক্রি কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন এবং শ্রমিকদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসার কারণে আমাদের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে এবং এ অবস্থা মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগ গ্রহণের আহŸান জানান। তিনি আরো বলেন, দেশের ৭৬টি বিসিক শিল্পনগরীতে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ ও বিল অগ্রীম (প্রিপেইড মিটার সংযোগ) পরিশোধ করতে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের ছোট ছোট কারখানা পুরোনো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তবে এখাতের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে সমন্বিত কোন প্রকল্প এখনও নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে এ খাতের উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা এখন বিক্রি করতে পারছে না। তিনি বলেন, প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও এ বিষয়ক নির্দেশনা এখনও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাংক কর্মকর্তাবন্দ অবগত না হওয়ার ফলে এ প্যাকেজ হতে উদ্যোক্তারা ঋণ সহায়তা পাচ্ছে না এবং এমতাবস্থায় উদ্যোক্তাদের অন্তত এক বছরের জন্য ভ্যাট এবং বিদ্যুৎ বিল মওকুফের প্রস্তাব করেন।

মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, এখাতের বেশিরভাগ উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব না থাকায় প্রণোদানার প্যাকেজ হতে ঋণ সহায়তা পাওয়ার সম্ভবনা কম, এক্ষেত্রে যাদের ব্যাংক হিসাব নেই এধরনের উদ্যোক্তাদের সংশ্লিষ্ট এসোসিয়েশনের সুপারিশক্রমে ব্যাংক ঋণ সুবিধা দেওয়ার আহŸান জানান। তিনি জানান, সারাদেশে প্রায় ৫ হাজার বেকারী রয়েছে তার মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২৭০টি বেকারী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র ঢাকা শহরে প্রায় ১ হাজার বেকারী রয়েছে, যেখানে প্রায় ২ লক্ষ লোক কাজ করছে এবং এ বেকারীগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তারা কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাবে। কোভিড’র কারণে এখাতের উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা একান্ত আবশ্যক বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি বিশেষকরে পুরোনো ঢাকার যানজট ও ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের সরকারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের আহŸান করেন।

হাজী মোঃ গোলাম মওলা বলেন, এখাতের উদ্যোক্তাবৃন্দ প্রণোদনার প্যাকেজ হতে এখনও ঋণ সুবিধা পায়নি এবং বছরের শুরুতে সরকারের পক্ষ হতে সিঙ্গেল ডিজিট ঋণ সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও উদ্যোক্তারা সেটা পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন, ভোজ্য পণ্য কোনাবেচায় প্রচুর পরিমাণে অর্থের সংস্থান প্রয়োজন, তবে আর্থিক সংকটের কারণে এখাতের উদ্যোক্তারা এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন। পুরোনো ঢাকার ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাস্তাঘাট চওড়া করা ও যানজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ এবং তা দ্রæত বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পুরোনো ঢাকার ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদান করলেও পুরোনো ঢাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

শেয়ার করুন