মত প্রকাশ

রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব !

মুহাম্মদ বাকের হোসাইন : বেগম খালেদা জিয়াকে মোবারকবাদ। লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি দেশ ও দলে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে জাতিকে যে বরাভয় দিয়েছেন তাতে মানুষ কিছুটা হলেও ভরসা পাবে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলেও তিনি দেশ ও দেশের অবস্থা সম্পর্কে যে বেখবর নন তাঁর এই আহ্বানে তার প্রমাণ মিলেছে। তিনি নিজে থেকে এই আহ্বান জানিয়ে থাকুন বা কেউ তাঁকে এই আহ্বান জানানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকুন দুটোই বিএনপির জন্য ইতিবাচক হয়েছে। কেননা গত কিছুদিন ধরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতাদের এলোপাতাড়ি বক্তব্য, তার পাল্টা বক্তব্য ও প্রতিবাদ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান হুলস্থুল কাণ্ডে মানুষ যেমন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিলো তেমনি দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মনে অজানা আশঙ্কাও তৈরি হয়ে যাচ্ছিলো। হয়তো তা অনুধাবন করেই বেগম খালেদা জিয়া সুদূর ইউরোপ থেকে দলীয় নেতাদের সাথে ভার্চুয়ালি ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ে ঐক্যের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

দেশে সাম্প্রতিক পট পরিবর্তনের প্রথম দিন থেকেই বিএনপির একশ্রেণির নেতা-কর্মী দীর্ঘদিন অভুক্ত দৈত্যের মতো যেভাবে দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে নেমে পড়েছেন তাতে স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে একমাত্র ও নিশ্চিত বিকল্প হিসেবে বিএনপির যে অবস্থা তৈরি হয়েছিলো তা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সেই অবস্থায় জনগণের নাড়ীর গতি বুঝতে পেরে সাথে সাথে বলে দিয়েছিলেন এক জালিমের বদলে আরেক জালিমকে, এক চাঁদাবাজের বদলে আরেক চাঁদাবাজকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান করেনি। সত্যি বলতে কি জামায়াত আমিরের সেই বক্তব্য তখন প্রশংসিত হয়। তবে সে সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কথা ও কাজে বেশ সংযম ও কাম্য দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়ায় পরিস্থিতি সহনশীল হয়ে উঠে। যদিও বিএনপি নেতাকর্মীদের খাই খাই অবস্থার অবসান এখনো হয়নি,তা চলছে এবং বিএনপির ক্ষতি যা করার তারা করেই যাচ্ছেন। এসব বর্গী নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দল থেকে কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, হচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় প্রতিদিনই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন, বিভিন্ন নসিহত করছেন। কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের বাণীর মতো অবস্থা। সাংবাদিকদের কেউ কেউ তারেক রহমানের এসব ভিডিও আপ্তভাষণকে রাজনৈতিক বক্তব্য না বলে ‘হার্মাদদের উদ্দেশে সক্রেটিসের অমিয়বাণী’ বলে খোঁচা মারছেন। যদিও তারেক রহমানের কথাগুলো মূল্যবান নিঃসন্দেহে। অবশ্য তার একটি কথা নিয়ে বিতর্ক ও তৈরি হয়েছে। কয়েকটি ভাষণে তিনি বলেছেন কিছু কিছু নেতাকর্মী বিএনপি ক্ষমতায় এসে গেছে ধরে নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছেন। তাদের এই আচরণ ক্ষতিকর। বিএনপি ক্ষমতায় আসেনি। তারেক রহমানের এ কথায় ভুলবুঝের অবকাশ আছে। তার মানে কি বিএনপি এখনো ক্ষমতায় আসেনি তাই দখল-চাঁদাবাজি করো না,আসুক তারপর করো। বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও কি এসব অকাম করা উচিত হবে?

ইদানিং বিএনপির রাজনীতির হালহকিকত, স্ববিরোধী কাজকারবার নেতাদের একেক সময়ে একেক ধরনের সমন্বয়হীন মনগড়া বক্তব্য দেখে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। রাজধানীর মতো আমাদের চট্টগ্রাম মহানগরীতেও প্রতিবছর বাণিজ্যমেলা হয়। পাকিস্তান আমল থেকেই এই মেলা চলে আসছে। তখন মেলা বসতো আগ্রাবাদ জাম্বুর মাঠে কিন্তু এখন বসে রেলওয়ের পলোগ্রাউন্ড মাঠে। মেলায় হাউজির আসর বসে। হাউজির বাম্পারে একবার এক লোকের প্রায় সব নম্বর মিলে যায় শুধু একটার জন্য সে তীব্র উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষার এক পর্যায়ে নম্বর ঘোষণা না করতেই বেহুশ হয়ে পড়ে যায়। মানুষ টিপ্পনী কেটে বললো নম্বর মেলার পর বেহুশ হতো, আগে কেনো? আসলে পাওয়ার প্রত্যাশা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে স্নায়ুর তাপ বেড়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। বিএনপির মধ্যেও সে ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে বলে মনে হয়। তারা হয়তো মনে করছে নিশ্চিত ক্ষমতাটা বুঝি হাত থেকে ফসকে গেলো।

গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথমদিকে অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংস্কার নিয়ে তাদের যে নীতি,কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় তা ছিলো যথার্থ ও বাস্তবসম্মত।একারণে তা প্রশংসিত ও হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সে অবস্থা থেকে তারা সরে আসে। অতিসম্প্রতি বিএনপিকে অসহনশীল ও বেসামাল হিসেবে দেখছে মানুষ। ইতোমধ্যে বিএনপির নেতারা মনে করছেন তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার জন্য মানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। এজন্য তারা অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রসহ অনেককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের সাথে রোজকার বাহাসে লিপ্ত হয়ে পড়ছেন। তারা সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখতে গিয়ে জনগণের সাথে ও বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে।

স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের লক্ষ্যে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মূলমন্ত্র ছিল রাষ্ট্রের আমূল-সংস্কার করে স্বৈরতন্ত্রের মূলোৎপাটন, দেশকে ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত করা, খুনি শেখ হাসিনা ও পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের বিচার, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা,দুর্নীতি উচ্ছেদ। বিএনপি জনগণের এসব চাওয়ার প্রতি উন্নাসিকতা দেখিয়ে এখন যে ভাবভঙ্গি দেখাচ্ছে তাতে জনমনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তারা নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে পতিত স্বৈরাচারকে পুনর্বাসিত করে ভারতের দক্ষিণার কাঙ্গাল হয়ে পড়েছে। অথচ বিএনপি স্বৈরাচার হাসিনার হাতে চূড়ান্তভাবে নাকাল হয়েছে আর ভারত আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশের অন্যকোনো দলকে আস্থাযোগ্য মনেই করে না। ভারতের মদদেই শেখ হাসিনা গত ১৬ বছর দেশে তার স্বৈরাচারী শাসন-শোষণ চালিয়েছেন। বিএনপি এতোদিন মৌলিক সংস্কারের পর নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসলেও এখন সরাসরি সংস্কারের বিরোধিতা করছে। বিএনপির কোনো কোনো নেতা এমন কথাও বলছেন যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার করলেও তারা সে সংস্কার ছুড়ে ফেলে দিবেন। অথচ বিএনপি আবার নিজেকে সংস্কারের সবচে বড় প্রবক্তা দাবি করে এক্ষেত্রে তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরছে। এখন প্রশ্ন আসে তারা যদি সংস্কারের মূল প্রবক্তা ও কারিগর হয়ে থাকে তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগে তাদেরই তো বেশি খুশি হওয়ার কথা,সহযোগিতা করার কথা,তারা বিরোধিতা করছে কেনো?

অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে গণমাধ্যমবান্ধব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বিএনপির সাথে গণমাধ্যমেরও ব্যবধান বাড়ছে। একসময় জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী সাংবাদিকরা বিএনপির প্রতি হতাশ হয়ে পড়ছেন। বিএনপির বরকন্দাজ হিসেবে পরিচিত গুটিকয়েক সাংবাদিক তাদের নানা অপকর্মের কারণে ইতোমধ্যে সাংবাদিক সমাজের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। সাংবাদিক নামধারী কিছু মতলববাজ বিএনপির নাম ব্যবহার করে নিজেদের একচেটিয়া স্বার্থোদ্ধারের জন্য দেশপ্রেমিক ও সাচ্চা জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ও বিএনপির মাঝে বাধার দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। সম্প্রতি পবিত্র মাহে রমজানে বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলের মতো ধর্মীয় আয়োজন থেকে ও তাদেরকে বাদ দিয়ে সবাইকে হতবাক করেছে। বিএনপির মিডিয়া সেল নামে কি এক চিজ না-কি এসব দেখে। সাংবাদিকরা এটাকে ঠাট্টা করে নাম দিয়েছেন মিডিয়া শেল(কামানের গোলা) দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমানের মতো জাতীয়বাদী আদর্শের ত্যাগী ও পরীক্ষিত সৈনিক ইফতার মাহফিলে দাওয়াত না পাওয়ার ঘটনা শুধু সাংবাদিকদের নয় সাধারণ মানুষকেও হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। এক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃত্বের বিবেচনাবোধ নিয়েও স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে। একসময় টিভি টক শো-তে বিএনপির পক্ষে যেসব সাংবাদিক কথা বলতেন তাদের মধ্যে কথা- যুক্তি-মেধা-জ্ঞানে বলিষ্ঠ শওকত মাহমুদ বিএনপি থেকে বাদ পড়ায় টক-শোতে বিএনপির অবস্থান ও তলানিতে। অথচ যে অভিযোগে শওকত মাহমুদ বিএনপিছাড়া হলেন একই অভিযোগের বহু অকর্মণ্য হোতা বিএনপিতে বহাল তবিয়তে আছেন। মাঝখানে একজন মেধাবী সাংবাদিকের বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা থেকে বিএনপি বঞ্চিত হলো। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ যদি তার অন্যতম কসুর হয়ে থাকে তাহলে বিএনপিও তো দলগতভাবেই ২০১৮ সালে এই কসুর করেছে। শুধু কি তাই, এজন্য শেখ হাসিনার সাথে সংলাপ-দেন-দরবার ও করেছে। এর কি জবাব? ব্যাপারটা গোশত খাওয়া হালাল, কিন্তু ঝোল খাওয়া হারামের মতো খোঁড়া যুক্তি হয়ে গেলো না!

দলের এসব স্ববিরোধিতা, নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা, অনুগতদের নিয়ে দোকান সাজানোর মানসিকতা, মেধার অবমূল্যায়ন উপরন্তু জনগণের নাড়ীর স্পন্দন উপলব্ধি করতে না পারার কারণে বিএনপির মতো জনপ্রিয় দল আজ যেন জরাগ্রস্ত, বাঁধনছেঁড়া। কর্মী আছে শৃঙ্খলা নেই, নেতা আছে পথনকশা নেই। প্রত্যাশা আছে, প্রাপ্তি নেই,যাত্রা আছে, গতি নেই। চিন্তা আছে, সৃজনশীলতা নেই। এদিকে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় রাজনীতির মাঠ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। যোগ হচ্ছে নতুন নতুন উপাদান। ছাগল চাটছে বাঘের গাল। এলোমেলো দৃশ্যপটে ও স্পর্শ পাওয়া যাচ্ছে নতুন বা তৃতীয় কোনো নায়ক বা খলনায়কের। এই বাস্তবতায় বিএনপি কি পাবে রাজতোরণের দর্শন,না-কি বাড়া ভাতে ভাগ বসাবে অন্য কেউ?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক নয়া দিগন্ত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button